অন্ধকার জগতের ডন হাসনাত : প্রতিকার চান ভুক্তভোগীরা

3334

সৈয়দ বাপ্পী
অপরাধ জগতে তার একচ্ছত্র আধিপত্য আবুল হাসনাত ওরফে পাখির। চতুর হাসনাত সবসময় থাকে ক্ষমতাসীনদের কাছের মানুষ। দক্ষিণ সুরমার টেকনিক্যাল কলেজ রোড এলাকার একটি কলোনিতে বসবাস করত আবুল হাসনাত। তার মা-বাবার দেয়া নাম পাখি। সে সময়ে টেকনিক্যাল কলেজ রোড এলাকায় জামায়াত-শিবিরের ব্যাপক আধিপত্য ছিল। জামায়াত নেতা ফখরুল ইসলাম বাদলের মাধ্যমে ছাত্রশিবিরে যোগ দেয় আবুল হাসনাত। বাদল জমিজমার দালালি করতেন।

হাসনাত বিভিন্ন অপকর্মের জন্য দক্ষিণ সুরমা এলাকা থেকে বিতাড়িত হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে খাদিমপাড়ার কল্লগ্রামে চলে আসে। তখন হাসনাতের মা-বাবা ও সৎভাই আব্দুল মান্নানকে আশ্রয় দেন সিদ্দিক মুহুরি। তিন শতক ভূমির উপর নির্মিত সিদ্দিক মিয়ার অর্ধপাকা ঘরে বসবাস করে হাসনাতের পরিবার। কিন্তু আশ্রয়দাতার সঙ্গে প্রতারণা করে হাসনাত। ওই তিন শতক ভূমি হাসনাত কৌশলে নিজ নামে রেজিস্ট্রি করে নেয়। ইতোমধ্যে ক্ষমতাসীন বিএনপির অঙ্গসংগঠন স্বেচ্ছাসেবক দলে যোগ দেয় হাসনাত। আবারো সে ক্ষমতার পাশে চলে আসে। শুরু হয় তার মিশন।

২০০৭ সালের নভেম্বর মাসে ওয়ান ইলেভেনের সরকার ক্ষমতায় এলে হাসনাত নাম লেখায় পুলিশের দালালিতে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসলে সে আবারো ক্ষমতাসীন দলের সিলেটের দুই শীর্ষ নেতার অতি আস্থাভাজন হয়ে উঠে। তাদের ছত্রছায়ায় একের পর এক অপরাধ করতে থাকে হাসনাত। এক ভূমিহীন পরিবারের সন্তান পাখি এখন শীর্ষ ধনী। তার আছে অঢেল জমিজমা, ব্যাংক-ব্যালেন্স, নতুন মডেলের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত গাড়ি। কোনো কিছুরই অভাব নেই হাসনাতের। সে নিমিষেই বশ করতে পারে পুলিশ, সাংবাদিক ও রাজনৈতিক নেতা। তার ক্ষমতার কাছে অনেক প্রভাবশালীও অসহায়।

অভিযোগের পাহাড় হাসনাতের ঘাড়ে। ভুক্তভোগীরা তার বিরুদ্ধে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে বার বার লিখিত অভিযোগ দিয়েও কোনো প্রতিকার পাচ্ছেন না। তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পড়ে আছে সিলেট জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে, পুলিশ কমিশনারের কার্যালয়ে, পুলিশ সুপার কার্যালয়ে,দুদক কার্যালয়ে, ডিবি পুলিশের কার্যালয়ে, সিলেট কোতোয়ালি মডেল থানায়, সদর উপজেলা পরিষদ কার্যালয়ে। এসব অপকর্মের বিস্তর অভিযোগে অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর অনেক তথ্য। জমি দখল, হত্যা মামলা, চোরাচালান, চাঁদাবাজি, প্রতারণা, মাটি চুরি করে বিক্রি, মাদকের মামলা, জাল দলিল তৈরিসহ বিভিন্ন অপরাধের সাথে জড়িত হাসনাত চক্রের বিস্তর বিবরণ দেয়া অনেক সময়ের ব্যাপার। আজ এর অংশবিশেষ তুলে ধরা হলো।

একজন ভূমিহীন ও ছোটোখাটো জমির দালাল থেকে হাসনাত আজ কয়েক কোটি টাকার মালিক। হবেই না কেন। কারণ সে জানে কখন, কাকে, কীভাবে ম্যানেজ করতে হয়।

