দুর্নীতিবাজদের জন্য ভুল বার্তা!

20

দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (টিআইবি) প্রতি বছরই বিশ্বব্যাপী ‘দুর্নীতির ধারণাসূচক’ প্রকাশ করে থাকে। সংস্থাটি এবারো সে রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। এদিক দিয়ে আগের বছরের তুলনায় অবনতি হয়েছে ছয় ধাপ। এই রিপোর্ট প্রকাশের মাত্র কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এবার সরকার নয়, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে বাংলাদেশের ‘স্বাধীন দুর্নীতি দমন সংস্থা’ দুদক। এর চেয়ারম্যান ইকবাল মাহমুদ বাংলাদেশে দুর্নীতি যে বেড়েছে, তার ব্যাখ্যা চেয়েছেন সংস্থাটির কাছে। তিনি বলেছেন, “প্রতিবেদন দেয়ার নামে ‘সুইপিং কমেন্টস’ বা যাচ্ছেতাই মন্তব্য করলেই হবে না। তথ্য-উপাত্তসহ প্রমাণ দিতে হবে।”

দুদক চেয়ারম্যানের প্রতিক্রিয়া হোঁচট খাওয়ার মতো। অনেক নাগরিক মন্তব্য করেছেন, টিআইয়ের কাছে দুদক চেয়ারম্যানের ব্যাখ্যা চাইলে দুর্নীতিগ্রস্তদের কাছে ভুল বার্তা যাবে। আগে সাধারণত দেখা গেছে, টিআইয়ের রিপোর্ট প্রকাশের পর সরকার এর প্রতিবাদ বা চ্যালেঞ্জ জানায়। জবাবে টিআই নিজের রিপোর্টের স্বপক্ষে বক্তব্য উপস্থাপন করে।

সাধারণত দুর্নীতি রোধে যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে আসছে, দুদক তাদের সহযোগিতা করে থাকে। দেখা গেছে, দুদকের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী দুর্নীতিবিরোধী প্রচার চালানো হয়েছে। গণমাধ্যমে দুর্নীতির অনুসন্ধানী রিপোর্ট প্রকাশের জন্য দুদক সংশ্লিষ্ট সাংবাদিককে পুরস্কৃত করেছে। যে সব সংস্থা দুর্নীতি নিয়ে কাজ করে, তাদের পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। এবার টিআইবির রিপোর্ট প্রকাশের পর কেন এই ব্যতিক্রম, তা অবাক করার মতোই।

পরপর তৃতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হয়ে জাতির উদ্দেশে প্রথম ভাষণে শেখ হাসিনা বলেছেন, “কঠোর হাতে দুর্নীতি উচ্ছেদ করব। দুর্নীতি নিয়ে সমাজের সর্বস্তরে অস্বস্তি রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকার ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করেছে (প্রথম আলো)।’’ দুর্নীতি নিয়ে সরকারপ্রধান যেখানে এ বক্তব্য দিয়েছেন, সেখানে টিআইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে দুদকের তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া অনেকের কাছেই ভুল বার্তা মনে হচ্ছে। তা ছাড়া টিআইয়ের প্রতিবেদন ‘সুইপিং কমেন্টস’ বলে মনে হচ্ছে না। যতটুকু জানা গেছে, সুনির্দিষ্ট নীতিমালা অনুসরণ করে টিআই এ রিপোর্ট প্রকাশ করে থাকে। টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, দুর্নীতিসংক্রান্ত ধারণা সূচকটি ১৯৯৫ সাল থেকে প্রণীত হয়ে আসছে। সূচকটি টিআইয়ের বার্লিনভিত্তিক সচিবালয়ের গবেষণা বিভাগ কর্তৃক প্রণীত। করাপশন পারসেপশনস ইনডেক্স বা সিপিআইয়ের পদ্ধতি নির্ধারণ, স্কোর পর্যালোচনা এবং তথ্য বিশ্লেষণের যথার্থতা যাচাই করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিসংখ্যান ও রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, লন্ডন স্কুল অব ইকোনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সের মেথোডলজি ইনস্টিটিউট, প্রাগ বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লস ইনস্টিটিউট এবং জার্মান ইনস্টিটিউট অব ইকোনমিক রিসার্চের হেরসি স্কুল অব গভর্ন্যান্সের বিশেষজ্ঞরা। যে আটটি সূচক নিয়ে এবারের সূচকে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে, এগুলো হলো- ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরাম এক্সিকিউটিভ ওপিনিয়ন সার্ভে, ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের কান্ট্রি রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট, বার্টলসম্যান ফাউন্ডেশন ট্রান্সফরমেশন ইনডেক্স, গ্লোবাল ইনসাইট কান্ট্রি রিস্ক রেটিংস, পলিটিক্যাল রিস্ক সার্ভিসেস ইন্টারন্যাশনাল, কান্ট্রি রিস্ক গাইড, বিশ্বব্যাংকের কান্ট্রি পলিসি অ্যান্ড কনস্টিটিউশনাল অ্যাসেসমেন্ট, ওয়ার্ল্ড জাস্টিস প্রজেক্টের রুল অব ল’ ইনডেক্স এবং ভ্যারাইটিজ অব ডেমোক্র্যাটিক ডাটা সেট। সংগৃহীত তথ্যের মেয়াদ ২০১৬ থেকে সেপ্টেম্বর ২০১৮ পর্যন্ত। অর্থাৎ গত তিন বছরের।

