মোদি আরো উদোম হয়ে গেছেন

43

লেটেস্ট খবর হলো- পাকিস্তানে বিধ্বস্ত ভারতীয় যুদ্ধবিমানের আটক পাইলট ‘অভিনন্দন বর্তমান’ এখন (১ মার্চ, রাত ১০টা) ভারতের মাটিতে ফিরে গিয়েছেন, তাকে মুক্ত ও হস্তান্তর করেছে পাকিস্তান সরকার। প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান এর আগের দিন পাকিস্তানের সংসদে মানে উচ্চ ও নিম্ন সংসদের যৌথ অধিবেশনের বক্তৃতায় তার এই সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে বলেন, শুভেচ্ছা আর সৌজন্য দেখাতে আর ডায়ালগের মাধ্যমে সমস্যা নিরসনের প্রতি আস্থা তৈরি করতে পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

কিন্তু মোদি এবার এখানেও আরো উদোম হয়ে গেছেন। মূল কারণ মোদি যে ঘৃণা তাতিয়ে ছিলেন, ভারতীয় মনকে যেভাবে উত্ত্যক্ত করে ক্ষেপিয়ে তুলেছিলেন এই বলে যে, নিশ্চিতভাবে পাকিস্তান খুবই খারাপ স্বভাবের আর হিউম্যান চরিত্রহীন এক শত্রু এমন ছবি এঁকেছিলেন, তাতে এমন বয়ানের ওপরে ইমরান খানের এই ঘোষণা শুধু পানি ঢেলে দেয়া নয়, একেবারে ঠাণ্ডা পানি ঠেলে দিয়েছে। পানি ঢেলে দেয়া ঘটেছে কি না এর ভালো প্রমাণ হলো গত দুই সপ্তাহে মোদি পাকিস্তান বা ইমরানের যে কল্পিত দানব ছবি এঁকে ফেলেছিলেন- সেই ভারত থেকেই ইমরানের প্রতি অভিনন্দন জানানোর একটি লহর বয়ে গেছে গত ফেব্রুয়ারির শেষ দিনে।

ভারতের এমন জনপ্রতিনিধিদের মধ্য থেকে এতে প্রকাশ্যে সবচেয়ে আগে আছেন সম্ভবত ভারতীয় পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী ক্যাপ্টেন অমরিন্দর সিং। তিনি এই সিদ্ধান্তকে অভিনন্দন জানিয়েছেন। বাংলাদেশের প্রথম আলো এ বিষয়ে “যুদ্ধ যুদ্ধ খেলায় ‘হিরো’ ইমরান!” শিরোনামে সবার প্রতিক্রিয়াগুলো নিয়ে একটা রিপোর্ট করেছে। আরো লিখেছে, প্রধানমন্ত্রী ইমরানের পাইলটকে মুক্তি দেয়ার সিদ্ধান্তের জন্য ‘সামাজিক মাধ্যম ও মূলধারার গণমাধ্যমে ভূয়সী প্রশংসা পাচ্ছেন তিনি। এমনকি তাকে সত্যিকারের রাষ্ট্রনায়কও বলা হচ্ছে।’ অর্থাৎ মোদির পরিকল্পনার একেবারে বিপরীত। ভারতে পাকিস্তানবিরোধী প্রবল উত্তেজনার মধ্যে পাইলটের জীবনে কী হবে এ নিয়ে জনমত যখন চরম উদ্বিগ্ন, ঠিক সেই সময়ে উদ্বিগ্ন মানুষের কল্পনাকে ছাড়িয়ে ইমরান এক ঘোষণা দিয়ে ভারতীয় জনমতের বড় অংশকে নিজের পক্ষে টেনে নিয়ে গেছেন। আর এটাই ছিল মোদির সবচেয়ে দুর্বল পয়েন্ট।

