অশান্ত সময়

34

কেমন আছেন বা কেমন আছো? দেখা হলেই দু’জন মানুষের মধ্যে এ প্রশ্নটিই প্রধান হয়। এক বিশ্লেষক প্রশ্ন করেছেন, কেন মানুষ এ প্রশ্নটিতে প্রাধান্য দেয়? তবে কি কেউই ভালো নেই? নাকি প্রশ্নকারী জানতে চান তার চেয়ে অন্যরা কতটুকু ভালো। হয়তো বা এ জন্যই সর্বস্তরে সময় নিয়ে এত ভাবনা। ইতিহাসের এক বিরাট অংশজুড়ে থাকে সময়ের ভালো থাকা এবং না থাকা নিয়ে আলোচনা এবং ইতিহাসের পাঠকেরাও নিজেদের অবস্থানের সাথে এর তুলনা করে থাকেন।

এ পরিপ্রেক্ষিতে যদি চার দিকে একটু দৃকপাত করা যায়, তাহলে অশান্ত সময়ের কথাই সামনে আসছে। শান্তির কথা একবার এলে অশান্তির চিত্র আসে বহুবার। ইতিহাসে দেখা যায়, শান্তির কথা বলে যুদ্ধ হচ্ছে, সঙ্ঘাত-সংঘর্ষ চলছে। এ অবস্থার অবসান কখনোই ঘটছে না। শুধু তাই নয়, অবস্থার প্রকাশও হচ্ছে জটিলভাবে। শুধু মানুষ যন্ত্রণায় থেকে অতীত বা ভবিষ্যতের কথা ভাবতে পারছে না। বর্তমানকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে বা করায়ত্ত করার কর্মকাণ্ডে আছে স্বার্থপর দখলদারেরা।

এই নিয়ন্ত্রণের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছে রাজনীতি এবং রাষ্ট্র। আর সাধারণ মানুষ বিহ্বল। নিয়ন্ত্রণের প্রধান অস্ত্র হলো ক্ষমতা, যা সব কিছু দখল করে। সে জন্য ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের জন্য মানুষ বা রাষ্ট্র নিরন্ত্রর ব্যস্ত থাকে অস্ত্রের পাহাড় গড়তে। এভাবেই বিশ্বের ১৬২টি দেশে বিশাল অস্ত্রভাণ্ডার জন্ম নিয়েছে।

আজকের বিশ্বের দু’টি দেশ- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার অস্ত্রভাণ্ডার সব দেশের আণবিক অস্ত্রের ভাণ্ডারের ৯৩ শতাংশ। স্ট্রাট চুক্তির অধীনে তারা প্রত্যেকেই এক হাজার ৫৫০ আণবিক অস্ত্র তাক করতে পারবে, যদি তারা এই চুক্তি অবমাননা বা লঙ্ঘন করে। অর্থাৎ দু’টি দেশের নেতা ‘গো’ (অর্থাৎ বোতামে চাপ দেয়া) করার ২০ মিনিটের মধ্যে বিশ্বের ৮০০ শহরসহ এক বিশাল অংশ বিরান হয়ে যাবে। অর্থাৎ বিশ্ব তখন মানুষের বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়বে। দু’টি দেশের সত্যিকারের আণবিক ভাণ্ডারের খবর কেবল তারাই জানে।

সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এ দু’টি রাষ্ট্র আণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা কয়েক হাজারবার করেছে। অনুসন্ধানীরা জানতে পেরেছেন, অন্তত কয়েকবার এই পরীক্ষা ভুলক্রমে একে অন্যের দিকে তাক করা ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালে প্রথম আণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা করে এবং একমাত্র এই দেশই এর ব্যবহার করে হিরোশিমায় নাগাসাকিতে। এর চার বছর পর ১৯৪৯ সালে রাশিয়া আণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা করে। এরপর দু’টি দেশ এর তৈরির দৌড়ে আছে। এখন চীন-ভারতসহ কয়েকটি দেশ এই মহাধ্বংসী অস্ত্রের মালিক। অর্থাৎ এদের নেতাদের বা এই অস্ত্র রক্ষণকারীদের সামান্য ভুল অথবা মনোবৈকল্য হলে বিশ্বের অবস্থান পাল্টে যাবে। শক্তিশালী দেশগুলো প্রায়ই বিশ্বের সাধারণ মানুষের কথা তাদের নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতে আনে না। তাদের প্রধান লক্ষ্য থাকে ক্ষমতা ও অর্থের নিয়ন্ত্রণের ওপর।