দুর্নীতিই কি বাংলাদেশের নিয়তি!
দুর্নীতির কলঙ্কতিলক বাংলাদেশের কপালে লেগেই আছে। ১৯৯৬-২০০১ সালে আওয়ামী লীগের প্রথম শাসনামলে বাংলাদেশ বিশ্বের ‘এক নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে টিআইয়ের রিপোর্টে এসেছিল। সেই ধারাবাহিকতা রয়ে যাচ্ছে।

জার্মানির বার্লিনভিত্তিক টিআইয়ের ২৯ জানুয়ারি ২০১৯ প্রকাশিত রিপোর্ট অনুযায়ী, বাংলাদেশে দুর্নীতি বেড়েছে। আগের বছরের তুলনায় ২০১৮ সালে অবনতি হয়েছে ছয় ধাপ। সূচক অনুযায়ী ১০০ নম্বরের মধ্যে বাংলাদেশ ২০১৭ সালে পেয়েছিল ২৮। এক বছরের ব্যবধানে ২০১৮ সালে দুই পয়েন্ট কমে স্কোর হয়েছে ২৬। সূচকের স্কেলের শূন্য স্কোর ‘সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত’ এবং ১০০ স্কোরকে ‘সবচেয়ে কম দুর্নীতিগ্রস্ত’ বা ‘সর্বাধিক সুশাসনের দেশ’ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এবার স্কোর অনুযায়ী- ১৮০টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ভালো থেকে খারাপের দিকে ১৪৯তম। আগেরবার এটা ছিল ১৪৩তম। এর অর্থ, ফলে বাংলাদেশ ছয় ধাপ পিছিয়েছে। আবার নিচ থেকে ওপরের দিকে অবস্থান ১৩তম। বাংলাদেশের সাথে একই অবস্থানে আছে আফ্রিকার দেশ মধ্য আফ্রিকা প্রজাতন্ত্র ও উগান্ডা। গত বছরের রিপোর্টে বাংলাদেশ ছিল ১৭তম। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ চার ধাপ পিছিয়েছে। বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে এশিয়ার চতুর্থ সবনি¤œ এবং দক্ষিণ এশিয়ার দ্বিতীয় সর্বনিম্ন অবস্থানে রয়েছে। অর্থাৎ এশিয়ায় বাংলাদেশের চেয়ে দুর্নীতি বেশি তিনটি দেশে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্নীতিতে বাংলাদেশের চেয়ে খারাপ অবস্থা একটি দেশে, সেটি হলো আফগানিস্তান।

বাংলাদেশে দুর্নীতি নিরুপণে টিআইয়ের সূচকে ব্যবহৃত মূল প্রতিপাদ্য ছিল- ঘুষ আদান-প্রদান, স্বার্থের সঙ্ঘাত ও তহবিল অপসারণ; দুর্নীতিবিরোধী উদ্যোগ ও অর্জনে বাধা প্রদান; ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক দলের স্বার্থে সরকারি পদমর্যাদার অপব্যবহার; প্রশাসন, কর আদায়, বিচার বিভাগসহ সরকারি কাজে বিধি বহির্র্ভূত অর্থ আদায়, অনিয়ম প্রতিরোধে এবং দুর্নীতিবাজদের বিচার করতে সরকারের ব্যর্থতা, ইত্যাদি।
শুধু টিআইয়ের রিপোর্টই নয়। ওই রিপোর্ট প্রকাশের একদিন আগে ২৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআই তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ থেকে ২০১৫ সালে প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে। পাচারের দিক থেকে ১৪৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ ১৯তম। অবশ্য ২০১৪ সালে পাচার হয়েছিল আরো বেশি- সাড়ে ৭৬ হাজার কোটি টাকা। গত কয়েক বছর ধরে জিএফআই অর্থ পাচারের এ ধরনের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। এবারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মাধ্যমে ৫৯০ কোটি ডলার অর্থাৎ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি অর্থ পাচার হয় চীন থেকে। ২০১৫ সালে বাংলাদেশ থেকে যে পরিমাণ টাকা পাচার হয়েছে, তা দিয়ে পদ্মা সেতু ও মেট্রোরেল প্রকল্পের মতো দুটো প্রকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব বলে গণমাধ্যমে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে।