একটা কঠিন বাস্তবতা আর খুব কম মানুষ ব্যাপারটা জানেন বা আমল করেন সে কথা তুলে ধরা যাক, যা কাশ্মির ইস্যুকে বোঝার জন্য ফাউন্ডেশনাল। গত ১৯৪৭ সালে বাংলা বা পাঞ্জাব এ দুই প্রদেশ যেমন ভাগ হয়ে একেকটা করে টুকরা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে ঢুকে যায়, আর সেই থেকে এ দুই রাষ্ট্রের অংশ হয়ে গেছে কাশ্মির, কিন্তু সেই একই অর্থে বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। এদের সাথে তুলনীয়ই নয়। যদিও ভারতীয় কাশ্মির আর পাকিস্তানি কাশ্মির বলে বিভক্ত অংশ আছে তবুও কাশ্মির কোনোভাবেই বাংলা বা পাঞ্জাব নয়। কেন? একেবারে গোড়ার কারণ হলো, বাংলা বা পাঞ্জাব ছিল ব্রিটিশ ইন্ডিয়ার প্রদেশ (বা প্রেসিডেন্সি)। আর তুলনায় কাশ্মির বরাবরই ছিল প্রিন্সলি স্টেট বা এক করদ রাজার রাজ্য। আসলে ব্রিটিশ ইন্ডিয়া বলে এক ব্রিটিশ কলোনি রাষ্ট্রের কথা আমরা জানি আর শুনি বটে, কিন্তু একাট্টা কোনো একই ব্রিটিশ শাসকের অধীনে আমরা সবাই এক ইন্ডিয়ান রাষ্ট্র ভূখণ্ড এমন কিছু কোনো দিনই ছিল না। তাহলে ছিল কী? ছিল ফোর্ট উইলিয়াম নামে কলকাতায় ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক দুর্গ বা হেডকোয়ার্টার।

এই কোম্পানি শাসন শেষ হয় প্রথম শত বছর ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহের মধ্য দিয়ে। এরপর থেকে কোম্পানির জায়গায় সরাসরি ব্রিটিশ সরকারের শাসনাধীন হয়, কিন্তু তাতে আগের মতোই ব্রিটিশ-ভারত বলতে ওই একই ফোর্ট উইলিয়ামের অধীনের তিন ধরনের প্রশাসনিক পদ্ধতিতে তিন ধরনের ভূখণ্ড ছিল। বেঙ্গল, বোম্বাই আর মাদ্রাজ- এ তিনটি প্রেসিডেন্সি প্রশাসন, আর সাথে ছিল প্রায় আট-নয়টা প্রদেশের প্রশাসন। আর ওইদিকে তৃতীয় ধরনটি হলো ছোট-বড় প্রায় ৬৫০ প্রিন্সলি স্টেট। প্রিন্সলি স্টেটগুলোকে করদ রাজার রাজ্যও বলা হতো, এ জন্য যে এসব রাজ্যের পররাষ্ট্র আর প্রতিরক্ষা ইস্যুতে ব্রিটিশদের ইচ্ছা ও স্বার্থই শেষ কথা, এটি মেনে নিয়েই আগের মতো এর রাজারা খাজনা তুলে রাজত্ব করে যেতেন আর তোলা খাজনার একটা ভাগ ব্রিটিশদের শেয়ার করতেন। তবে এভাবে করদরাজ্য চালাতে রাজত্বের অভ্যন্তরীণ ইস্যুতে রাজার আলাদা প্রশাসন ছিল, যা ‘স্বাধীন’ মনে করা হতো। এমনই এক প্রিন্সলি স্টেট ছিল কাশ্মির। কাশ্মির তাই প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের সাথে তুলনীয় নয়; কারণ প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশের প্রশাসন আলাদা আলাদাভাবে তবে সরাসরি এরা ব্রিটিশদের পরিচালিত প্রশাসন।

