আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ

15

উপজেলা নির্বাচন স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে স্বয়ংসম্পূর্ণ এবং বিকেন্দ্রীকরণ করা দীর্ঘ দিনের দাবি। বাংলাদেশের সংবিধানে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে কার্যকর করার বিধান থাকলেও কেউ এজন্য তেমন কিছু করেননি। এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম হচ্ছেন সামরিক শাসক এরশাদ। ১৯৮৫ সালে তিনি থানাকে উপজেলায় উন্নীত করে একটি স্বাবলম্বী প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোর প্রয়াস পেয়েছিলেন। আইনগতভাবে আমলা এবং স্থানীয় নেতৃত্বের মধ্যে সম্পূর্ণ বিভাজন রেখা সৃষ্টিতে এরশাদ প্রশাসন ব্যর্থ হলেও বিষয়টি জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিএনপি নেতৃত্বের সরকারগুলো উপজেলা ব্যবস্থাকে নাকচ করে দিয়েছিল। পরে বিষয়টির যথার্থতা এবং এরশাদের সাথে আওয়ামী লীগের সখ্যের কারণে উপজেলা ব্যবস্থা পুনর্বহাল হয়। কিন্তু প্রথমত ক্ষমতার বিভাজন, দ্বিতীয়ত দলীয়করণ প্রবণতা এবং তৃতীয়ত নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্বের বৈধতা প্রশ্নে উপজেলা ব্যবস্থা অসম্পূর্ণ ও অকার্যকরই থেকে যায়। আওয়ামী লীগ নতুন নতুন আইন করে উপজেলা ব্যবস্থার সর্বনাশ করেছে। উপজেলা চেয়ারম্যান বনাম স্থানীয় সংসদ সদস্যের ক্ষমতার দ্বন্দ্ব এতটাই প্রকট হয়ে ওঠে যে, গরিষ্ঠ উপজেলা চেয়ারম্যান এর বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেন।

উপজেলা চেয়ারম্যানদের জাতীয় সংগঠন সংসদ সদস্যদের কর্তৃত্ব রহিতকরণে বিশেষ চেষ্টা করলেও তা কার্যকর হয়নি। ক্ষমতাহীন হলেও উন্নয়ন ও নানা ধরনের সরকারি অর্থ বিতরণ উপজেলার মাধ্যমে বণ্টিত হওয়ার কারণে উপজেলা ব্যবস্থা টিকে আছে। তবে স্থানীয়পর্যায়ের নেতৃত্বের অংশগ্রহণ শুধু আনুষ্ঠানিক। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাই দৃশ্যত সব ক্ষমতা প্রয়োগ করে থাকেন। ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানরা এবং পৌরসভার মেয়ররা এই পরিষদের সদস্য হলেও তারা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করেন না। বৈঠকে উপস্থিত থাকেন মাত্র। নারী প্রতিনিধিত্বও এখানে রয়েছে। কিন্তু তা নামকাওয়াস্তে। বিধিমোতাবেক শাসনব্যবস্থার ১৭টি বিষয় উপজেলা পরিষদের অধীনে ন্যস্ত হওয়ার কথা। ওইসব সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা উপজেলা পরিষদের অধীনে কাজ করতে চান না। তাই, যে উপজেলা ব্যবস্থা হতে পারত স্থানীয় পরিকল্পনা, উন্নয়ন ও বরাদ্দের বাস্তবক্ষেত্র, তা আজ অকার্যকর হয়ে আছে। এরপরও উপজেলা নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক ব্যক্তিরা-বিশেষত স্থানীয় নেতৃত্বের আগ্রহের কমতি নেই। এর নির্বাচন এলেই প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতায় তার প্রমাণ পাওয়া যায়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, বিএনপি হাইকমান্ডের নির্দেশ অগ্রাহ্য করে বেশকিছু উপজেলায় ওই দলের প্রার্থীরা এবার প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। উল্লেখ্য, একাদশ সংসদ নির্বাচনের ফল প্রত্যাখ্যানের পর বর্তমান সরকার ও নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ না নেয়ার ঘোষণা দিয়েছিল বিএনপিসহ জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোট। এবারের উপজেলা নির্বাচনের একটি উল্লেখযোগ্য দিক হলো, দলীয় মনোনয়নে নির্বাচন। আওয়ামী লীগ সরকার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন দলীয় ভিত্তিতে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর এবার উপজেলা নির্বাচনও দলীয়ভাবে অনুষ্ঠানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ লক্ষ্যে তারা উপজেলা নির্বাচনবিধি সংশোধন করেছেন। ২০১৪ সালের সংসদীয় নির্বাচনের পরপরই উপজেলা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল। এ সময়ে ছয় ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করে নির্বাচন কমিশন। প্রথম দুইধাপে বিজয়ের ক্ষেত্রে বিএনপি প্রার্থীদের আধিক্য লক্ষ্য করে, পরবর্তী নির্বাচনগুলোতে আওয়ামী লীগ চিরাচরিত কায়দায় নির্বাচন নিজেদের অনুকূলে নিয়ে নেয়। স্থানীয় পরিষদের নির্বাচনগুলোতে বিরোধীদলের প্রার্থীরা বিপুল সংখ্যায় জিতলেও সরকারের কোনো পরিবর্তন হয় না।

