দলকে শক্তিশালী করা বিএনপির টাগের্ট

22

সবুজ সিলেট ডেস্ক
ঐক্যফ্রন্টের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে সংসদে গিয়েও দাবি আদায় বা আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখা সম্ভব হবে না। এ কারণেই সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ না নেয়ার সিদ্ধান্তে অটল বিএনপি। তবে সংগঠনকে শক্তিশালী করে রাজপথেই সরকারের মোকাবেলা করার প্রাথমিক সিদ্ধান্ত দলটির। এ জন্য সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর বিভিন্ন পরিকল্পনা নিয়ে দলের হাইকমান্ড কাজ শুরু করেছেন। কিন্তু এখনই সরকারের বিরুদ্ধে কঠোর কোনো আন্দোলনে যাওয়ার ভাবনা নেই তাদের।
২০১৪ সালে নির্বাচনে অংশ না নিয়ে পাঁচ বছর সংসদের বাইরে ছিল দেশের অন্যতম বড় রাজনৈতিক দল বিএনপি। এবার নির্বাচনে অংশ নিয়েও থাকা হচ্ছে না সংসদে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ফলাফলের পরপরই তা প্রত্যাখ্যান করে দলটি। ঐক্যফ্রন্টসহ সর্বসাকুল্যে যে সাতজন জয় পান, তারাও নিচ্ছেন না শপথ। নির্বাচনকে প্রহসন আখ্যা দিয়ে ফলাফল প্রত্যাখ্যান করে, এবার নিজেদের অভিযোগ প্রমাণে কাজ করছে তারা। একই সঙ্গে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করা এবং বিদেশি কূটনীতিকদের মাধ্যমে, বিশ্ববাসীর সামনে নিবার্চনে অনিয়মের তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরার চেষ্টা করছে বিএনপি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংগঠনকে শক্তিশালী করাই বিএনপির প্রথম টাগের্ট। সে লক্ষ্যে কাজও শুরু করেছেন তারা। এর অংশ হিসেবে তৃণমূল নেতাকর্মীদের মনোবল চাঙা করতে আগামী মাসে কেন্দ্রীয় নেতারা জেলা সফরে যাওয়ার কথা ভাবছেন। পাশাপাশি ছাত্রদল, যুবদলসহ অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলো ঢেলে সাজানো হবে। তবে এবার কাউন্সিলে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে এসব সংগঠনের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচন করবে বিএনপি। এছাড়া ভোটে অনিয়মের অভিযোগ এনে নির্বাচনি ট্রাইব্যুনালে প্রার্থীদের মামলার পাশাপাশি আন্দোলন কর্মসূচি নিয়েও মাঠে থাকবে। তবে আপাতত কঠোর কোনো কর্মসূচিতে যাবে না তারা। দলটির নীতিনির্ধারণী ফোরামের একাধিক নেতার মতে, বিএনপির সামনে এখন অনেক চ্যালেঞ্জ। বাস্তবতার নিরিখে বিএনপিকে আগামীদিনের পথ চলতে হবে। দল ইতোমধ্যে নিবার্চন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। একই সঙ্গে নেতারা নতুন নিবার্চনের দাবিও জানিয়েছেন। এ দাবি নিয়ে জনগণের কাছে যাবেন। ভোটের অনিয়ম তদন্তে আন্তজাির্তক মহলের কাছেও যাবেন তারা। তবে রাজনৈতিক কমর্সূচিও চালিয়ে যাবেন।
দলের সিনিয়র এক নেতা বলেন, এক যুগ ক্ষমতার বাইরে থাকার পর নির্বাচনের বিপর্যয়ে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মন ভেঙে গেছে।