এ কারণে দেশভাগের সময়, সাধারণভাবে প্রেসিডেন্সি বা প্রদেশগুলো ভাগাভাগি হয়ে যেমন তুলনামূলক সহজেই নতুন স্বাধীন ভারত ও পাকিস্তান বলে দুই রাষ্ট্রে অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেতে পেরেছিল, প্রিন্সলি স্টেটগুলোর ক্ষেত্রে তেমনটি হতে পারেনি। এর মূল কারণ সম্ভবত করদরাজ্যগুলো পরিচালিত হতো ফোর্ট উইলিয়ামের কোনো ধরনের প্রশাসনে নয়, বরং করদরাজার নিজের প্রশাসনে। আবার ব্রিটিশ শাসকেরা এসব রাজার সাথে ‘করদরাজ্য’ সম্পর্ক ও চুক্তিতে থাকার ফলেই সম্ভবত ব্রিটিশ শাসকেরা করদরাজ্যের কাউকেই আইনত ভারত অথবা পাকিস্তানে যুক্ত হওয়ার ব্যাপারে কোনো নির্দেশ দিতে পারেন না।

তাই না দিয়ে, প্রসঙ্গ না তুলে এড়িয়ে থেকেই নিজেরা ভারত ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। বিশেষ করে কাশ্মির আবার সম্ভবত একমাত্র স্টেট, যা নতুন ভারত-পাকিস্তান হবু দুই রাষ্ট্রের মধ্যে অবস্থিত। ফলে সেকালের আরেক করদরাজ্য ‘নিজামের হায়দরাবাদ’ [অন্ধ্রপ্রদেশ]-এর বেলায়, এর চার দিকে ভারত ভূখণ্ড বলে যেমন নেহরু সৈন্য পাঠিয়ে বলপ্রয়োগে সহজেই একে ভারতে ঢুকিয়ে নিতে পেরেছিলেন। কাশ্মিরের বেলায় তেমনটি ঘটেনি, বা বলা যায় ঘটাতে গিয়েই বিপত্তি দেখা দেয়। করদরাজ্য শাসক হরি সিংয়ের হিন্দু জনগোষ্ঠী ছিল সংখ্যালঘু আর তুলনায় মুসলমানেরা অনেক সংখ্যাগরিষ্ঠই শুধু নয়, বড় অংশ ছিল ট্রাইবাল জনগোষ্ঠী। এরাই নতুন পাকিস্তানের সাহায্য চায় বলে তা মোকাবেলায় হরি সিং চলে যান নেহরুর ভারতের কাছে; তবে কে প্রথম সঙ্ঘাত শুরু করেছে, এ নিয়ে যার যার আলাদা ভাষ্য আছে। আবার ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত কাশ্মির কোন দিকে যাবে- ভারত না পাকিস্তানে, এটি ফেলে রাখাই থেকেছিল যেন একটা বিস্ফোরক। কিন্তু সারকথা হলো এ থেকেই ১৯৪৮ সালে প্রথম ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ হয়। যুদ্ধ শুরু হলে পরে নেহরুর অনুমান ছিল, বিরোধের ব্যাপারটি জাতিসঙ্ঘ তুললে তিনি আনুকূল্য পাবেন। তাই তিনিই ইস্যুটি জাতিসঙ্ঘে তোলেন।

এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৪৪ সালে জন্ম নেয়া, ১৯৫২ সাল পর্যন্ত জাতিসঙ্ঘ ছিল এক বহুল আদর্শ ও আকাক্সিক্ষত মডেলের শান্তি স্থাপনের প্রতিষ্ঠান, হাই মরালের প্রতিষ্ঠান। কারণ, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে হিটলারকে পরাজিত করার প্রধান শক্তি আমেরিকা আর এর প্রেসিডেন্ট রুজভেল্টের স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান হলো জাতিসঙ্ঘ। তিনি বাকি বিজয়ী শক্তিদের রাজি করিয়ে এই প্রতিষ্ঠান গড়েন। তাই এটি যুদ্ধবিরোধী নৈতিকতায় পরিচালিত এবং বিভিন্ন রাষ্ট্রের মধ্যে স্বার্থবিরোধ দেখা দিলে, তা কোনো যুদ্ধে নয় বরং জাতিসঙ্ঘকে ডায়ালগ ও মধ্যস্থতা করে দিয়ে যুদ্ধ এড়ানোর আদর্শ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সেকালের প্রধান উদ্যোক্তা হলেন হ্যারি ট্রুম্যান।

আমেরিকার ১৯৩৩-১৯৫৩ সাল, এই ২০ বছরের পাঁচ প্রেসিডেন্টের প্রশাসন থাকার কথা। যার শেষ সাড়ে সাত বছর (সাড়ে তিন ও চার মিলে) প্রেসিডেন্ট ছিলেন ট্রুম্যান, আর প্রথম টানা সাড়ে ১২ বছর ছিল রুজভেল্টের। ১৯৪৫ সালে চতুর্থবার শপথ নেয়ার তিন মাসের মধ্যে রুজভেল্ট মারা গেলে তার নীতি-পলিসির যোগ্য উত্তরসূরি ভাইস প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান দায়িত্ব পান। পরে ১৯৪৮ সালে নির্বাচনেও তিনিই প্রেসিডেন্ট পদে সরাসরি প্রার্থী ছিলেন ও বিজয়ী হন। এ দিকে রুজভেল্ট দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকে দেখেছিলেন দুনিয়া থেকে কলোনি শাসন একেবারে তুলে দিয়ে স্বাধীন রিপাবলিক (রাজতন্ত্র নয়) রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠারও যুদ্ধ এবং এরই সুযোগ ও নীতি হিসেবে।

এ কারণে কাশ্মির বিরোধে রাজা হরি সিং নেহরুর কাছে ভারতে এক্সেসন বা অন্তর্ভুক্তির লক্ষ্যে এক ‘রাজার ইচ্ছা’ জানিয়েছিলেন কি না, সেটি কোনো ভিত্তি নয় বরং কাশ্মিরের জনগণ কোন দিকে যেতে চায়, এই ভিত্তিতে আপস সমাধানের রায় দেয় জাতিসঙ্ঘ। তাই জাতিসঙ্ঘের রেজুলেশন হয়, কাশ্মিরে গণভোট হতে হবে আর এর রায়ই হবে সমাধান যে, কাশ্মির ভারত-না পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হবে। প্রসঙ্গক্রমে একটা বাড়তি বাক্য বলে রাখি, কমিউনিস্ট ভাষ্যে সাম্রাজ্যবাদ-আমেরিকা, অন্য দেশের তেল বা সম্পদ লোটার আমেরিকা, সিআইএ পাঠিয়ে গুপ্তহত্যা ঘটানোর আমেরিকা ইত্যাদি পরিচয়ের শুরু রুজভেল্টের নীতির সমাপ্তিতে; ১৯৫৩ সালে রিপাবলিকান আইজেনহাওয়ার প্রেসিডেন্টের শপথ নেয়ার পর থেকে।

