হারিয়ে যাচ্ছে টাইপরাইটার ঃ কদর নেই টাইপিষ্টদের

36

দীর্ঘ একটা সময় ধরে বাঙালির চাকরি জীবনের অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক ছিলো যে যন্ত্রটির সঙ্গে তা হল টাইপরাইটার। এটি একটি যন্ত্র, যার সাহায্যে কিবোর্ড চাপ দিয়ে কাগজে লেখা যায়। অধুনালুপ্ত এই টাইপরাইটার ১৮৬০ সালে যখন আবিষ্কৃত হয়, তখন থেকেই পৃথিবীর লিখন ও দলিল-পদ্ধতি সংরক্ষণে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছিল। টাইপরাইটরের অপর নাম মুদ্রাক্ষরিক। কম্পিউটারের এই যুগে হারিয়ে যেতে বসেছে সেই টাইপরাইটার সরকারি-বেসরকারি সব দপ্তরেই। তাই অতি প্রয়োজনীয় যন্ত্রটি প্রায় অদৃশ্যমান। ফলে শোনা যায়না মেশিনের ঠক ঠক শব্দ। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতেও পাওয়া যায়না ‘টাইপিস্ট-ক্লার্ক’ বা মুদ্রাক্ষরিক সহযোগী পদটি। এর বদলে স্থান করে নিয়েছে কম্পিউটার অপারেটর পদবী। ৭০-এর দশক থেকে অফিসগুলোতে টাইপরাইটারের জায়গায় দখল করতে থাকে কম্পিউটার। সরকারি অফিসে কম্পিউটার অনেক দেরিতে আসলেও বেসরকারি অফিসে টাইপরাইটারের বিক্রি উল্লেখযোগ্য হারে কমে যায়। এ কারণে ১৯৯০ সালে বিশ্বখ্যাত কোম্পনি আইবিএম তাদের টাইপরাইটার উৎপাদনের ইউনিটটি অন্য একটি কোম্পানির নিকট বিক্রি করে দেয়। তবে সরকারি অফিসগুলোতে টাইপরাইটারের দাপট চলতে থাকে। ২০০৮ সালে নিউইয়র্ক নগর কর্তৃপক্ষ তাদের পুলিশ বিভাগের জন্য কয়েক হাজার টাইপরাইটার কিনেছে। অফিসগুলোতে কম্পিউটার দ্রুত জায়গা দখল করে নিলেও পৃথিবীর অনেক দেশে এখনো টাইপরাইটার চলছে। এর মধ্যে ল্যাটিন আমেরিকা এবং দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলো অন্যতম। বাংলাদেশে এখনো সীমিত আকারে টাইপরাইটারের প্রচলন রয়েছে। ২০১১ সালের এপ্রিল মাসে ভারতের কোম্পানি গোদরেজ তাদের কারখানা বন্ধ করে দেয়। ২০১২ সালের নভেম্বর মাসে যুক্তরাজ্যের ব্রাদার্স কোম্পানি দাবি করে, পৃথিবীর সর্বশেষ টাইপরাইটারটি তারাই বানিয়েছে। পরে তারা সেটি লন্ডনের সায়েন্স মিউজিয়ামে জমা দেয়।

নগরীতে ‘ ৯০-এর দশকেও টাইপরাইটাদের ব্যস্ততা চোখে পড়তো। সিলেট শহরে সাব রেজিস্ট্রার অফিসের সামনে লাইন ধরে টেবিলে মেশিন বসিয়ে চেয়ারে বসে থাকা টাইপরাইটাদের কথা বলার সময়ও থাকতো না। একজন গ্রাহকের পিছনে দাঁড়িয়ে থাকতো আরো কয়েকজন গ্রাহক। ফরম পূরণ, মামলা-মোকদ্দমার দলিল তৈরি, জায়গা-জমির রেজিস্ট্রেশন ফরম লেখাসহ নানা প্রয়োজনে তারাই ছিল ভরসা। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় তাদের কাছে গ্রাহকরা আসছে না। ফলে কমে গেছে তাদের আয়, দিন কাটছে কষ্টে। এরপরও সংখ্যায় কম হলেও মাঝ-বয়সী ও বয়স্ক কয়েকজন টাইপরাইটার ধরে রেখেছেন তাদের পুরনো পেশা। সারাদিন বসে থেকে দু’একটা দলিল কিংবা চিঠিপত্র লিখে সময় পার করছেন তারা। পাশপাশি দলিল, স্ট্যাম্প বিক্রির কাজও করছেন। আবার অনেক গ্রাহক আছেন যারা এখনো কম্পিউটারের চেয়ে টাইপরাইটারে কম্পোজ করাতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তাদের কারণে টাইপিস্টরা কিছু কাজ পাচ্ছেন। এক পৃষ্ঠা টাইপ করতে তারা নিতেন ১০ টাকা। আর ইলেক্ট্রনিক টাইপ মেশিনে নেন ১৫ টাকা থেকে ২০ টাকা। বাংলা বা ইংরেজি উভয় ভাষাতেই টাইপ করা গেলেও এতে অনেক ভুল থেকে যায়। অপরদিকে কম্পিউটারে দ্রুতগতিতে টাইপের পাশাপাশি ভুল হলে তা সংশোধন করে নেয়াটাও অনেক সহজ। তাই নতুন যুগের প্রযুক্তির সাথে তাল মেলাতে চান সবাই।