হামলা-মামলা-নির্যাতনের শিকার হলেও তৃণমূলের নেতাকর্মীরা সুদিনের আশায় ছিলেন। কিন্তু নতুন করে বিপর্যয়ে তারা আরও হতাশ হয়ে পড়েছেন। এ জন্য তাদের চাঙা করাই বিএনপির প্রথম লক্ষ্য। সাংগঠনিকভাবে দল চাঙা হলে পরে ঘুরে দাড়ানো খুব কঠিন হবে না। এ জন্য সংগঠনকে ঢেলে সাজানোর উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। জানা গেছে, ভবিষ্যতে করণীয় ঠিক করতে বিএনপির সিনিয়র নেতারা ইতোমধ্যে আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। খালেদা জিয়ার মুক্তি দাবি ও নতুন নিবার্চনের দাবিতে করণীয় নিয়ে দলের বিভিন্ন মহল থেকে নানা ধরনের মত আসছে। এসব মতামত বিশ্লেষণ করে দলের নীতিনিধার্রকদের পরবর্তী বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, বাস্তবতার নিরিখে বিএনপিকে সামনে পথ চলতে হবে। ভোটে কী হয়েছে তা সবারই বিষয়টি জানা। এ জন্য নির্বাচন ও ফলাফল প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। সামনে একমাত্র লক্ষ্যই হচ্ছে দলকে গোছানো। একই বিষয়ে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল বলেন, রাষ্ট্রীয় সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করে নির্বাচনের নামে যে ভোট ডাকাতি হয়েছে সেগুলো দেশবাসীকে তুলে ধরতে চায় বিএনপি। এছাড়া সংগঠন যে খুব গোছাল অবস্থায় আছে তা বলা যাবে না। এ জন্য সাংগঠনিক ভিত্তি শক্তিশালী করার কাজ শুরু করা হবে শিগগিরই।
এদিকে বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশে টেলিভিশন অনুষ্ঠান এবং টকশোতে যাওয়ার ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার জন্য দলীয় নেতাদের পরামর্শ দিয়েছে বিএনপি। দলটির পক্ষ থেকে একটি গাইডলাইন তৈরি করার উদ্যোগও নেয়া হয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, নিবার্চনের আগে এবং পরে কয়েকটি টেলিভিশনের আচরণ তাদের কাছে পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়েছে। যেখানে এমনকি অনুষ্ঠানের সঞ্চালকরাও একটি পক্ষ নিয়ে বিএনপিকে হেনস্তা করার চেষ্টা করেন বলে তাদের অভিযোগ। তাই টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতে দলের ভাবমূর্তি তুলে ধরতে একটি গাইডলাইন তৈরির জন্য উদ্যোগ নিয়েছে দলটি। গত মঙ্গলবার বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে দলটির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠকে এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয় বলে জানিয়েছেন বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু। তিনি বলেন, নির্বাচন-পরবর্তী অনেক বিষয়ে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা হয়েছে। তার মধ্যে টকশোর বিষয়টিও ছিল। বিভিন্ন টকশোতে যারা পার্টির প্রতিনিধিত্ব করেন বলে বলা হয়, তারা কতটা উপযুক্ত তাদের প্রস্তুতি কেমন, কাদের সঙ্গে যাচ্ছেন, তারা তথ্যনির্ভর কথা বলছেন কিনাÑসে বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, অনেকে আছে সাবেক নেতা বা বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়, কিন্তু তারা আসলে হয়তো এখন আর বিএনপিকে প্রতিনিধিত্ব করেন না। কিছু টেলিভিশন আছে, যেগুলোর লক্ষ্য থাকে বিএনপিকে উদ্দেশ্যমূলক সমালোচনা করা। সেসব ক্ষেত্রে আমাদের যারা ওখানে যান, তাদের আরও সতর্ক, আরও গঠনমূলক এবং তথ্যনির্ভর বক্তব্য নিয়েই সেখানে যাওয়ার জন্য বলা হয়েছে। ‘বিশেষ করে নির্বাচনের অনিয়মের নানা তথ্য সেখানে যেন যথাযথভাবে তুলে ধরা হয়, সে বিষয়ে নেতৃবৃন্দকে গুরুত্ব দেয়ার জন্য বলা হয়েছে। বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে প্রধান করে একটি কমিটি