ইসলামী দৃষ্টিতে সাহিত্য বিচার

18

সাহিত্য ভাষানির্ভর। হেজাজে ইসলাম-পূর্ব যুগেই আরবি একটা শক্তিশালী লিখিত ভাষায় পরিণত হয়েছিল। হেজাজের আরবদের মধ্যে বেশ কিছুসংখ্যক ব্যক্তি আরবিতে পড়তে, লিখতে ও গুনতে পারতেন। তাই সেই সময়েই হেজাজের আরবদের একটা নিরক্ষর জাতি বলা যেত না। মক্কার কাছে, ওকাজ নামে একটি জায়গা ছিল। যেখানে প্রতি বছর বসত একটা বিরাট মেলা। মেলাতে থাকত নানা আমোদ-প্রমোদের ব্যবস্থা। হতো দৌড়-ঝাঁপের প্রতিযোগিতা। এই মেলায় আসতেন অনেক কবি। এসব কবি তাদের স্বরচিত কবিতা পাঠ করে শোনাতেন মেলায় উপস্থিত কবিতার স্রোতাদের। যাদের কবিতা ভালো লাগত, মেলায় উপস্থিত স্রোতারা করতেন তাদের পুরস্কৃত। যাদের কবিতা খুবই ভালো বলে বিবেচিত হতো, তাদের কবিতা সমাদর করে লেখা হতো কাবাগৃহের প্রাচীরে। যার কিছু নিদর্শন এখনো বিদ্বমান আছে। সে যুগের কিছু কবির নাম পাওয়া যায়। এরা হলেন : ইমরুল কায়েস, তারাফা, জোয়াহির, আন্তারা প্রমুখ। কবিতার মাধ্যমে গল্পও বলা হতো। যার নিদর্শন এখনো টিকে আছে। যেমন হাতেম তাই। কাহিনীটি ইসলামী না হলেও মুসলিম সমাজে তা হয়ে আছে শ্রদ্ধার। কেননা, হাতেম ছিলেন দানবীর। যা কিছু মানুষের কল্যাণ করে, তাই ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে হলো শ্রেয়।

কুরআন শব্দটি এসেছে আরবি ইকরা শব্দ থেকে। ইকরা বলতে বোঝায় পড়া অথবা আবৃত্তি করা। ইসলাম একটি লিখিত ধর্ম। তাই অনেক সুনির্দিষ্ট। কুরআনে প্রথম নাজিল হওয়া সূরা হলো আলাক। যদিও সূরাটির ক্রমিক সংখ্যা হলো ৯৬। যাতে বলা হয়েছে:
পাঠ করো তোমার মহা প্রভুর নাম উচ্চারণ করে।
যিনি মানুষকে সৃষ্টি করেন রক্ত জমাট করে।
তিনি মানুষকে শিখিয়েছেন লেখনীর ব্যবহার।
যার মাধ্যমে তিনি তাকে দিয়েছেন জ্ঞান, নানা অজানার।
আল কুরআনের একটা নাম ফুরকান। ফুরকান শব্দের অর্থ আলো। অর্থাৎ কুরআন মানুষকে অজানাকে জানতে, জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চা করতে উৎসাহ জুগিয়েছে। কুরআনের এই অনুপ্রেরণা মুসলমানদের সভ্যতার স্বর্ণযুগে দিয়েছে জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ।
গ্রিক দার্শনিক প্লাতো (আফলাতুন) তার আদর্শ রাষ্ট্রে কবিকে স্থান দিতে চাননি। কেননা, কবিরা কল্পনাবিলাসী। তাই তারা হলেন শেষ পর্যন্ত সত্যবিদ্বেষী। আদর্শ রাষ্ট্রে সত্যবিদ্বেষীদের স্থান হতে পারে না। কুরআন শরিফে কবিদের সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ করা হয়েছে। বলা হয়েছে যুক্তি-বুদ্ধিকে বাদ দিয়ে কবিদের কথার কুহুকে না পড়তে (সূরা ২৬: ২২৪)। অন্য দিকে আল কুরআনে লোকমান হাকিমকে খুব উচ্চস্থান দেয়া হয়েছে। কারণ, যদিও তিনি নিছক গল্প বলেছেন, কিন্তু তিনি তা বলেছেন মানুষকে নীতিশিক্ষা দেয়ার জন্য। যা কিছু মানুষকে নৈতিক করে, ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে তাই হলো শ্রেয় (সূরা ৩১ : ১২)। এই সূরায় আরো বলা হয়েছে, গাধার মতো চিৎকার না করতে। মূল্য দেয়া হয়েছে সুকণ্ঠের। বলা হয়েছে গর্বিত না হতে। যা থেকে মনে হয় কুরআনের শিক্ষা হলো, লেখক হিসেবে অহঙ্কারী না হতে।