কয়েক বছর ধরেই দেখা যাচ্ছে, দুর্নীতিবাজেরা এলসি খোলার অজুহাতে দুর্নীতির মাধ্যমে অর্জিত টাকা বিদেশে পাচার করছে। মেশিনারিজ পণ্য বা ভারী যন্ত্রপাতি আনার জন্য ঋণপত্র খোলা হয়। কিন্তু ঋণপত্র বা এলসি অনুযায়ী দেশে পণ্য আসেনি। এ বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর সঠিক নজরদারি করেনি। আবার নজরদারি করলেও অদৃশ্য ইশারায় তা বন্ধ করে দেয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন রিপোর্টে অভিযোগ এসেছে।

গত বছরের ৭ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ সিপিডি ব্যাংকিং খাত নিয়ে এক সংলাপের আয়োজন করেছিল। ওই অনুষ্ঠানে সিপিডির এ সংক্রান্ত গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরা হয়েছিল। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন প্রতিবেদন তুলে ধরে বলেন, বড় কয়েকটি ঋণজালিয়াতির ঘটনায় গত ১০ বছরে ব্যাংক খাতে সাড়ে ২২ হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এই জালিয়াতির বেশির ভাগই রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে। এর মধ্যে এককভাবে শুধু জনতা ব্যাংকে সবচেয়ে বেশি ১০ হাজার কোটি টাকার জালিয়াতি ঘটেছে। এ ছাড়া সোনালী, বেসিক, ফারমার্সসহ বিভিন্ন ব্যাংকেও বড় বড় জালিয়াতি হয়েছে। নিয়ম ভেঙে ব্যাংক থেকে এসব লুটপাট হচ্ছে।

গত এক যুগ ধরেই বাংলাদেশের দৈনিকগুলোর নিত্যদিনের নিউজ আইটেম হয়ে আসছে দুর্নীতির খবরগুলো। টিআইবি নবম সংসদের সদস্যদের নিয়ে রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছিল, ওই সংসদের ৯৩ শতাংশ সংসদ সদস্যই দুর্নীতি তথা অনৈতিক কাজের সাথে জড়িত। ওই রিপোর্ট তৎকালীন এমপিদের মধ্যে প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। এতটাই ক্ষুব্ধ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছিল যে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির ভুয়া নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদের এমপিদের নিয়ে টিআইবি রিপোর্ট প্রকাশ করতে ‘সাহস করেনি’।
২০১৮ সালে টিআইয়ের গ্লোবাল রিপোর্ট প্রকাশকালে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেছিলেন, এখন ‘হাই প্রোফাইল দুর্নীতি’ হচ্ছে। উন্নয়নের নামে বড় বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।

প্রকল্প ব্যয় কিছুদিন পর পরই লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়ে যায়। রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল দুর্নীতি দেশে ওপেন-সিক্রেট একটি বড় স্কেলের দুর্নীতি। তেমনি শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, ব্যাংক লুটপাট, টেলিকমিউনিকেশন গেটওয়ে লাইসেন্স দেয়ার নামে দুর্নীতি, ভিওআইপি, হলমার্ক, ডেসটিনি, ইত্যাদি বড় বড় দুর্নীতির নাম। ছোটখাটো দুর্নীতি গা-সওয়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। কানাডায় ‘বেগম পল্লী’, মালয়েশিয়ায় ‘সেকেন্ড হোম’ প্রজেক্টসহ বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশের দুর্নীতিগ্রস্তদের নামে সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠার খবর মুখে মুখে চালু রয়েছে। এসব অনুসন্ধান করলে দুদক সহজেই পেয়ে যাওয়ার কথা।

