হান্টিংটন থিসিস, হোয়াইট সুপ্রিমেসি ও সন্ত্রাস

24

হোয়াইট সুপ্রিমেসি বা হোয়াইট সুপ্রিমেসিজম হচ্ছে একটি বর্ণবাদী বিশ্বাসের নাম। এর সারকথা : শ্বেতাঙ্গরা হচ্ছে অন্য সব জাতি-সম্প্রদায়ের তুলনায় সর্বশ্রেষ্ঠ। অতএব, অন্য সব বর্ণসম্প্রদায়ের ওপর শ্বেতাঙ্গদের প্রাধান্য বজায় রাখতে হবে : হোয়াইট পিপল আর সুপিরিওর টু পিপল অব আদার রেসেজ অ্যান্ড দেয়ারফোর শুড বি ডমিন্যান্ট ওভার দেম।

হোয়াইট সুপ্রিমেসির শেকড় নিহিত ‘সায়েন্টিফিক রেসিজম’-এ এবং এটি প্রায়ই নির্ভর করে জিওডোসায়েন্টিফিক তথা বিজ্ঞানকল্প যুক্তির ওপর। সায়েন্টিফিক রেসিজমের আরেক নাম রেস বায়োলজি। এটি হচ্ছে একটি জিওডোসায়েন্টিফিক বিলিভ বা বিজ্ঞানকল্প বিশ্বাস। এই বিশ্বাস মতে, বর্ণবৈষম্য বা রেসিজমের প্রতি এম্পিরিক্যাল বা বৈজ্ঞানিক পরীক্ষানির্ভর সাক্ষ্যপ্রমাণের সমর্থন রয়েছে। অন্য কথায়, বিজ্ঞান রেসিজমকে বা বর্ণবৈষম্যকে অর্থাৎ মানুষের বর্ণম্প্রদায়গত শ্রেষ্ঠত্ব ও নিকৃষ্টতাকে (রেস সুপিরিওরিটি এবং রেস ইনফেরিওরিটি) নাকি সমর্থন করে। নব্য-নাৎসিবাদের মতো একই ধরনের অন্যান্য আন্দোলনকারী হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরাসহ অন্যান্য বর্ণসম্প্রদায় একই সাথে ইহুদিদেরও কট্টর বিরোধী।

হোয়াইট সুপ্রিমেসিজম পরিভাষাটি কখনো কখনো ব্যবহার করা হয় একটি রাজনৈতিক আদর্শকে বর্ণনা করতেও, যাতে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠীর সামাজিক, রাজনৈতিক, ঐতিহাসিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রাধান্য চিরস্থায়ী করার কথা বলা হয়। এর সাক্ষ্য মিলে ঐতিহাসিক ও সমসাময়িক সামাজিক-রাজনৈতিক কাঠামোতে। এর প্রতিফলন আছে যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টিক দাস ব্যবসায় ও ‘জিম ক্রো’ আইনে এবং দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ বর্ণবাদী শাসনে। বিভিন্ন ধরনের হোয়াইট সুপ্রিমেসিজমে নানা ধরনের ধারণা উপস্থাপন করা হয়। যেমনÑ কাকে ‘শ্বেতাঙ্গ’ গণ্য করা হবে তাতেও আছে বিভিন্নতা। আর বিভিন্ন হোয়াইট সুপ্রিমেস্টি গ্রুপের কাছে তাদের প্রাথমিক শত্রু বর্ণসম্প্রদায় ও সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীও আলাদা।

শিক্ষার ক্ষেত্রে, বিশেষত ‘ক্রিটিক্যাল রেস থিওরি’ বা ‘ইন্টারসেকশনালিটি’র ক্ষেত্রে হোয়াইট সুপ্রিমেসি’ পদবাচ্যটি দিয়ে বোঝানো হতে পারে একটি রাজনৈতিক অথবা আর্থসামাজিক ব্যবস্থাকে, যেখানে শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তুলনায় সম্মিলিত পর্যায়ে বা ব্যক্তিপর্যায়ে কাঠামোগত অগ্রাধিকার পায়।

হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টদের সর্বশেষ ঘৃণাত্মক সন্ত্রাসী আঘাতের উদাহরণ হচ্ছে নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের আল নূর মসজিদে গত ১৫ মার্চে জুমার নামাজরত মুসলমানদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালানোর ঘটনা। এ হামলায় শহীদ হলেন ৫০ জন মুসলমান ও আহত আরো ৪০ জনের মতো মুসল্লি। এই হামলাকে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখা যায় না। এর সাথে সংশ্লিষ্ট রয়েছে সেইসব মনোভাব, যে অভিবাসনবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী মনোভাব গড়ে তোলা হয়েছে প্রথমত স্যামুয়েল হান্টিংটনের লেখা বই ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশনস’-এ।

নিউজিল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী জেসিন্ডা আরডার্ন ও আরো কয়েকজন নিশ্চিত করেছেন, তারা এই মসজিদে হামলা চালানোর কয়েক মিনিট আগে সন্দেহভাজন হামলাকারীর ‘ম্যানিফেস্টো’র একটি কপি পেয়েছেন। হামলা চালানোর আগে ৮৭ পৃষ্ঠার এই ম্যানিফেস্টো সামাজিক গণমাধ্যমেও প্রকাশ করা হয়। এটা ভরপুর রয়েছে অভিবাসীবিরোধী ও মুসলিমবিদ্বেষী বক্তব্যে, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই অতি ডান চরমপন্থী সন্ত্রাসী অ্যান্ডার্স ব্রেইভিকের কথা, যে একই ধরনের হোয়াইট সুপ্রিমেস্টি ডগমা বা অন্ধবিশ্বাসতাড়িত অভিবাসীবিরোধী মনোভাবে ২০১১ সালের ২২ জুলাইয়ে নরওয়েতে একটি ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছিল। সে হামলায় অসলোতে বোমা হামলায় নিহত হয় আটজন এবং পাশের দ্বীপে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলায় নিহত হয় ৬৯ জন- এই ঘটনায় মোট ৭৭ জনের প্রাণহানি ঘটেছিল।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর সময়ে এটিই হচ্ছে নরওয়েতে পরিচালিত সবচেয়ে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা। ব্রেইভিকের সন্ত্রাসী ঘটনায় প্ররোচিত হয়ে আল নূর মসজিদে এবার বর্বর সন্ত্রাসী হামলা চালিয়েছে ব্রেন্টন হ্যারিসন ট্যারান্ট, এ কথা নিশ্চিত। উল্লিখিত ম্যানিফেস্টোর লেখক এতে ব্রেইভিকের নাম উল্লেখ করতেও ভোলেনি। সিএনএনসহ কিছু আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম জানিয়েছে, এই সন্ত্রাসী তার অনলাইন ভিউয়ারদের বলেছিল, PewDiePie-এর ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করতে। কেউ যদি সতর্কতার সাথে ব্রেইভিক ও ট্যারান্টের ম্যানিফেস্টো এবং হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট ও হোয়াইট টেররিস্ট গ্রুপগুলোর বিশ্বে ছড়িয়ে দেয়া একই ধরনের বিভিন্ন ডকুমেন্ট পড়েন, সুস্পষ্টভাবে দেখতে পাবেন- এতে হান্টিংটন থিসিসের সাথে গভীর মিল রয়েছে। এতে অতি ডান চরমপন্থীদের ধারণার প্রতিফলন রয়েছে।