ইসলাম ও সাহিত্য প্রসঙ্গে যথেষ্ট বিশদভাবে আলোচনা করেছেন কবি দার্শনিক ইকবাল (১৮৭৩-১৯৩৮), যা আমার মনে হয় এখনো আমাদের জন্য হয়ে আছে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক।
মুসলিম দার্শনিকদের মধ্যে দু’টি সম্প্রদায়ের উদ্ভব হতে পারে। যার একটিকে বলে ‘জাবরিয়া’। আর অপরটিকে বলা হয় ‘কাদরিয়া’। জাবরিয়ারা বলেন, যেহেতু কোনো কিছুই অকারণে ঘটে না, তাই সব কিছুই ঘটে পূর্বাবস্থার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিতভাবে। এখানে মানুষের কিছু করণীয় নেই। অর্থাৎ এরা মানুষের স্বাধীন ইচ্ছায় বিশ্বাস করেন না। শেষ পর্যন্ত এরা হয়ে উঠতে চান ভাগ্যবাদী (তকদির)। অন্য দিকে কাদেরিয়ারা বলেন, মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা না থাকলে কোনো অপরাধের জন্য তাকে দায়ী করা চলে না। দেয়া যেতে পারে না কোনো শাস্তি।
ফলে সমাজে দণ্ড ভয়ের অভাবে বেড়ে যেতে পারে অপরাধপ্রবণতা। সমাজ হয়ে উঠতে পারে বাসের অযোগ্য। তাই অপরাধীকে দিতে হবে শাস্তি। বলতে হবে, সে ইচ্ছা করেই করেছে অপরাধ। সে অপরাধ না করলেও পারত। এই দুই মতকে সমন্বিত করবার একটা চেষ্টাও হয়েছে ইসলামী চিন্তাবিদদের মধ্যে। এদের বক্তব্য, বন্যা হয় প্রাকৃতিক কারণে। কিন্তু মানুষ নদীতে বাঁধ বাঁধে বন্যা নিবারণের জন্য। মানুষ তার বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেতে পারে। এখানেই আছে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছার মূল্য। স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে অস্বীকার করে না। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা প্রাকৃতিক নিয়মকে কাজে লাগিয়ে বেঁচে থাকতে চায়। আর কুরআনে সূরা সাদ-এ বলা হয়েছে, আল্লাহ হজরত আদম আ:কে সৃষ্টি করেছিলেন কাদামাটি দিয়ে। কিন্তু পরে তিনি তার মধ্যে প্রবিষ্ট করে দেন নিজের নিঃশ্বাস। একে ব্যাখ্যা করা যায় এভাবে যে, আল্লাহ মানুষকে দিয়েছেন তাঁর সৃষ্টি-শক্তির অংশ।
মানুষ কলের পুতুল নয়। সে তার জীবনকে নিজের চেষ্টায় গড়ে তুলতে চায় এবং বেশ কিছু পরিমাণে পারেও। সেই সাহিত্যই শ্রেয়, যে সাহিত্য মানুষকে তার নিজের জীবনকে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করে। তাকে করে তোলে না বিষণœ আর নিরাশাবাদী। এ হলো ইসলামের সাহিত্য বিচারের আরেকটি দিক। ইসলামে মানুষকে ভাবা হয়েছে সৃষ্টি-শক্তিসম্পন্ন প্রাণী হিসেবে। এখানেই ধর্ম বিশ্বাস হিসেবে ইসলামের বিশেষ শ্রেষ্ঠতা। অবশ্য অন্য ধর্মেও যে অনুরূপ কথা একেবারেই বলা হয়নি, তা নয়।
কবি দার্শনিক ইকবালের মতে, যেহেতু আল কুরআনে বলা হয়েছে, আল্লাহ মানুষকে সৃষ্টি করেছেন মর্তের খলিফা হিসেবে (সূরা ২ : ৩০)। তাই ধরা চলে আল্লাহ মানুষকে মর্তের ঘটনাবলিকে নিয়ন্ত্রণের শক্তি দিয়েছেন। আমাদের কর্তব্য হবে এই শক্তিকে যথাযথভাবে প্রয়োগ। ভাগ্যবাদী হয়ে চুপ করে বসে থাকা নয়। তিনি তাঁর ‘বাঙ্গেদ্বারা’ (ঘণ্টার আওয়াজ) কাব্যগ্রন্থে বলেছেন :
খুদহি কো কর বুলন্দ ইতনা কি হর তকদীর সে পহেলে
খুদা বন্দে সে খুদ পুছে বতা তেরী রজা কেয়া হ্যায়?