তা সত্ত্বেও আওয়ামী লীগ প্রশাসনের প্রতিটি স্তরে তাদের নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের প্রতিষ্ঠাই দেখতে চায়। বাংলাদেশে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচন সব সময়ই নিরপেক্ষ ও নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হয়ে এসেছে। ইউনিয়ন পরিষদে দলীয় প্রার্থী দেয়ার মাধ্যমে গ্রাম বাংলার স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করে এটাকে ঝগড়া বিবাদ ও মামলা মোকদ্দমার চারণভূমিতে পরিণত করা হয়েছে। ক্ষমতাসীনরা এতটাই অসহিষ্ণু যে, কোনো ইউনিয়ন পরিষদ বা উপজেলায় কোনোক্রমে যেসব বিরোধী প্রার্থী জয়লাভ করেছেন, তাদের কাজ করতে দেয়া হয়নি। তাদের বেশির ভাগকেই মামলা ও হামলা দিয়ে বিতাড়ন করা হয়েছে। অনেককেই দীর্ঘ সময় জেলে থাকতে হয়েছে। ছুতোনাতা অভিযোগ দিয়ে তাদের নির্বাচন বাতিল পর্যন্ত করা হয়েছে।
২০১৮ এর ৩০ ডিসেম্বরে রাতের আঁধারে ভোট ডাকাতির পর নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা-বিশ^াস বিনষ্ট হয়ে গেছে। এর প্রমাণ হিসেবে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মেয়র নির্বাচনে ভোটারদের অনুপস্থিতির উল্লেখ করা যায়। অবশ্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার দলীয় দৃষ্টিতে ‘অসংখ্য’ ভোটার লক্ষ করেছেন। আর প্রধান নির্বাচন কমিশনার ভোটার না আসার দায় রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চাপিয়েছেন।

উপজেলা নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পূর্বমুহূর্তে তিনি বলেছেন, তারা ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের মতো ‘সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন’ এ ক্ষেত্রেও উপহার দিতে চান। শুনে নাগরিক সাধারণ মুখ টিপে হেসেছেন। তিন ধাপের নির্বাচনের পর দেখা যাচ্ছে যে, উপজেলা নির্বাচনের ক্ষেত্রেও সিইসি তার ‘ওয়াদা’ রক্ষা করেছেন। এখন পর্যন্ত আওয়ামী লীগ বাদে উপজেলাপর্যায়ে কোনো প্রার্থীর জয়লাভের সংবাদ পাওয়া যায়নি। এই জয়জয়কারের জন্য তিনি ‘অভিনন্দন’ পেতে পারেন। তবে মেয়র নির্বাচনটি নিষ্প্রভ, নিষ্ক্রিয় ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাবিহীন থাকার কারণে কোনো ক্ষেত্রেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় গোস্বা হয়েছেন। তাদের বক্তব্যের সারমর্ম হলো ‘ওরা কেন নির্বাচনে অংশগ্রহণ করে নিশ্চিত পরাজয়ের গ্লানি বুকে ধারণ করে গণতন্ত্রকে সার্থক করবে না?’ এই অবস্থা শুধু আসল বিরোধী দলের নয়। আওয়ামী মহাজোটের পরিত্যক্ত দলগুলো এ নির্বাচনের বিরোধিতা না করলেও ময়দানে একজন প্রার্থীও দেয়নি।

‘গৃহপালিত’ বিরোধী দল উত্তরবঙ্গে ছিটেফোঁটা প্রার্থী দিলেও অন্যত্র তাদের প্রার্থিতা একরকম শূন্য। দেশের উপজেলাগুলোর এবারের নির্বাচন প্রসঙ্গে রাশেদ খান মেনন বলেছেন, ‘স্থানীয় সরকারের এই নির্বাচনে জনগণের ব্যাপক অংশগ্রহণ থাকে। কিন্তু স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং দলীয় নেতারা যখন ভোটারদের বলেন ‘ভোট তো দেখেছ? ভোট দিতে যেতে হবে না’- তখন সেই ভোট সম্পর্কে কী মনোভাব সৃষ্টি হয়। একটি সামগ্রিক অনাস্থার জন্ম হয়। নির্বাচনে প্রার্থী হতে বাধাদান, মনোনয়নপত্র ছিঁড়ে ফেলা, উপর মহলের ক্লিয়ারেন্স আছে কি না-তা নিয়ে প্রার্থীদের পুলিশের প্রশ্ন এবং টাকা ছড়ানোর উদ্বেগজনক খবর আসছে। প্রধানমন্ত্রী সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী এলাকায় যেতে নিষেধ করে বলেছেনÑ কমিশনের আইন মেনে চলতে। কিন্তু সরকার ও দলের পক্ষ থেকে এই বিষয়ে যদি নিশ্চয়তা বিধান না করা হলে মানুষের মধ্যে নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি রয়ে যাবে। এই নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি দূর করতে উপজেলা নির্বাচন অবশ্যই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হতে হবে এবং প্রশাসনের সব হস্তক্ষেপ মুক্ত করতে হবে। সরকার ও নির্বাচন কমিশন উভয়কেই এ নিশ্চয়তা বিধান করতে হবে।