বিশ্লেষকেরা তাই গত শতাব্দীকে ‘যুদ্ধের শতাব্দী’ বলে বর্ণনা করেছেন। অধ্যাপক ড. জন রিওয়ার (প্রফেসর অব কনফ্লিক্ট রেজুলেশন, সেন্ট মাইকেল কলেজ) তার এক বক্তব্যে বলেছেন, ‘সবাই প্রথম মহাযুদ্ধের পর আর কোনো যুদ্ধ হবে না বলে ভেবেছিলেন। কিন্তু সে ভাবনা ভুুল প্রমাণ হলো। এই যুদ্ধে পাঁচ কোটি লোক মৃত্যুবরণ করে এবং সাত কোটি লোক আহত হয়।’ অধ্যাপক রিওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ভেটারেন্স ডে’ উদযাপনের ওপর মন্তব্য করতে গিয়ে বলেন, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পারল যুদ্ধ দিয়ে কখনো শান্তি আসে না, তখন তারা মত পরিবর্তন করে একে ভেটারেন্স ডে উদযাপন দিন বলল। কিন্তু যা-ই বলা হোক না, যুদ্ধ কখনো শান্তি আনে না। অশান্তি বহন করে এবং পরবর্তী সময়কেও অশান্ত রাখে।

অতীতে অন্যায়কে প্রতিরোধ করতে অনেক সময় যুদ্ধের প্রয়োজন হয়েছিল। কিন্তু এখন এটা অবান্তর। কারণ সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের কারণ জানতে এবং তা আলোচনার মধ্যে সমাধান করা এখন অনেক সহজ। যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রযুক্তির কারণে এখন সবাই একে অন্যের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। মানুষের সমস্যাগুলো সমাধানেও কোনো যুদ্ধের প্রয়োজন নেই। সে জন্যই সারা বিশ্বে অস্ত্র সীমিতকরণের ওপর জোর দেয়া হয়, যেন কোনো দেশ অযথা সঙ্ঘাতে জড়িয়ে না পড়ে। তবুও নেতাদের এবং স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে বিশ্বে সঙ্ঘাতের অবসান হচ্ছে না। এমনকি জাতিসঙ্ঘও কখনো কখনো হেরে যাচ্ছে।

বারবার যে কথাটি সঙ্ঘাত-সংঘর্ষের বিরুদ্ধে উচ্চার হয় তা হলো- যে অর্থ এবং শক্তি এতে ব্যবহৃত হয় তা যদি মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হতো, তাহলে পৃথিবী সত্যিকারের বাসযোগ্য হতে পারত। তাই সবার দাবি- অস্ত্রের ভাণ্ডার ধ্বংস করো আর মানুষে মানুষে সখ্যের বন্ধন গড়ে তোলো।

নিষ্ঠুরতর ইতিহাস লিখেছেন ব্রিয়ান পি ব্লুমফিল্ড, গিবসন বুরেল, থিও বুদুবাকিস তাদের বই ‘লাইসেন্স টু কিল অন দি অরগানাইজেশন অব ডেস্ট্রাকশন ইন টোয়েন্টিফার্স্ট সেঞ্চুরি’। সেখানে বলা হয়েছে, ‘অতীতে যুদ্ধে যে বাছ-বিচার করা হতো তা এখন অচল। যেমন বৃদ্ধ-নারী-শিশু-আহত ইত্যাদি এর আওতার বাইরে থাকত। কোনো লাইব্রেরি বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হতো না। কিন্তু বেলজিয়ামের লুডেন বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরি ধ্বংস করে জার্মানরা ২৬ আগস্ট ১৯১৪ সালে। এর মধ্যে সূচনা হয় নতুন ধরনের যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের হত্যাযজ্ঞ থেকে কেউই রক্ষা পায়নি। আসলে ইউরোপ-ব্রিটেন আমেরিকা দখলের সময় যে হত্যাকাণ্ড চালায় তা ইতিহাসে তুলনাহীন। তারা নেটিভ আমেরিকানদের নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে তাদের জমিজমা সব দখল করে। এখানে কয়েকটি হত্যাকাণ্ডের তথ্য দেয়া যায়। প্রায় ১২ হাজার বছর আগে এশিয়ার আলাস্কা দিয়ে মানুষ আমেরিকায় যায়। যখন কলম্বাস ক্যারিবিয়ান সাগরে যান (তিনি আসলে আমেরিকায় যাননি) তখন এই অধিবাসীদের সংখ্যা এক কোটির বেশি ছিল। ইউরোপীয়রা আমেরিকায় গিয়ে বসতি স্থাপনের জন্য স্থানীয় মানুষকে নির্মূল করতে থাকে। ১৯০০ সাল পর্যন্ত এটা চলতে থাকে। তখন এই স্থানীয়দের সংখ্যা কোটি থেকে তিন লাখে নেমে আসে।