নিজেকে আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান করে তোলো। যেন বিধাতা তোমার ভাগ্যলিপি রচনার আগে তোমাকে জিজ্ঞাসা করেন, বলো তুমি কী চাও, কী তোমার সত্তার অভিপ্রায়।
কবি ইকবাল চেয়েছেন মানুষকে সক্রিয় করে তুলতে। তিনি ছিলেন শক্তিবাদের কবি। মুসলিম জনসমাজে তিনি চেয়েছিলেন আবার শক্তিবাদে প্রত্যয়ী করতে।
কবি আল মাহমুদ (১৯৩৬-২০১৯) ইন্তেকাল করলেন। তিনি ছিলেন আমার একজন আন্তরিক বন্ধু। তার সাথে আমার বহু বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। যার মধ্যে সাহিত্যে ইসলামের প্রভাব কেমন হওয়া উচিত, সেটিও ছিল উপজীব্য। কিন্তু আমি তার সাথে এ ক্ষেত্রে একমত হতে পারিনি। কেননা আমার মনে হয়েছে তিনি পারলৌকিক ইসলামের ওপর যে পরিমাণ আকৃষ্ট, ইহজাগতিক ইসলামের ওপর তা নন। তার চিন্তা থেকে ইসলামের ইহজাগতিক দৃষ্টিভঙ্গি হতে চলেছে অপসৃত। মনে হয়েছে তার বয়োবৃদ্ধি এর একটি কারণ। কেননা বয়োবৃদ্ধির সাথে সাথে মানব মনে ভিড় করে মৃত্যুচিন্তা; আর পারলৌকিক চিন্তা-ভাবনা।
ক’দিন আগে ভারতের খ্যাতনামা লেখিকা অরুন্ধতী রায় (জন্ম ২৪ নভেম্বর ১৯৬১) ঢাকায় এসেছিলেন। তার নামটি খাঁটি বাঙালি হিন্দু। কারণ তার পিতামহ ছিলেন ব্রিটিশ শাসনামলের বাংলা প্রদেশের বরিশাল জেলার অধিবাসী। কিন্তু তার মাতা হলেন ভারতের কেরেলা (কেরল) প্রদেশের লোক। কেরেলা প্রদেশ গঠিত হয়েছে ভারত স্বাধীন হওয়ার পরে ১৯৫৬ সালে। কেরেলা গঠিত হয়েছে কোচিন ও ত্রিবেন্দম নামক দু’টি দেশীয় রাজ্য এবং মালাবার নামক ব্রিটিশ শাসিত অঞ্চলকে একত্র করে। ব্রিটিশ শাসনামলে মালাবার ছিল তখনকার মাদ্রাজ প্রদেশের সাথে যুক্ত। মালাবার অঞ্চল ছিল মুসলিমপ্রধান। মালাবারের মুসলমানদের বলা হয় মোফলা।
এখানে ইসলাম প্রচারিত হয় আরব মুসলমান বণিকদের দিয়ে, প্রথম হিজরিতে। অর্থাৎ প্রথম ইসলাম প্রচারিত হয়, মালাবারে দক্ষিণ এশিয়ায়। মালাবারের কাছেই হলো লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ। এই দ্বীপপুঞ্জের অধিবাসীরাও হলেন মোফলা মুসলমান। লাক্ষা দ্বীপপুঞ্জ ভারত সরকার কর্তৃক কেন্দ্রীয় শাসিত অঞ্চল হিসেবে শাসিত হয়; কোনো প্রদেশ হিসেবে নয়। কেরেলায় অবস্থিত কালিকট (কজিকোট)। এখানে পর্তুগিজ নাবিক ভাস্কোদাগামা এসে অবতরণ করেছিলেন ১৪৯৮ সালে। যার আগমন পথ অনুসরণ করে এই উপমহাদেশে সমুদ্রপথে আগমন শুরু হয় ডাচ, ফরাসি ও