করা হয়েছে, যারা এসব টকশো ও টেলিভিশন অনুষ্ঠানের তথ্য সংগ্রহ করবে এবং নেতাকর্মীদের প্রয়োজনীয় তথ্য জোগান দেবেন। দলটির নেতারা টকশোতে যাওয়ার আগে প্রয়োজনে এ কমিটির সদস্যদের সঙ্গে আলাপ করে যেতে পারবেন। এই কমিটিতে আরও রয়েছেন শামসুজ্জামান দুদু, আবদুস সালাম আজাদ, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ এবং রুমিন ফারহানা। এই কমিটি বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করবেন এবং যারা টকশোতে যাবেন, প্রয়োজনে তাদের পরামর্শ দেবেন।
শামসুজ্জামান দুদু বলেন, ‘কিছু টেলিভিশন আছে যেগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে বিএনপিকে টার্গেট করে থাকে। এগুলো যারা ফেস করতে পারবেন না, তারা যেন সেসব টেলিভিশনে না যান। যারা পারবেন, তারাই যেন যান। তবে কাউকে কোনো টেলিভিশন বা অনুষ্ঠান এড়িয়ে চলতে বলা হয়নি। ওই বৈঠকে অংশ নেয়া বিএনপির নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন নেতা বলেন, যেহেতু আমাদের কথা কাজ বা প্রচারণা ঠিকভাবে নিউজে আনা যাচ্ছে না, তাই টকশো হচ্ছে আমাদের বক্তব্য তুলে ধরার প্রধান জায়গা। তিনি বলেন, আমাদের প্রেস ব্রিফিংয়ের সামান্য অংশই খবরে যায়, সব পেপারও সবাই পড়েন না। এর ফলে টকশো লাইভ অনুষ্ঠান বলে সেখানে বিশ্লেষণ করে আমরা তুলে ধরতে পারি। তিনি আরও বলেন, কিন্তু কিছু চ্যানেল আছে যাদের অতিথি বাছাই হয় একদিকে একপক্ষের কয়েকজন, অন্যদিকে আমাদের পক্ষ থেকে একজন অথবা দুর্বল একজন। সে সঙ্গে অনেক সঞ্চালকও ঠিক সঞ্চালক সুলভ আচরণ করেন না, একটা দলের পক্ষ হয়ে যান। সেজন্য এটা কীভাবে ট্যাকল করা যায়, সবাই যাওয়ার আগে যাতে বিষয়বস্তু জেনে-পড়াশোনা করে যান, দুর্বলতা থাকলে যেন এড়িয়ে যান, নিজের চেহারা দেখাতে গিয়ে যেন দলের ক্ষতি না করেনÑএসব বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। তিনি জানান, যেসব বিষয়ে সাধারণত বিএনপিকে অভিযুক্ত করা হয়, সেসব বিষয়ে সব সময়ই দলের পক্ষ থেকে তথ্য-প্রমাণ প্রস্তুত রাখা হবে, যাতে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে দলের নেতাদের বক্তব্য অভিন্ন হয়। বৈঠকে অংশ নেয়া দলটির নেতারা জানান, দল থেকে যারা টকশোতে যাবেন, কারা প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাদের একটি তালিকা করা হবে। বিএনপির প্রেস কনফারেন্স, বক্তব্য তাদের ই-মেইলে নিয়মিত জানিয়ে দেয়া হবে। আর যারা দলের পদে নেই, তাদের দলীয় পরিচয়ে টকশোতে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করা হবে। এসব নীতিমালা দলটির নেতাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হবে। তবে দলটির পদে নেই, এমন ব্যক্তিরাও চাইলে এ কমিটির সাহায্য নিতে পারবেন। টেলিভিশনের বিভিন্ন টকশোতে আরও অনেকের মতো বিএনপিকে উপস্থাপন করে থাকেন ডা. সাখাওয়াৎ হোসেন সায়ন্থ। তিনি বলেন, দল থেকে বলা হয়েছে, যেহেতু এ মুহূর্তে সংবাদ মাধ্যম যেহেতু অত্যন্ত নিয়ন্ত্রিত এবং আইনের জালে আমরা বন্দি, সেই বিবেচনায় আমাদের বলা হয়েছে যেন আমরা দলের পক্ষ থেকে যথাযথ সঠিক তথ্য উপস্থাপন করি। যারা দলের হয়ে বা দলের পক্ষ থেকে টকশোতে যান, তারা সবাই যেন লেখাপড়া করে, জেনে-বুঝে সঠিক তথ্য-উপাত্ত নিয়ে যান এবং ভালোভাবে বা মোকাবেলা করতে পারেন।