যা হোক, জাতিসঙ্ঘের এই গণভোটের সিদ্ধান্ত আজো বাস্তবায়ন করা হয়নি। উপেক্ষা করে চলছে। আর সে কারণেই কাশ্মির প্রসঙ্গে কোনো মধ্যস্থতাকারী কারো সাহায্য নেয়া যাবে না, কোনো প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্র কারো সাথে কাশ্মিরবিরোধ ইস্যু সংযুক্ত করা যাবে না- এই হলো ভারতের স্থায়ী নীতি। এটাকেই বলে ভারতের ‘বিগ-এম’ (ইংরেজিতে ‘এম’ মানে মিডিয়েশন বা মধ্যস্থতা) ভীতি। এর অর্থ হলো যদি সেই মধ্যস্থতাকারী আবার জাতিসঙ্ঘের প্রস্তাব বাস্তবায়ন চেয়ে মনে করিয়ে দেয়, তা আলোচনার ইস্যু হয়ে যায়। এ সপ্তাহে ভারতের এক মুরব্বি সাংবাদিক শেখর গুপ্তা লিখেছেন, কোনো শক্তিধর দেশের মধ্যস্থতা ছাড়া কাশ্মির সমস্যার সমাধান নেই। কেন?
কারণ, যুদ্ধবাজ মোদি বাস্তবে এবারের কাশ্মির সমস্যার ইতি টেনেছেন বিশেষত, আটকে পড়া পাইলটকে ফেরত এনেছেন, আপাতত যুদ্ধের সম্ভাবনাকে মাটিচাপা দিয়েছেন ওই মধ্যস্থতাকারীদেরই সাহায্যে।

প্রথমত, মোদির তথাকথিত ‘প্রতিশোধের’ উন্মাদনা তৈরিতে মানুষ ক্ষেপানোর উদ্দেশ্য ছিল এটা দাবি করা যে, তিনিই একমাত্র নেতা ও দল যে ‘মুসলমান’ পাকিস্তানকে শিক্ষা দিতে সক্ষম। বিজেপির রাজনীতির বহু পুরনো অনুসরণ করা মূল লাইন হলো, মুসলমানের বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে হিন্দুদের মেরুকরণ করে, জনমত নিজের পক্ষে ভোটের বাক্সে আনা। এ কারণে মেরে ফেলব, ছিঁড়ে ফেলব, ছাল ছাড়িয়ে নেব, বুকের ছাতি দেখানো ইত্যাদি এসব হলো মোদির দলের প্রতিশোধ নিতে সক্ষমতার প্রমাণ। হিন্দুরা ভালো আর মুসলমানরা খারাপ। এভাবে অতি সরলীকরণ করে নিজের ভয়ঙ্কর চিন্তাকে আড়াল করা। অথচ রাজনীতি, সংবিধান, নাগরিক অধিকার, নাগরিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে কাজ করা ইত্যাদি মোদির দলের কাছে ইস্যু নয়; বরং ‘প্রতিশোধের’ রাজনীতি তার প্রিয় জিনিস।

এবার তাই ‘প্রতিশোধের’ মাতম তোলার পরে তিনি বোমারুবিমান পাঠিয়ে টেরর ক্যাম্পের ওপর বোমা ফেলে সব ধ্বংস করে এসেছেন, এই দাবি ও প্রপাগান্ডা করা ছিল তার পরিকল্পনা। প্রায় সবই ঠিক ছিল, কিন্তু গোল বাধে পাকিস্তানের হাতে পাইলট আটকা পড়ায়। অপর দিকে আরেক বিপদ দেখা দেয়। মোদি দাবি করেছিলেন, বালাকোটের ক্যাম্পে পাইলটের বোমা হামলায় ৩০০ টেররিস্ট মেরে এসেছেন। যদিও ঠিক তিন শ’ই কেন, ২৯৯ নয় কেন তা জানা যায়নি। এ দিকে আজ থেকে শুরু হয়েছে সরেজমিন রিপোর্টিং। পাকিস্তানের জিও টিভির এই প্রজন্মের সাংবাদিক হামিদ মীর ঘটনাস্থল সফর করে ফেসবুকে ক্লিপ পাঠিয়ে বলছেন, এক মরা কাক ছাড়া সেখানে কেউ মরেনি। আর ওই বনের ভেতর কুঁড়েঘরের এক গরিব মানুষ কিছুটা আহত হয়েছেন। বাড়ি অক্ষত আছে। কিন্তু জঙ্গলের ভেতর বিশাল এক গর্ত হয়ে গেছে। সেটি আবার রয়টার্সের এক সাংবাদিকের নিজস্ব সফরের ছবি ও রিপোর্ট।