ইংরেজদের। যাদের আগমনে বদলে যায় আমাদের ইতিহাসের ধারা। কেরেলার ভাষা হলো মালয়লাম। মালয়লাম দ্রাবিড় পরিবারভুক্ত ভাষা। ভাষাটি তামিল ভাষার খুবই নিকট সম্পর্কীয়। কিন্তু কেরেলায় বহু মানুষের ভাষা এখন হয়ে উঠছে কার্যত ইংরেজি। এর একটা কারণ সমুদ্রপথে এরা যান নানা দেশে জীবিকার অন্বেষণে। অরুন্ধতী রায় সাহিত্য চর্চা করেছেন মালয়লাম ভাষায় নয়; ইংরেজি ভাষায়। এর কারণ ইংরেজি হলো তার মাতৃভাষারই মতো।

অরুন্ধতী রায়ের বয়স যখন ২ বছর, তখন তার মাতার সাথে তার পিতার বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে। তার মাতা তাকে নিয়ে যান কেরেলায়। সেখানেই তিনি মানুষ হন। তিনি বাংলার বিন্দু-বিসর্গও জানেন না। পড়েও বুঝতে পারেন না। তিনি বাংলাদেশে এসেছিলেন তার প্রপিতামহর দেশকে খোলামেলাভাবে দেখতে। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার তার বাদ সাধলেন। কেন তার সাথে এ রকম রূঢ় ব্যবহার করা হলো, আমরা জানি না। হতে পারে এর একটা কারণ হলো, তিনি কাশ্মিরিদের স্বাধীনতার পক্ষে।
অরুন্ধতীর সাহিত্যের মূল্য নিয়ে আলোচনা করা এখানে বান্তর হবে না। তবে তার ‘দি গড অব স্মল থিংস’ বইটির মধ্যে প্রাধান্য পেয়েছে একটা সর্বজনীন বিষন্নতাবোধ। কেরেলা একটি বামপন্থী আন্দোলনের জায়গা। সারা ভারতের মধ্যে কেরেলায় কমিউনিস্টরা প্রাদেশিক পরিষদে প্রথম ক্ষমতায় আসেন ১৯৫৭ সালে, ভোটের মাধ্যমে। যা সে সময় সারা বিশ্বে হয়ে উঠেছিল বিশেষ আলোচ্য। অরুন্ধতীর ওপর কোনো বাম চিন্তার প্রভাব পড়েছে বলে মনে হয় না। অরুন্ধতী তার বই ‘দি গড অব স্মল থিংস’-এর জন্য বুকার পুরস্কার পান ১৯৯৭ সালে। বুকার পুরস্কার দেয়া হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি বিশেষ ট্রাস্টি থেকে, যার প্রতিষ্ঠা করে যান বুকার ভ্রাতারা। বুকার প্রাইজের সম্মান বিশ্বজুড়ে। যদিও ঠিক নোবেল প্রাইজের মতো নয়। আমরা আশা করব, অরুন্ধতী রায় ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশে আসবেন এবং খোলামেলাভাবে দেখতে পারবেন তার প্রপিতামহের দেশকে।
আমরা বাংলাদেশে তার বিষন্নতাবাদকে অনুসরণ করব না। আমরা অনুসরণ করব ইকবালের শক্তিবাদের দর্শনকে। বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। এই দেশ ইসলামী ঐতিহ্যকে অনুসরণ করবে, সেটাই স্বাভাবিক।

লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট