কালাম-হাবিবে সিলেট আওয়ামী লীগে অসন্তোষ

888

   ॥ সিলেটে তারেকের ছায়াসঙ্গী ছিলেন হাবিব
   ॥ ছাত্রলীগ নেতার কব্জি কেটে দেয় কালাম বাহিনী
   ॥ বিএনপির দাবি, তারা আদর্শচ্যুত
   ॥ দু’জনের ব্যাপারে শীঘ্রই সিদ্ধান্ত : জেলা আ.লীগ
নুরুল হক শিপু:
সিলেটে বিএনপির দুই ইউনিয়ন চেয়ারম্যানের যোগদানে আওয়ামী লীগে চরম অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের পর বিএনপির আলোচিত দুই ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগে যোগ দেয়ায় অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে।
দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কুচাই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কালাম ও বরইকান্দি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান হাবিব হোসেন আওয়ামী লীগের বিশাল জয়ের পর সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর হাতে ফুল দিয়ে এমপিকে সংবর্ধনার মাধ্যমে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আবুল কালাম জেলা বিএনপির উপদেষ্টা এবং হাবিব হোসেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলা বিএনপির সাবেক সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। দুজনই গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ধানের শিষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করে বিজয়ী হন। এর মধ্যে আবুল কালাম টানা চার বার এবং হাবিব হোসেন টানা দুইবার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
এদিকে, আবুল কালাম ও হাবিব হোসেনের যোগদানের খবর পেয়েই বিএনপি থেকে তাদেরকে এক বিবৃতির মাধ্যমে বহিষ্কার করা হয়। কুচাই ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালামকে জেলা বিএনপির উপদেষ্টা থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, আর হাবিব হোসেন বিএনপির কেউ নন বলে বিএনপির বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়। আর বিএনপির এ দুই চেয়ারম্যান হুট করে আওয়ামী লীগে যোগদারে বিষয়টি জানেন না জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের শীর্ষ কোনো নেতা।
সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান বলেন, ‘বিএনপি নেতা আবুল কালাম চেয়ারম্যান ও হাবিব হোসেনের যোগদানের ব্যাপারে কেউ আমাদের কিছু জানায়নি। সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী তাদেরকে যোগদান করিয়েছেন। এই দুই চেয়ারম্যান সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের চরম বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, তাদের যোগদানের প্রক্রিয়াটাও ব্যতিক্রম। এমপি সামাদ চৌধুরীর উচিত ছিল উপজেলা আওয়ামী লীগকে সাথে নিয়ে আমাদের কাছে আসা। তা করা হয়নি। সুতরাং জেলা আওয়ামী লীগ বিএনপির এই দুই চেয়ারম্যানের ব্যাপারে কিছু জানে না। আমরা এই দুজনের ব্যাপারে পরবর্তী বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেব।’
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সদস্য ও সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান বলেন, ‘আবুল কালাম ও হাবিব হোসেন আওয়ামী লীগে যোগদান করায় আমাদের দলীয় নেতাকর্মীদের মাঝে চরম ক্ষোভ বিরাজ করছে। ক্ষোভের অন্যতম কারণ হচ্ছে, সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ বিশাল জয় পেয়েছে, এই জয়ের জন্য দলীয় নেতাকর্মীরাই দিনরাত কাজ করেছেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাদের এই যোগদানে দলের অধিকাংশ নেতাকর্মীদের মর্মাহত করেছে। তিনি বলেন, তারা যদি যোগদান করতেই চেয়েছিলেন কেন নির্বাচনের আগে করলেন না? তারাতো নির্বাচনের সময় বিএনপির জন্য কাজ করেছেন। কামরান বলেন, তাদের এই যোগদান কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ কীভাবে নেবে তা এই মুহূর্তে বলা যাচ্ছে না। তবে এটি বলতে পারি, বিএনপি থেকে আওয়ামী লীগে যোগদানের ব্যাপারে কেন্দ্রীয় কোনো নির্দেশনা আমাদের কাছে আসেনি। কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আগে তাদেরকে আওয়ামী লীগের কেউ বলা যায় না।’
দক্ষিণ সুরমা উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মো. রইছ আলী বলেন, ‘দুজন ধানের শিষ নিয়ে ইউনিয়ন চেয়ারম্যান হয়েছেন। সংসদ নির্বাচনে ধানের শিষের হয়ে দিনরাত কাজ করেছেন। এখন সুবিধাভোগের জন্য আওয়ামী লীগে এসেছেন। তিনি বলেন, তারা বিএনপিকে শেষ করে এখন আওয়ামী লীগকে ধংস করতে এসেছে। তাদেরকে আমি প্রত্যাখান করেছি। এদেরকে দলে স্থান না দিতে উপজেলা আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জেলা আওয়ামী লীগের কাছে আবেদন করা হবে। প্রয়োজনে আমরা জননেত্রী শেখ হাসিনার সাথে দেখা করে প্রতিকার চাইব।’
গত ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে কুচাই ইউনিয়নে নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচন করেন মহানগর যুবলীগের সিনিয়র সদস্য জাকিরুল আলম জাকির। তিনি বলেন, ‘হাবিব হোসেনের সাথে বিএনপির তারেক রহমান ও সাদেক হোসেন খোকার গভীর সম্পর্ক ছিল। তা অনেকেরই জানা। আর কালাম চেয়ারম্যান অবৈধভাবে বাস টার্মিনালে তাজ মহল রেস্টুরেন্ট করে আলোচনায় আসেন। তিনি ছাত্রলীগের শাহিন আহমদের উপর হামলাও করিয়েছিলেন। তার হাতের কবজি কেটে দেন। সেই হাত এখনো পুরোপুরি ভালো হয়ে ওঠেনি। এমন ব্যক্তিদের দলে ঠাঁই না দিতে শীর্ষ নেতাদের এবং দলীয় প্রধান জননেত্রী শেখ হাসিনার প্রতি অনুরোধ জানান তিনি। জাকির বলেন, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা দেখে আগামী ইউনিয়ন নির্বাচনে তারা নৌকা পেতে এই পথ ধরেছে। আওয়ামী লীগে তাদের আগমন শুধুই স্বার্থের।’
সিলেট জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আলী আহমদ বলেন, ‘একবার আমাদের নেতা তারেক রহমান দক্ষিণ সুরমার সিলাম এলাকায় আসেন। তখন তার সাথে সাথে ছিলেন হাবিব হোসেন। আলী আহমদ বলেন, দুজনকেই দলের শীর্ষ নেতারা চিনেন জানেন। তাই গেল ইউনিয়ন নির্বাচনে তাদের হাতেই ধানের শিষ তুলে দেয়া হয়। তারা দল ত্যাগ করে প্রমাণ করলেন তারা আদর্শচ্যুত ও ক্ষমতার লোভী। তাদেরকে বিএনপি প্রত্যাখ্যান করেছে।’
সিলেট জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক অ্যাডভোকেট ফখরুল হক বলেন, ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম ও হাবিব হোসেনকে বিএনপি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। দলের আদর্শ-পরিপন্থি কাজে জড়িত থাকার অভিযোগে জেলা বিএনপির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদেরকে প্রাথমিক সদস্যসহ সব পদ থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।