অনেকেই বলেন, এ ছাড়া ইউরোপিয়ানরা নানা রোগ ছড়িয়ে নেটিভদের ধ্বংস করে। ব্রিটিশ কমান্ডার ইন চিফ, স্যার জেফরি আর্মহাস্ট কম্বলের মধ্যে বসন্ত রোগের জীবাণু লাগিয়ে দিয়ে আমেরিকান গরিব নেটিভদের মধ্যে বিতরণ এবং সেই সাথে ভেজাল পানি পানের জন্য হুকুম দেন। এর ফলে বসন্ত, কলেরা ইত্যাদি মারাত্মক রোগে লাখ লাখ মানুষ মারা যায়।

এ ছাড়া স্থানীয়দের হত্যার জন্য ইউরোপীয় সেটলারদের উৎসাহ দেয়া হয়। ১৯৭৫-এ কিং জর্জ টু এই আদেশ দেন। তিনি পুরস্কার ঘোষণা করেন, যেমন- একটি নেটিভের খুলি জমা দিলে ৫০ পাউন্ড পুরস্কার দেয়া হতো। আর মহিলা খুলির জন্য দেয়া হতো ২৫ পাউন্ড। মার্কিন বিপ্লবের (১৮৩০-১৮৩৪) পরে ইন্ডিয়ান হত্যাযজ্ঞ দ্রুতায়িত ও বিস্তৃত হতে থাকে। বিশেষ করে ১৮৪৮ সালে তিন লাখ লোককে পূর্ব কূল থেকে সানফ্রান্সিসকো যেতে বাধ্য করা হয়। এতে বিপুল লোকের মৃত্যু ঘটে।

এ ঘটনার রেশ ধরে মার্কিনিরা সারা বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের জন্য এখন ১৬০ দেশে তাদের সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করেছে। টম ডিসপাচের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে- এই ঘাঁটির প্রকৃত সংখ্যা পেন্টাগন প্রকাশ করে না। এক রিপোর্টে পেন্টাগন জানায়, ৫০টি দেশে এদের সংখ্যা চার হাজার ৭৭৫টি। অন্য এক রিপোর্টে তারা বলে- এই ঘাঁটিগুলো চালাতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রতি বছর গড়ে ১৫০ বিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। তবে এসব ঘাঁটির ওপর অনেক ক্ষেত্রে মার্কিন কংগ্রেসের কোনো আধিপত্য নেই বা খোঁজখবর নেই বলে টম ডিসপাচ উল্লেখ করেছে। একজন অফিসার বলেছেন, ‘বিশ্বের ৮৪ শতাংশ দেশে মার্কিন উপস্থিতি আছে বলে ধরা যায়।’

একজন সামরিক বিশেষজ্ঞ লিখেছেন, ‘অশান্ত স্থানগুলোতে সাধারণত সামরিক ঘাঁটিগুলো স্থাপন করা হয়।’ চামারস জনসন টম ডিসপাচকে বলেন, এগুলো হলো ‘অ্যাম্পায়ার অব বেসেস’। অপর মন্তব্যটি হলো উল্লেখযোগ্য। কখনো কখনো এই ঘাঁটিগুলো অশান্তি সৃষ্টি করে থাকে রাজনীতির অঙ্গুলি নির্দেশে। কারণ, ক্ষমতাবানদের স্থায়িত্ব ও শক্তি অনেকাংশে নির্ভর করে অশান্তির পরিধির ওপর। শক্তিমান এবং রাজনৈতিক শক্তিবর্গ তাই এত অশান্তির অংশ হয়ে থাকে। বলা হয়, তারা শান্ত মানুষ এবং শান্তির সময়কে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।