২০০১ সালের জুনে টিআই বাংলাদেশকে বিশ্বের ‘১ নম্বর দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ’ হিসেবে তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেছিল। তখন ক্ষমতায় ছিল আওয়ামী লীগ। একই বছরের অক্টোবর মাসে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। পরপর আরো তিন বছর টিআইয়ের রিপোর্টে বাংলাদেশের দুর্নীতির অবস্থান অক্ষুণ্ন থাকে। উল্লেখ্য, টিআই যে বছর রিপোর্ট প্রকাশ করে, পরিসংখ্যানটি এর দু’বছর আগের। অর্থাৎ দুর্নীতির খতিয়ানটি প্রকাশের আগের দুই-তিন বছরের। সে হিসাবে পর পর তিনবার বাংলাদেশ দুর্নীতিতে শীর্ষ হওয়ার জন্য তখনকার ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার দায়ী এবং শেষের এক বছর বিএনপি সরকারকে দায়ী করা যায়। দুর্নীতির এ অবস্থা কমে এলে আবার তা বাড়া শুরু করেছে। বাংলাদেশ দুর্নীতিতে আবার ‘চ্যাম্পিয়ন’ হোক, তা দেশের কোনো মানুষই চান না। তাই দুর্নীতির লাগাম অবিলম্বে টেনে ধরতেই হবে।
গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রণে নতুন নতুন আইন করা হয়েছে। সর্বশেষ আইনটি হচ্ছে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’।

এসব আইনের কারণে গণমাধ্যমে ভীতি কাজ করছে। টিভি চ্যানেলগুলো সরকারি গোয়েন্দা নজরদারির কারণে কাজই করতে পারছে না। দৈনিকগুলোর প্রতিবেদনের দিকে তাকালেও ভীতির ব্যাপারটি বোঝা যায়। এ অবস্থায় টিআই এবং জিএফআইয়ের প্রতিবেদন নিয়ে দুদক চেয়ারম্যান কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নেতিবাচক যে মন্তব্য করেছেন, তাতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে রিপোর্ট প্রকাশে ভীতি আরো ছড়িয়ে পড়বে। টিআই এবং জিএফআইয়ের প্রতিবেদন সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে দুদক চেয়ারম্যান বলেছেন, ‘গালভরা প্রতিবেদন সবাই দিতে পারে।’ বলা প্রয়োজন- ওই দুটো সংস্থা বিশ্বের খুবই ক্রেডিবল বা বিশ্বাসযোগ্য সংস্থা। যেসব প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতা নিয়ে তারা রিপোর্ট তৈরি করে থাকে, সেসব প্রতিষ্ঠান বিশ্বস্বীকৃত।

দুদক চেয়ারম্যান আরেকটি কথা বলেছেন, ‘দুর্নীতির এ মহাসমুদ্রে আমি কাকে ধরব? কাকে খুঁজব?’ এ জন্যও তো ওইসব সংস্থার সহযোগিতা তাদের একান্ত প্রয়োজন। ওইসব সংস্থার সহযোগিতা নিয়ে তাকে, মানে দুদককে এগুতে হবে। শুধু সরকারের মুখরক্ষার চিন্তায় থাকলে তো চলে না। বিএনপি ক্ষমতায় নেই ২০০৬ সালের নভেম্বর থেকে। সেটা ১২ বছর আগের কথা। তবু দুদক এক যুগ আগের দুর্নীতি নিয়েই ব্যস্ত। গত এক যুগে যে পাহাড় পরিমাণ দুর্নীতি হয়েছে যা দুদক চেয়ারম্যানের ভাষায়- ‘দুর্নীতির মহাসমুদ্র’, তাদেরও তো ধরা উচিত। একটি মামুলি মামলায় তিনবারের প্রধানমন্ত্রী, ৭৪ বছর বয়স্ক দেশের প্রবীণ রাজনৈতিক নেত্রী বেগম খালদা জিয়াকে নাজিমুদ্দীন রোডের পরিত্যক্ত কেন্দ্রীয় কারাগারে একমাত্র বন্দী হিসেবে এক বছরেরও বেশি সময় ধরে রাখা হয়েছে, তা কি সীমা লঙ্ঘন নয়? বড় দুর্নীতি ধরার কাজ বাদ দিয়ে দুদক আজ হাসপাতালে ডাক্তার গেল কি গেল না তা নিয়ে ব্যস্ত? এ কাজের জন্য তো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় আছে। এসব করে সাময়িক বাহবা পাওয়া যায়। স্বাভাবিক কারণেই জনগণের মধ্যে গুঞ্জন উঠেছে, প্রকৃত দুর্নীতিবাজদের আড়াল করতে ওইসব কাজে উৎসাহিত হচ্ছে দুদক। এসব নিয়ে ব্যস্ত থাকলে দুর্নীতিবাজরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যেতে পারে। ‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ হিসেবে একসময় খ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়টির গবেষণা ও শিক্ষার মান পড়ে গেলেও সেদিকে খেয়াল না করে ভিসি কম দামে চা-সিঙ্গারা খাওয়ানো নিয়ে বেশি ব্যস্ত!

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক; সাবেক সাধারণ সম্পাদক,

জাতীয় প্রেসক্লাব