সেটা আবার ছাপা হয়েছে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকায়। তবে এসব মিডিয়া রিপোর্ট আসার আগেই গত ২৬ ফেব্রুয়ারি দিল্লিতে মোদিবিরোধী মমতা-রাহুলসহ ২১ দলের এক সভা হয়েছে। তাদের দাবি, মোদি সেনাবাহিনীর রক্ত ও জওয়ানদের ত্যাগকে নিজের রাজনীতির সঙ্কীর্ণ স্বার্থে ব্যবহার করছেন। কলকাতা ছেড়ে দিল্লির মিটিংয়ে রওনা হওয়ার আগে মমতার ভাষায় আঙুল তুলে বলেছেনÑ ‘জওয়ানদের রক্ত নিয়ে ভোটের রাজনীতি’ করাই কি আসল লক্ষ্য? আর ওই দিকে পরের দিন ২৭ ফেব্রুয়ারি ২১ দলের মিলিত অভিযোগÑ মোদি ‘জওয়ানদের আত্মত্যাগকে নিয়ে রাজনীতিকরণ করছেন।’ আর কলকাতায় ফিরে ১ মার্চ, এবার মমতার সরাসরি চ্যালেঞ্জ বালাকোটেÑ ‘তারা বলছে, এমন কোনো ঘটনাই ঘটেনি। বোমাটা অন্য জায়গায় পড়েছে, মিস হয়েছে। মানুষ মারা যায়নি। কেউ বলছে, একজন মারা গেছেন। তো সত্যটি কী, এটা তো মানুষ জানতে চাইতেই পারে। আমরা বাহিনীর সাথে রয়েছি। কিন্তু বাহিনীকে সত্যি কথাটি বলার সুযোগ দেয়া উচিত। দেশের লোকেরও সত্যিটা জানা উচিত।’

কিন্তু মোদির বিপদ এর চেয়েও বড়। তার ধারণা ছিল প্রতিশোধ নেয়া হয়ে গেছে, ফলে তিনিই একমাত্র ছাতিওয়ালা নেতা, সেসব দাবি করার রসদ এসে গেছে। সুতরাং এখন উত্তেজনা শীতল করাই মূল কাজ। কিন্তু পাইলট আটকে যাওয়ায় ব্যাপারটি একটু জটিল।

তিনি তিনটি বা অন্ততপক্ষে দু’টি ক্যাম্পকে মধ্যস্থতা করতে ডাকেন। প্রথম ক্যাম্পের মূল নেতা সৌদি ক্রাউন প্রিন্স সালমান বা এমবিএস। এটি কারো অজানা নয় যে, অর্থ ও বিনিয়োগ সঙ্কটে থাকা পাকিস্তানে তিনি গত সপ্তাহে সফরে এসে ২০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। এ ছাড়া আরো ৯ বিলিয়নের মধ্যে নগদ তিন বিলিয়ন ইমরান ক্ষমতায় আসার পরই দিয়েছেন। এক কথায় এই প্রিন্স হলেন এখন ইমরানের পাকিস্তানের কাছে প্রমাণিত ত্রাতা। কাজেই ইমরানকে রাজি করাতে হলে এখন ইমরানের দুর্বলতা ও ব্যক্তি সম্পর্ক গড়ে তোলা প্রিন্সই হলেন সঠিক লোক, এটি বুঝতে মোদি বিদেশ মন্ত্রণালয়ের কষ্ট হয়নি। এখনকার মধ্যপ্রাচ্যের দুই প্রিন্স- এমবিএস আর দুবাইয়ের প্রিন্স, এরা হলেন মূল ক্ষমতাধর। দুবাইয়ের প্রিন্সও এমবিএসের আগেই পাকিস্তান সফরে এসে প্রায় ১০ বিলিয়ন বিনিয়োগ দিয়ে গেছেন। ভারত ওআইসি’র কেউ নয়। কিন্তু তা সত্ত্বেও দুবাইয়ের প্রিন্স ভারতের বিদেশমন্ত্রী সুষমা স্বরাজকে ওআইসি’র সভায় অতিথি হতে দাওয়াত করেন। এখানেই দুই পক্ষের মধ্যস্থতা ঘটে। কারণ, এর শুরু এমবিএসের নিজের প্রভাব নয় আর এক হাতে তিনি জামাই ক্রুসনারের মাধ্যমে ট্রাম্পের আমেরিকা দিয়েও ইমরানকে প্রভাবিত করেন। অতএব, এটাকে বলতে পারি আমেরিকা সমর্থিত মিডল ইস্ট ক্যাম্প।