সাবরেজিস্ট্রারি অফিসের টাইপিস্ট শাহ মন্নান ১৯৮২ সাল থেকে এই পেশায় আছেন। একসময় ভালো আয় হতো। এখন আর সেদিন নেই। ২০০০ সালের দিকে ম্যানুয়েল ‘গভর্নর্স ল্যান্ড’ মেশিন বিক্রি করে ইলেক্ট্রিক টাইপরাইটার কিনে ছিলেন তিনি। একটি ইলেক্ট্রিক মেশিনের দাম ছিল ৪০-৫০ হাজার টাকা। আর ম্যানুয়েল মেশিন পাওয়া যেত মাত্র ৫ হাজার টাকায়। পুরোনো মেশিন পাওয়া যায় যেত এক থেকে দুই হাজার টাকায়। তখনও মোটামোটি আয় হতো। আর এখন কম্পিউটারের কারণে কাজ কমে গেছে। সারাদিন বসে থেকে ঘরের বাজার খরচও উঠেনা। অতীতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, ‘সূর্যের তাপ থেকে রক্ষার জন্য নিজের চাইতেও বেশি টাইপরাইটারের যতœ নিতাম। যন্ত্রটা কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখতাম। এখন এসবের কদর নেই, তাই ধুলো জমছে। চারপাশে সহকর্মীদের কত ব্যস্ততা ছিল। চায়ের কাপে চুমুক দেওয়ার মতো সময় ছিল না কারো। সারাদিন তাদের আঙুলগুলো চলতেই থাকত। সারাক্ষণ টাইপিং এর শব্দ শোনা যেত। এখন বসে বসে সময় কাটে।’ সঞ্জীবন নামের আরেক টাইপিস্ট বলেন, ‘২০ বছর আগেও এই শহরের রাস্তায় প্রায় ২ হাজার টাইপিস্ট ছিল। এখন সেখানে মাত্র ২০-৩০ জনের মতো লোক এ কাজে নিয়োজিত আছেন। আর কয়েক বছর পর যদি এখানে কেউ আসে তবে তাদের কাউকেই হয়তো দেখা যাবে না। এই আধুনিক যুগের সহজলভ্য কম্পিউটার টাইপরাইটারদের পেশাকে ধক্ষংস করে দিয়েছে। এ পেশায় থেকে ছেলে-মেয়েকে লেখাপড়া শিখানো হত। কিন্তু তাদের কখনো এই কাজ করতে উৎসাহ দেয়া হয়ন্।ি এই করে জীবনটা প্রায় পার করে দিলেন তিনি। জীবনবৃত্তান্ত আর প্রেমপত্র লিখে পেট ভরেনা। এখন চাইলেও ভিন্ন পেশায় চলে যেতে পারবনা।’ কোর্ট এলাকার টাইপিস্ট সিরাজ জানালেন আগে এসএসসি পাস করার পর চাকরি না পেলে তরুণ কিংবা যুবকরা প্রশিক্ষণ নিয়ে টাইপরাইটার চালানো শিখতো। তারপর বিভিন্ন অফিসে বা ব্যক্তিগতভাবে টাইপিস্ট হিসাবে কাজ করতো। কিন্তু কম্পিউটারের কারণে টাইপরাইটার মেশিন প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারছে না। এখন গড়ে প্রতিদিন দুই থেকে আড়াই শ’ টাকা আয় হয়। নানান ডিজাইনের লেখার জন্য টাইপিস্টদের কাছে কেউ আসতে চায় না। তবুও পুরনো পেশা ছাড়তে পারছে না বলেই প্রতিদিন নিয়ম করে টাইপিস্টরা গ্রাহকের আশায় বসে থাকেন। টাইপিস্টরা জানান, টাইপরাইটারে কম্পোজের জন্য রিবন পেপার, কার্বন পেপার ও সাদা কাগজ কিনতে হয়। ইলেক্ট্রিক মেশিনের জন্য দিতে হয় মাসিক একশ’ টাকা হারে বিদ্যুৎ বিল, সাধারণ মেশিনের জন্য দিতে হয় ৫০ টাকা। নগরীর কয়েকটি ব্যাংক, অফিস ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দেখা গেছে ধুলো জমা টাইপরাইটার। এগুলো ব্যবহার না থাকায় বিক্রি করে দেয়ার চিন্তাভাবনাও চলছে। টাইপরাইটারে কম্পোজ করাতেই পছন্দ করেন এমন একজন গ্রাহক মিজানুল ইসলাম বলেন, কম্পিউটারের চাইতে টাইপরাইটারের লেখাগুলোকে প্রাণবন্ত মনে হয়। ইলেকক্ট্রিক টাইপরাইটারে এক পাতা ইংরেজি বা বাংলা কম্পোজ করাতে ১৫ টাকা লাগে।

