বড়লেখায় প্রান্ত হত্যা : একজনের স্বীকারোক্তি, কারাগারে পাঁচ আসামি

29

বড়লেখা প্রতিনিধি
মৌলভীবাজারের বড়লেখায় কলেজ ছাত্র প্রান্ত দাস (১৮) হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার সুমন দাস (৩৫) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। সুমন খুন হওয়া প্রান্তের প্রান্তের পিসতুতো (ফুফাতো) ভাই।

গত মঙ্গলবার বিকেলে বড়লেখা আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম হরিদাস কুমারের খাস কামরায় ১৬৪ ধারায় তিনি এই স্বীকারোক্তি দেন। সুমন দাস বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রামের মৃত করুণাময় দাসের ছেলে।

গত ৩১ অক্টোবর সকালে বড়লেখা উপজেলার বর্ণি ইউনিয়নের মিহারী নয়াগ্রামের পিসির বাড়ির একটি পরিত্যক্ত রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সাথে মুখ বাঁধা ও দন্ডায়মান অবস্থায় প্রান্ত দাসের লাশ পাওয়া যায়। প্রান্ত উপজেলার সুজানগর ইউনিয়নের বাঘমারা গ্রামের সনত দাসের ছেলে। তিনি পিসির বাড়িতে থেকে এম মন্তাজিম আলী কলেজে লেখাপড়া করতেন।

ওই দিন স্থানীয়ভাবে খবর পেয়ে পুলিশ লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে প্রেরণ করে। এই ঘটনায় লাশ উদ্ধারের দিনই একটি অপমৃত্যু মামলা হয়েছিল। পরবর্তীতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে প্রান্তকে হত্যার বিষয়টি উঠে আসে। অন্যদিকে গ্রেপ্তার পিসতুতো ভাই সুমন দাস পুলিশের কাছে প্রাথমিকভাবে স্বীকারের পরই গত সোমবার (১২ নভেম্বর) বিকেলে প্রান্তের বড় ভাই শুভ দাস বাদী হয়ে সুমন দাসকে ১ নম্বর আসামি করে বড়লেখা থানায় ৮জনের নাম উল্লেখ ও ৬জনকে অজ্ঞাতনামা রেখে হত্যা মামলা করেন। মামলা নম্বর-০৯।

সুমন দাস, তাঁর স্ত্রী নিভা রানী দাস, কাকাতো ভাই নিরেশ দাস, নিকেশ দাস ও ভাতিজা চন্দন দাসকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এরা সকলেই এজাহারভূক্ত আসামি। সুমন দাস গত মঙ্গলবার বিকেলে আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন। পরে আদালত গ্রেপ্তার ৫জনকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।

এদিকে লাশ উদ্ধারের দিন থেকেই প্রান্ত দাসের সহপাঠী ও কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁর মৃত্যুর রহস্য উদঘাটনের দাবিতে মিছিল, মানববন্ধন ও ক্লাস বর্জনের মতো কর্মসূচি পালন করেন। পরে স্থানীয় সাংসদ ও থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার (ওসি) পক্ষ থেকে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর পুলিশ দ্রুত সন্দেহভাজনদের আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে। এরপরই চাঞ্চল্যকর এ হত্যারহস্যের জটখুলে।

পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তার সুমন দাস হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। নারী-সংক্রান্ত ঘটনায় ক্ষুব্ধ হয়ে এই হত্যাকান্ড ঘটানো হয়েছে। আসামি আদালতে হত্যার বিবরণ দিয়েছেন। গত ২৯ অক্টোবর রাতে পিসতুতো ভাই সুমন দাস বাজার থেকে বাড়ি ফিরলে পরিবারের এক নারী সদস্যের সাথে আপত্তিকর অবস্থায় প্রান্ত দাসকে দেখতে পেয়ে ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন। সুমন প্রান্তকে ধাওয়া দিয়ে এক পর্যায়ে বাড়ির রাস্তায় গিয়ে ধরে ফেলেন। এরপর মুখ চেপে ধরলে প্রান্ত অজ্ঞান হয়ে পড়েন। তখন প্রান্তর হাত-পা ও মুখ বেঁধে পরিত্যাক্ত রান্না ঘরের খাটের নিচে রেখে দেন। পরে প্রান্তের বড় ভাই শুভ দাসকে ফোন দিয়ে জানান, প্রান্তকে পাওয়া যাচ্ছে না। খবর পেয়ে শুভ সুমনদের বাড়িতে আসেন। তাঁরা একসাথে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেন। এর পরদিন ৩০ অক্টোবর রাত পর্যন্ত প্রান্তকে না পেয়ে শুভ তাঁর মামার বাড়ি একই উপজেলার (বড়লেখা) গাজীটেকা চলে যান। ওই রাতেই পরিত্যাক্ত রান্না ঘরের খাটের নিচ থেকে প্রান্তকে বের করে আনা হয়। তখনও প্রান্ত জীবিত ছিলেন। মুখ বাঁধা থাকায় কথা বলতে পারেননি। পরে রাত আনুমানিক তিনটার দিকে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়। এরপর লুঙি দিয়ে মুখ ও গলা বেঁধে সুমনের কাকাতো ভাই নিকেশের পরিত্যক্ত রান্নাঘরের জানালার গ্রিলের সঙ্গে দাঁড় করিয়ে রেখে দেন। ঘটনাটি আত্মহত্যা বলে চালিয়ে দিতে প্রান্তের মুঠোফোন থেকে কয়েকটি ক্ষুদেবার্তা প্রান্তের সহপাঠী, স্বজন ও ভাইয়ের কাছে পাঠানো হয়। খুনিই ক্ষুদেবার্তা পাঠায়। হত্যার আগে ও পরে ওই ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হয়। হত্যার ঘটনাটি সন্দেহের বাইরে রাখতে লাশের প্যান্টের পকেটে মুঠোফোন রেখে দেন সুমন।

মামলাটির তদন্তকারী ও বড়লেখা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ইয়াছিনুল হক বলেন, ‘সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জাবনবন্দি দিয়েছেন। বলেছে, সে একাই হত্যাকান্ড ঘটিয়েছে। কিভাবে হত্যা করা হয়েছে তারও বিবরণ দিয়েছেন। তবে জাবনবন্দিতে দেওয়া তাঁর তথ্য আরো যাচাই-বাচাই করা হবে। ঘটনার সাথে আর কেউ জড়িত আছে কি-না তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এজাহারনামীয় অন্য আসামীদের ঘটনার সাথে জড়িত থাকার বিষয়টি সুষ্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার চেষ্টা করছি। জবানবন্দি শেষে সুমন ও এজাহার নামীয় আরো ৪ আসামিদের কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আসামিদের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আবেদন করা হবে।’