স্যামুয়েল হান্টিংটন তার সভ্যতার দ্বন্দ্ব সম্পর্কিত বিতর্কিত থিসিসে উল্লেখ করেন- এই নতুন দুনিয়ায় দ্বন্দ্বের মৌলিক উৎস আদর্শিক, অর্থনৈতিক বা সাংস্কৃতিক বিষয়গত নয়। তার মতে, স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে দ্বন্দ্ব ছিল পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে এবং তখন এসব দেশ যুদ্ধ করেছে, ডেমোক্র্যাসি ও কমিউনিজমের মতো রাজনৈতিক আদর্শগত দ্বন্দ্বে। তার মতে, স্নায়ুযুদ্ধ ছিল একটি বিপথগামিতা বা বিচ্যুতি। আর এই বিচ্যুতির পর বিশ্বদ্বন্দ্বের প্রকৃতিতে আসবে একটি পরিবর্তন। এর ফলে মতবিরোধ চলবে আজকের বিশ্বের প্রধান প্রধান সভ্যতার মধ্যে। তার চিহ্নিত ৯টি সমসাময়িক সভ্যতার মধ্যে, তার দৃষ্টি নিবন্ধিত হয়েছে তিনটি সভ্যতার ওপর : ডবংঃ, ওংষধস ধহফ ঝরহরপ। অর্থাৎ, হান্টিংটনের প্রস্তাব মতে- বর্তমান বিশ্বে সভ্যতার সঙ্ঘাতের ফলে পাশ্চাত্যের জন্য হুমকিটা আসবে প্রধানত ইসলামের অনুসারী এবং চীনাদের কাছ থেকে। তার তত্ত্ব বিভ্রান্ত করেছে অসম শক্তির বাস্তবতার বিষয়টিকে, যা গভীরতম বিভাজন সৃষ্টি করে রেখেছে ধনী ও গরিব দেশগুলোর মধ্যে। হান্টিংটনের এই বিভাজন গঠন করা হয়েছে অনেকটা অসতর্কভাবে।

হান্টিংটনের এই থিসিস আলোচনা-সমালোচনায় প্রাধান্য পায় ১৯৯৩ সালে এটি ‘ফরেন অ্যাফেয়ার্স’-এ প্রকাশিত হওয়ার পর। পরবর্তী সময়ে এটি প্রকাশিত হয় বই আকারে। এর পর থেকে এই থিসিস গুরুত্ব পেলো যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশনীতি সূত্রায়নের প্রাথমিক অবকাঠামো হিসেবে। হান্টিংটন তত্ত্ব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে পাশ্চাত্যের, বিশেষত আমেরিকানদের মানসে এবং একটি ফেয়ার-সাইকোসিস হিসেবে ভীতি তালিকায় স্থান দেয় নয়া শত্রু ‘ইসলাম’কে।

থিসিসের জন্য হান্টিংটন ব্যাপকভাবে নির্ভর করেছেন প্রখ্যাত প্রাচ্যবাদী ইবৎহধৎফ খবরিং-এর ১৯৯০ সালের একটি লেখার ওপর। এই লেখার শিরোনাম- ‘The Roots of Muslim Rage’-এর মাঝেই স্পষ্ট ধরা পড়ে তার মনস্তাত্ত্বিক অবস্থান। ‘সিভিলাইজেশন আইডেন্টিটি’-এর গভীরতর প্রভাব বিষয়ে অনুসন্ধান না চালিয়েই হান্টিংটন তিনটি মাপকাঠি তুলে ধরেন ভবিষ্যৎ এই দ্বন্দ্ব সম্পর্কে : between ‘core states’, between ‘fault-lines’ of the civilizations and fault-lines between groups within the states.

হান্টিংটনের থিসিসের গুরুত্ব প্রাথমিকভাবে নিহিত রয়েছে এর বিরোধিতা ও সমালোচনাগুলো বিভিন্নভাবে পর্যালোচনা করে দেখার মধ্যে। সভ্যতার প্রশ্নে তার মনোলিথিক আইডেন্টিটিজের বিরুদ্ধে আছে নানা অভিমত। এ ছাড়াও, হান্টিংটনের তত্ত্বের প্রচুর সমালোচনা হয়েছে, তার মধ্যে যেটি সবিশেষ উল্লেখ্য, তা হচ্ছে ‘থিওরি অব ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’। এর উল্লেখ আছে গ্লোবাল মিডিয়া জার্নালের কানাডীয় সংস্করণের পঞ্চম খণ্ডে, ২০১২ সালে প্রকাশিত কধৎরস ধহফ ঊরফ-এর লেখা ঈষধংয ড়ভ ওমহড়ৎধহপব-এ। এতে উল্লেখ করা হয়, এই অ্যান্টিথেটিক অবস্থানের কথা হচ্ছে- সঙ্ঘাত প্রাথমিকভাবে উদ্ভূত হয় জ্ঞান উৎপাদনের মতবিরোধ বা ফল্টলাইন থেকে এবং আন্ত-সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মাঝে যোগাযোগ ও বোঝাপড়ার ব্যর্থতা থেকে। এ ধরনের সমালোচনা শুধু আন্তঃসাংস্কৃতিক বহুবিষয়ের ওপর জ্ঞানগত গবেষণার অনন্য সম্ভাবনাই সৃষ্টি করে না, বরং প্রমাণ করে- বিভিন্ন সংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যকার চরম সঙ্ঘাত ও ভুল বোঝাবুঝি নিরসনের উপায়ও এটি। প্রকৃতপক্ষে কধৎরস ধহফ ঊরফ-এর অভিমত হচ্ছে : ‘রিলিজিয়াস ইলিটারেসি’ এবং অন্যদের সম্পর্কে ‘কালচারাল ইগনোরেন্স’ নিহিত রয়েছে সমস্ত ‘ক্ল্যাশেস অব ইগনোরেন্সের’ মূলে।

একটি উদাহরণ টানা যায় পাশ্চাত্য সমাজ ও মুসলিম সমাজের। এ দুই সংস্কৃতির অনেক উৎপাদনশীল মিথস্ক্রিয়ার একটি বিপুল জ্ঞানভাণ্ডার শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে নির্মম ও গোপনীয়ভাবে একপাশে সরিয়ে রাখা হয়েছে। জুডাইজম, খ্রিষ্টধর্ম, ইসলাম ও সমসাময়িক পাশ্চাত্য দর্শনের অভিন্ন ‘আব্রাহামিক’ শেকড় এমনই একটি বিষয়। পাশ্চাত্য ও ইসলাম সম্পর্কে অনেক প্রাধান্য সৃষ্টিকারী আলোচনায় ধারণা দেয়া হয় বৈরী ভূরাজনৈতিক দুই সত্তা হিসেবে, যারা বন্দী হয়ে আছে নিজ নিজ সীমানায়। কিন্তু আমরা জানি, ইউরোপে মুসলমানের উপস্থিতি ১৩০০ বছরের পুরনো। নিশ্চয়ই এ সময়টা খুব কম সময় নয়। কিন্তু এডওয়ার্ড সাঈদ তার বিখ্যাত বই ‘ওরিয়েন্টালিজম’-এ যেমন প্রশ্ন তুলেছেন : how can we speak of Western Civilization except as the ideological fiction implying the superiority of a handful of ideas and values that itself has no meaning outside the history of conquest, immigration and travel?

হান্টিংটনের তত্ত্বে এসব যাবতীয় জটিলতার বাইরে, স্নায়ুযুদ্ধের নমুনা অর্থাৎ পাশ্চাত্য বনাম বাকি দুনিয়ার যুদ্ধের নমুনা ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে এবং ২০০১-এর ১১ সেপ্টেম্বরের পর থেকে ঘটা প্রতিটি সুপরিকল্পিত হত্যার ঘটনা সহায়তা করেছে হান্টিংটনের তত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করতে। যেমন- ব্রিটিশ সাপ্তাহিক ‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর সে সময়ের ২২-২৮ সেপ্টেম্বর সংখ্যায় জেনারেলাইজেশনে নেমে অসংযতভাবে হান্টিংটনের প্রশংসা করে, তার ইসলাম সম্পর্কিত cruel and sweeping, but nonetheless acute observations’-এর জন্য; এ কথাটি উল্লেখ করেছেন এডওয়ার্ড সাঈদ। অধিক থেকে অধিকসংখ্যক আমেরিকান সংবাদপত্র ও সাময়িকী সংযোজন করেছে একই ধরনের ক্ষতিকর নানা বক্তব্য। যখন বুশ প্রশাসন এক ধরনের ক্রুসেড হিসেবে আরব দেশগুলোতে ‘গণতন্ত্রের উন্নয়নের কাজ’ হাতে নেন, তখনো তিনি ঘোষণা দিলেন ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ বলতে কিছু নেই, যখন এটি আসে ‘জনগণের অভিন্ন অধিকার ও চাহিদা’ হিসেবে (Ronald Inglehart and Pippa Norris, 2003, ‘The True Clash of Civilizations’, Foreign Policy, No. 135. pp. 62-70)|

ক্রাইস্টচার্চের সাম্প্রতিক যে হামলা হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্টরা ঘটাল, তা মনে করিয়ে দেয় আরেকটি একই ধরনের সন্ত্রাসী হত্যাযজ্ঞের কথা। একটি ফিলিস্তিনি মসজিদে পরিচালিত হয় এই হত্যাযজ্ঞ। ঘটনাটি কয়েক দশক আগে ঘটিয়েছিল ইহুদি সুপ্রিমেসিস্টরা। ১৯৯৪ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি ইধৎঁপয এড়ষফংঃবরহ নামের এক ইহুদি ফিলিস্তিনের হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদে ঢুকে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ২৯ জন ফিলিস্তিনি মুসলমানকে হত্যা করেছিল। আহত করে আরো ১২৫ জনকে। এ সময় তার পরনে ছিল সামরিক পোশাক। তখন ওই মসজিদ কক্ষে ৮০০ মুসল্লি ফজরের নামাজ পড়ছিলেন। এই হামলা চালানোর সময় সেখানে ইসরাইলি সেনারা ‘প্রহরারত’ ছিল। একটি বর্ণনা মতে, হামলার ঘটনার সময় ৯ জন ইসরাইলি সেনা ভাবনটি প্রহরায় ছিল। দিনটি ছিল সে বছরের জন্য ইহুদিদের ‘পুরিম দিবস’। ইহুদিদের মতে, এরা এই দিনে ইহুদিদের রক্ষা করেছিল রাজা ‘হামান দ্য ইভ্লে’র হাত থেকে, যিনি ইহুদিদের হত্যা করতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনা প্রথম পারস্য সাম্রাজ্যের আমলের (খ্রিষ্টপূর্ব : ৫৫০-৫৩০), যার কাহিনী বর্ণিত আছে বিবলিক্যাল বুক অব এস্থার’-এ।

বারুচ গোল্ডস্টিনের জন্ম ১৯৫৬ সালের ৯ ডিসেম্বর। মৃত্যু ২৫ ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪। সে একজন চিকিৎসক, চরমপন্থী ও বহু লোকের খুনি। ইব্রাহিমি মসজিদে এই হামলা চালানোর পর ধরা পড়ে এই হত্যাযজ্ঞ থেকে বেঁচে যাওয়া লোকদের হাতে। অবশেষে তাদের গণপিটুনিতেই সে প্রাণ হারায়।

তখন আটক করা হয় কধপয সড়াবসবহঃ-এর নেতা মির কাহানির অনুসারীদের। কাহানির সংশ্লিষ্টতা ছিল সন্ত্রাসী আন্দোলনের সাথে। কাচ ছিল ১৯৭১ থেকে ১৯৯৪ সাল পর্যন্ত ইসরাইলে অস্তিত্বশীল একটি র‌্যাডিকেল গোঁড়া ইহুদিবাদী ও অতি চরমপন্থী রাজনৈতিক দল। রাব্বি মির কাহানি এর প্রতিষ্ঠাতা। বারবার ব্যর্থতার পর ১৯৮৪ সালে নির্বাচনে এই দল নেসেটের একটি আসনে জয় পায়। ১৯৯০ সালে কাহানির হত্যার পর দলটি দুই ভাগে ভাগ হয়ে যায়। এই দলকে ফ্যাসিবাদ অবলম্বনের অভিযোগে ১৯৯২ সালের নির্বাচনে অংশ নিতে দেয়নি ইসরাইল সরকার। ১৯৯৪ সালে উভয় অংশকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। তাদের জন্য সেনাবাহিনীর ইস্যু করা অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। আজকের দিনে এই দলের উভয় অংশকে ইসরাইল, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান ও ইইউ দেশগুলো সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে গণ্য করে।

তখন পিএলও দাবি করেছিল : পশ্চিম তীরের সব সেটেলারকে নিরস্ত্র এবং ফিলিস্তিনিদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য একটি আন্তর্জাতিক বাহিনী গঠন করতে হবে। ইসরাইল তা করেনি, তবে হেবরনের প্রধান প্রধান আরব কমিউনিটি এরিয়ায় ইসরাইলিদের প্রবেশ সীমিত করা হয়। মসজিদে হামলার পর সেখানে দাঙ্গার প্রেক্ষাপটে এসব ব্যবস্থা নেয়া হয়। দাঙ্গার সময় ইসরাইলি নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের হাতে নিহত হয় ২৫ জন ফিলিস্তিনি, আর ইসরাইলি নিহত হয় পাঁচজন। তখন হেবরনের অনেক ইহুদি বসতি এলাকায় ফিলিস্তিনিদের যাতায়াত বন্ধ করে দেয়া হয়।

ইহুদি সুপ্রিমেসিস্টদের কাছে গোল্ডস্টিনের কবর তীর্থে পরিণত হয়। তার সমাধিতে খোদাই করে লিখে রাখা হয়েছে : ‘He gave his life for the people of Israel, its Torah and land. ১৯৯৯ সালে ইসরাইলে সন্ত্রাসীদের জন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভ স্থাপন অবৈধ করা হয়। এর পর গোল্ডস্টিনের কবরে নির্মিত সমাধি দেশটির সেনাবাহিনী ভেঙে ফেলে। তবে তার সমাধিতে পাথরে খোদাই করে লিখে গোল্ডস্টিনকে ‘মার্টায়ার, ক্লিনহার্ট ও পিওর হার্ট’ হিসেবে উল্লেখ করা লেখা অক্ষতই রয়ে গেছে। এ থেকে প্রমাণিত হয়, ইসরাইল সরকারের ভেতরেও ইহুদিবাদী সুপ্রিমেসিস্টরা ঘাপটি মেরে আছে। আর এই ইহুদি সুপ্রিমেসিস্টরা ও শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেস্টিরা এখনো একযোগে কাজ করে যাচ্ছে ইসলামকে প্রধান শত্রু গণ্য করে। এরা চায় পৃথিবীর বুক থেকে ইসলাম ধর্ম ও এর অনুসারীরা অস্তিত্ব হারিয়ে ফেলুক। আর এরা হান্টিংটনের তত্ত্বের সারকথা বুকে ধারণ করেই মাঝে মধ্যে সন্ত্রাসী হামলা চালায় ইসলাম আর এর অনুসারী মুসলমানদের ওপর। নিউজিল্যান্ডে সর্বসাম্প্রতিক শ্বেতাঙ্গ সুপ্রিমেসিস্টদের হামলা এরই আরেকটি উদাহরণ।

অব্যাহত হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট সন্ত্রাস হচ্ছে হান্টিংটন থিসিসের বাস্তব প্রয়োগ। তার তত্ত্বকে এরা ধারণ করে হোয়াইট সুপ্রিমেসিস্ট কাঠামোর আওতায়। এর মূল ইঙ্গিত হলো- ইসলাম হচ্ছে পাশ্চাত্য সভ্যতার অত্যাসন্ন বিপদ, ঠিক স্নায়ুযুদ্ধের সময়ে বিশ্বজুড়ে পাশ্চাত্যের স্বাধীনতার জন্য যেমন বিপদ হয়ে দেখা দিয়েছিল কমিউনিজম। এদের মতে, পাশ্চাত্যকে এখন শুধু নিজের সভ্যতাকেই বাঁচাতে হবে না, সেই সাথে প্রতিরোধ করতে হবে শত্রু-সভ্যতাকেও। আর এই ‘শত্রু-সভ্যতা’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে ইসলামকে। এ ধারণাই জোরদার করে তোলা হচ্ছে দিন দিন। অপর দিকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে চলেছে ইহুদি সুপ্রিমেসিস্টরাও।

জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদ ২০০১ সালকে ঘোষণা করেছিল ‘ইয়ার অব দি ডায়ালগ অব দি সিভিলাইজেশনস’ হিসেবে। এর পর ‘অ্যালায়েন্স অব সিভিলাইজেশনস’ তথা ‘সভ্যতার জোট’ গড়ে তোলার একটি উদ্যোগ এসেছে। যেখানে গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসনের মতো সভ্যতার প্রধান প্রধান সার্বজনীন মূল্যবোধগুলো রয়েছে আমাদের সামনে, সেখানে সভ্যতার দাবিদার কিছু সন্ত্রাসীর কাছে যেন হান্টিংটনের ‘ক্ল্যাশ অব সিভিলাইজেশন’ তত্ত্বই হয়েছে স্বার্থসিদ্ধির স্বঘোষিত মূল্যবোধ। স্বস্তির কথা, এদের সংখ্যা খুবই কম। এরা একদিন পরাজিত হবেই।