জিন্দাবাজার এলাকার প্রবীণ কলেজ শিক্ষক শাফায়েত উল্লাহ জানান, টাইপরাইটার ব্যবহার করা একটু কঠিন। তাই তরুণ-তরুণীরা সবাই কম্পিউটার পছন্দ করে। কি-বোর্ডে কম্পোজের দক্ষতা বাড়ানোর জন্য টাইপরাইটারে অনুশীলন কেউ করে না। কমার্শিয়াল কলেজগুলোতে এখন আর আগের মতো টাইপ মেশিনে টাইপ শেখানো হয় না, সরাসরি কম্পিউটার শেখায়। সেদিন বেশি দূরে নেই, যেদিন জাদুঘর ছাড়া অন্য কোথাও টাইপরাইটার খুঁজে পাওয়া যাবে না। কলেজপড়–য়া ছাত্রী সালমা বেগম বলেন, ‘সবাই সহজে ও অল্প সময়ে কাজ করতে চায়। আমরাও চাই। আমাদের আগ্রহের একটা জায়গা জুড়ে রয়েছে কম্পিউটার। তাই আমরা কম্পিউটার চালাতেই পছন্দ করি। এখন আর টাইপরাইটারের যুগ নেই। কম্পিউটার কি-বোর্ড স্কিল টেস্টে উত্তীর্ণ হতে ডিজিটাল যন্ত্রটাকেই গুরুত্ব দিতে হচ্ছে। আমাদের প্রযুক্তির সাথে সংযুক্ত থাকা উচিত এবং পিছনে তাকানোর সুযোগ নেই।’

প্রযুক্তিবিদরা জানান, প্রথম দিকে টাইপরাইটারে বিদ্যুতের ব্যবহার ছিল না। যুক্তরাষ্ট্রের যন্ত্র প্রকৌশলী ক্রিস্টোফার শোলস ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে প্রথম আধুনিক ধাঁচের টাইপরাইটার নির্মাণ করেন। ১৯৭৪ সালে রেমিংটন কোম্পানি সাধারণ মানুষের জন্য শোলস অ্যান্ড গ্লিডেনস ব্র্যান্ডের টাইপরাইটার বাজারজাত করে। আবিস্কৃত হওয়ার পর থেকে দ্রুত সারা বিশ্বে এর ব্যবহার ও কার্যকারিতা ছড়িয়ে পড়ে। এ কোম্পানি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের টাইপরাইটার তৈরি করতে থাকে। ই-রেমিংটন অ্যান্ড নন্স, আইবিএম, ইম্পোরিয়াল, অলিভার, অলিভেটি, রয়্যাল, স্মিত করোনা, আন্ডার উড ইত্যাদি। কোনো কোনো টাইপরাইটার পঞ্চাশের অধিক সংস্করণ হয়েছে। টাইপরাইটারের মাধ্যমে মানুষ তার ব্যক্তিগত পত্র, দাপ্তরিক পত্র, পেশাগত কাজ, ব্যবসায়িক পত্র লেখা প্রভৃতি কাজ সম্পন্ন করেছে। ১৯৮০ সালের শেষের দিকে কম্পিউটার আবিস্কৃত হওয়ার পর থেকে টাইপরাইটারের ব্যবহার কমতে শুরু করে। তবে কম্পিউটারে ই-মেইল বা অন্য কোন মাধ্যমে তথ্য আদান-প্রদান ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় উন্নত দেশের সরকার প্রধানরা গোপন দলিলগুলো এখন টাইপরাইটারের মাধ্যমে লেখার কৌশল অবলম্বন করেছে। সাড়া জাগানো ওয়েবসাইট উইকিলিকস একাধারে বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান, দূতাবাস এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর তারবার্তা ফাঁস করে দেয়ার পর এখন কেউ আর কম্পিউটারকে নিরাপদ বোধ করছেন না। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক নিরাপত্তা এজেন্ট এডওয়ার্ড স্নোডেন আবারো গোপন তথ্য ফাঁস করে দেয়ায় উন্নত দেশগুলোর উদ্বেগের মাত্রা আরো বেড়েছে। রাশিয়ান সংস্থা ক্রেমলিনের একটি সূত্র জানিয়েছেন, গোপন দলিলগুলো এখন আর কম্পিউটারে টাইপ করে তা বিশেষ কায়দায় গন্তেব্যে পৌঁছানো হবে। এছাড়া রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ­াদিমির পুতিনের কাছে যেসব রিপোর্ট পেশ করা হবে তাও টাইপরাইটারে টাইপ করা হবে। এমনটাই যদি হয়, তবে বাংলাদেশেও হয়তো এর ছোঁয়া লাগতে বেশি দেরী হবে না। এতে অন্তত বিলুপ্তির হাত থেকে রক্ষা পাবে আমাদের টাইপরাইটার নামক বিশেষ যন্ত্রটি। সাংবাদিক-কলামিস্ট।

আফতাব চৌধুরী