দ্বিতীয় ক্যাম্পটি হলো মূলত চীনের উদ্যোগ। অনেকটা অপসৃয়মাণ আমেরিকান প্রভাবের ভেতর উত্থিত দুনিয়ার নেতা চীন। ভারত ও পাকিস্তানে চীনের বিনিয়োগ ও বাজার স্বার্থ খুবই ভাইটাল। যদিও এর ভেতর ভারত আবার একটু বেয়াড়া, সব কথা শুনতে চায় না। তাই চীন নিজের প্রভাব বাড়াতে রাশিয়াকে সাথে রাখে। এখানে মিটিং হয়েছে চীনে। ভারত, রাশিয়া ও চীন এ তিন পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মধ্যে। এ ছাড়া সাংহাই করপোরেশন সংগঠনের সূত্রে গত ২০১৭ সালে ভারত-পাকিস্তানকে একত্রে সাংহাই জোটের সদস্য করে নেয়া হয়।
কিন্তু সব পক্ষের প্রস্তাব শুনে ইমরান উল্টো নিজের ইমেজ বাড়ানোর বুদ্ধিতে নিজেই এগিয়ে আসেন। তাই পরের দিনই বিনা শর্তে পাইলটকে ছেড়ে দেয়ার আগাম ঘোষণা তিনি দিয়ে বসেন।

কিন্তু বালাকোটে বোমা ফেলে ৩০০ জন মারার লাশ মোদি এখন কোথা থেকে দেখাবেন? সমস্যা এখন এখানে ঠেকেছে। এ দিকে খবর বেরিয়েছে, হাজার কেজি বোমা ফেলে বনজঙ্গলের পরিবেশ নষ্টের জন্য ভারতের বিরুদ্ধে জাতিসঙ্ঘে মামলা করতে যাচ্ছে পাকিস্তান। এতে ৩০০ মৃত জঙ্গির লাশ সংগ্রহ মোদির জন্য আরো কঠিন করে দিয়ে তাকে বিব্রত করাই পাকিস্তানের উদ্দেশ্য, তাই মনে হচ্ছে।

তাহলে ভারতের বিগ-এম ভীতি, মানে মধ্যস্থতাকারীর ভীতির কী হলো? আমরা দেখলাম, ঘটনা শক্তপোক্ত করতে মোদি দু’টি বৃহৎ ক্যাম্পকে নিয়োগ করে নিজে উদ্ধার পেলেন। সম্ভবত এই বাস্তবতায় শেখর গুপ্ত লিখছেন, কাশ্মির ইস্যুতে ‘দ্বিপাক্ষিকতার দিন শেষ, বিগ পাওয়ারের মধ্যস্থতা নেয়ার’ দিন এসে গেছে।
পাইলটকে ফেরত পেতে গিয়ে আর ওই দিকে মমতার চোখা প্রশ্নের কারণে মোদির সব প্রপাগান্ডা আর তৎপরতাই এখন উদোম। সবাই সব জেনে গেছে।

লেখক : রাজনৈতিক বিশ্লেষক
goutamdas1958@hotmail.com