জানা গেছে, হাসনাত ওরফে পাখির গ্রামের বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলায়। বাবা আব্দুল হাফিজ। পারিবারিক সমস্যার কারণে বাবা-মায়ের ছাড়াছাড়ির পর ২০০১ সালে সে তার মা ও সৎভাই আব্দুল মান্নানকে নিয়ে দক্ষিণ সুরমার খোজারখলা এলাকার একটি কলোনিতে বসবাস শুরু করে। এ সময়ে সে পড়াশোনা করত সিলেট টেকনিক্যাল কলেজে। সে সময়ে আবুল হাসনাত সিলেট টেকনিক্যাল কলেজের শিবিরের কর্মী ছিল। সেখানে থাকাকালীন পরিচয় হয় বাদল নামে এক জমি দালালের সাথে। তখন বাদলের সাথে আবুল হাসনাত শুরু করে জমি দালালির কাজ। জমি দালালির কাজের সুবাদে পরিচয় হয় সদর উপজেলার কল্লগ্রামে সিদ্দিকুর রহমান নামে এক মুহুরির সাথে। ২০০৫ সালে খোজারখলা এলাকায় একটি প্রতারণার কারণে স্থানীয়রা তাকে ও তার পরিবারকে এই এলাকা থেকে বিতাড়িত করেন। বিষয়টি মুহুরি সিদ্দিক রহমানকে জানালে তাকে কল্লগ্রামে স্থান দেন তিনি। আবুল হাসনাত তখন মুহুরি সিদ্দিকের সাথে মুহুরির কাজ করত। ২০০৫ সালে ক্ষমতায় ছিল বিএনপি। তখন এই এলাকায় প্রভাব ছিল স্বেচ্ছাসেবক দলের। নিজের স্বার্থের জন্য তখন সে স্থানীয় এক প্রভাবশালী নেতার ছত্রছায়ায় যোগ দেয় স্বেচ্ছাসেবক দলে একজন কর্মী হিসেবে। শুরু হয় তার অপরাধ। জমি দখল, চোরাচালান, চাঁদাবাজি ও প্রতারণা।

২০০৯ সালে সরকার বদলের পর সে আবার স্বেচ্ছাসেবক দল ছেড়ে আওয়ামী লীগের ছত্রছায়ায়। তৈরি করে তার ভাই আব্দুল মান্নানের নেতৃত্বে নিজস্ব বাহিনী। চলে তার অপকর্ম। মাদক চোরাচালানের সুবাদে শাহপরাণ (র.) থানার একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে তার সখ্য গড়ে উঠে।

তার সব অপকর্মের উপার্জিত সম্পদের মধ্যে জমিজমা তার ভাই আব্দুল মান্নানের নামে ও তার টাকা প্রাইম ব্যাংক লিমিটেডের সিলেট শাখায় অ্যাকাউন্ট নম্বর-২১০৩৮১২৯ ও স্টেট অব ব্যাংক ইন্ডিয়া সিলেট শাখায় অ্যাকাউন্ট নম্বর-০৫৩০০০৫৪২২০০০১ সহ বিভিন্ন ব্যাংকে একাধিক অ্যাকাউন্ট রয়েছে।

২০১০ সালে হাসনাত ও তার সন্ত্রাসী বাহিনী কল্লগ্রামের দুলু মিয়ার বাড়িতে ডাকাতি করতে যায়। দুলু মিয়ার পরিবারের চিৎকারে তখন স্থানীয় জনতা আবুল হাসনাত ও তার ভাই আব্দুল মান্নানসহ তিনজনকে দা’সহ আটক করেন।

হাসনাত ওরফে পাখি নিজেকে সদর উপজেলা যুবলীগের প্রভাবশালী নেতা বলে দাবি করলেও স্থানীয় নেতৃবৃন্দ জানান, সে যুবলীগের প্রাথমিক সদস্যও নয়। যুবলীগের নাম বিক্রি করে কিছু বর্ণচোরা আওয়ামী লীগ নামধারীদের দোসর। হাসনাতের সকল অপকর্ম বিস্তারিত আগামীতে পর্যায়ক্রমে পাঠকের কাছে তুলে ধরা হবে। এদিকে গতকাল শনিবার স্থানীয় একটি পত্রিকায় আবুল হাসনাত তার বিরুদ্ধে প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ জানায়।

এ বিষয়ে দৈনিক সবুজ সিলেট পত্রিকার বার্তা সম্পাদক বলেন, হাসনাতের সাথে সবুজ সিলেট পত্রিকার সম্পাদকের বা কর্মরত সাংবাদিক কর্মকর্তা কারো কোনো ব্যক্তিগত বিরোধ নেই। সংবাদ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রতিবেদকের সাথে আবুল হাসনাতের মুঠোফোনে কথা হয়েছে। সবুজ সিলেট পরিবারের কারো সাথে হাসনাতের কোনো পূর্বপরিচয় নেই। কখনো দেখা বা কথা হয়নি।