জনাব মেনন এখন অপ্রিয় সত্য কথাগুলো বলছেন। অবশ্য মন্ত্রিত্ব থাকলে বলতেন কি না, তাতে সন্দেহ রয়েছে। বিএনপিসহ সব বিরোধী দল এই নির্বাচন বর্জন করায় মূলত এটি ‘ওয়ানপার্টি শো’তে পরিণত হয়েছে। উপনির্বাচন বা স্থানীয় নির্বাচন কোথাও কোনো উৎসাহ-উদ্দীপনা নেই। শাসক দল ব্যতীত অন্যদের নির্বাচিত হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। সরকারি দলের টিকিট নির্ধারিত হওয়ার পর প্রার্থীদের বক্তব্য ও আচরণ এমনই যে, তারা নির্বাচিত হয়ে গেছেন। সে দলের নেতাকর্মীরা বলে বেড়াচ্ছেন ‘আমরা ভোট দিলেও জিতব, না দিলেও জিতব।’ স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ প্রফেসর তোফায়েল আহমদ মনে করেন, ‘বাংলাদেশে রাজনৈতিক গণতন্ত্রের ক্ষেত্রে যেন অন্ধকার যুগের সূচনা হতে চলেছে। বিগত দশম ও একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। উপজেলা পরিষদ, ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কাউন্সিলর পদের নির্বাচন এবং ঢাকা উত্তর মেয়র পদে উপনির্বাচন- সবখানেই একই অন্ধকারের ছায়া বিস্তৃত।

এই অন্ধকার দিকে যাত্রা একদিনে হয়নি… সরকারি দল সর্বত্র খালি মাঠে গোল দিয়ে চলেছে।’ পত্রিকার পাতায় পরিলক্ষিত হচ্ছে, সর্বত্রই ‘আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগ’ লড়াই চলছে। প্রথম ধাপে ৮৭টি উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের ১৭ জন ‘বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায়’ নির্বাচিত হয়েছেন। আর ৫০টি উপজেলায় ছিলেন আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী। প্রথমবারের মতো দলীয় প্রতীকে নির্বাচন হওয়ায় সব উপজেলায় চেয়ারম্যান পদে একক প্রার্থী দিয়েছে দলটি। জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট, ২০ দলীয় জোট, বাম গণতান্ত্রিক ফ্রন্ট এবং ইসলামী আন্দোলন আগেই এ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিয়েছে। দ্বিতীয় ধাপে ১২৪টি উপজেলার নির্বাচনে প্রাথমিক তথ্য মোতাবেক, ১২টি উপজেলায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। তৃতীয় ও চতুর্থ ধাপেও একই দৃশ্য। এই রাজনৈতিক চিত্রের মধ্যেও যে দু-চারজন বিরোধী বা স্বতন্ত্র প্রার্থী নির্বাচন করতে সাহস করছেন- তাদের ভয়ভীতি প্রদর্শন, প্রশাসনিক চাপ ছাড়াও অর্থের বিনিময়ে প্রার্থিতা থেকে বিরত রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ প্রকাশিত হয়েছে।

এ উত্তাপ, উত্তেজনা ও উদ্দীপনাবিহীন উপজেলা নির্বাচন জনগণের কোনো কাজে আসবে না বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকমহল মনে করে। এটা প্রাথমিকভাবে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয় মনে হলেও কার্যত এ ধরনের নির্বাচন তাদের জন্য রাজনৈতিক বিপর্যয় সৃষ্টি করবে। এ ধরনের একক নির্বাচনের মাধ্যমে তারা জনগণের ওপর দলীয় সিদ্ধান্ত আরোপ করেছেন। গণতন্ত্রের স্বতঃস্ফূর্ততা এ ক্ষেত্রে অনুপস্থিত। তার ফলে ৩০ ডিসেম্বরের সংসদ নির্বাচনের ফলে সৃষ্ট হতাশা ও ক্ষোভ আরো বৃদ্ধি পাবে। একক দলীয় নির্বাচনের মাধ্যমে যেসব নেতৃত্ব উপজেলায় আরোপিত হচ্ছে, তাদের গরিষ্ঠ অংশ জনগণের কাছে অগ্রহণযোগ্য। ক্রমেই ভালো মানুষেরা সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছেন এবং খারাপ লোকেরা প্রকারান্তরে সমাজ পরিচালনা করছেন। অদূর ভবিষ্যতে সমাজে ও রাষ্ট্রে এর অশুভ প্রতিক্রিয়া পরিদৃষ্ট হবে; যা সরকার ও জনগণ কারো জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না।

লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়