রাজনীতির চাটুকারিতা এবং মিথ্যাচার বৃত্তান্ত

63

বহু দিন পর আল বিরুনির ভারততত্ত্ব বইটি দ্বিতীয়বারের মতো পড়তে বসেছি। বইটি প্রথম যেবার পড়েছিলাম, তখন সম্ভবত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলাম। বইয়ের বিষয়বস্তু এবং লেখকের পাণ্ডিত্যের স্তর কল্পনা করার মতো ধীশক্তি না থাকার কারণে সেই বয়সে আমার পক্ষে ভারততত্ত্বের অন্তর্নিহিত সৌন্দর্য হৃদয়ঙ্গম করার সুযোগ হয়নি। পরবর্তী জীবনে আল বিরুনি সম্পর্কে যতই জেনেছি, ততই আমার মনে হয়েছে- ভারতবর্ষ সম্পর্কে তার লিখিত বইটি আমার পুনরায় অধ্যয়ন করা উচিত। কারণ, তার বইটি গতানুগতিক লেখকদের মতো নয়- আর তিনিও অন্য সাধারণ পণ্ডিত, পর্যটক বা ঐতিহাসিকের মতো নন। তার ধর্মবোধ, নীতি-নৈতিকতা, শিক্ষাদীক্ষা, পদ-পদবি, জ্ঞানবুদ্ধি এবং সর্বোপরি তার জীবৎকালের সময়ের সাথে তুলনা করে ইতিহাসে দ্বিতীয় কোনো আল বিরুনির সাক্ষাৎ মিলবে না।
আজকের নিবন্ধে আমি মহামতি আল বিরুনি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনায় যাবো না। তার ভারততত্ত্বের সুবিশাল প্রেক্ষাপট নিয়েও আলোচনা করা আমার সাধ্যের বাইরে। আমি কেবল তার সেই অমূল্য গ্রন্থের একদম শুরুর দিকের বক্তব্য অর্থাৎ প্রাক-কথন নিয়ে আলোচনার চেষ্টা করব। গ্রন্থের শুরুতেই তিনি মিথ্যাবাদীদের শ্রেণী বা প্রকারভেদ বর্ণনার পাশাপাশি কেন তারা মিথ্যা বলেন, সে ব্যাপারে আলোকপাত করেছেন। মধ্যযুগের বিস্ময়কর সফল রাষ্ট্রনায়ক গজনির সুলতান মাহমুদের রাজদরবারের অন্যতম সভাপণ্ডিত আল বিরুনির বহুমুখী প্রতিভা শাণিত হয়েছিল তৎকালীন দুনিয়ার সব নামকরা কবি, সাহিত্যিক, পণ্ডিত, বিজ্ঞানী, পর্যটক, যুদ্ধজয়ী বীর সেনাপতি, সমরবিদ এবং রাষ্ট্রচিন্তকদের একান্ত সান্নিধ্যের কারণে। মধ্য এশিয়া, ভারতবর্ষ, পারস্য ও আরব দুনিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চল ভ্রমণ, বিভিন্ন রাজদরবারের কর্মকাণ্ড একান্ত কাছে থেকে দেখা এবং মানুষের বিচিত্র জীবনপ্রণালী নিয়ে গবেষণা করতে গিয়ে আল বিরুনি অনুধাবন করতে পেরেছিলেন যে, মানবজীবনের বেশির ভাগ যেমন নিয়ন্ত্রিত হয় রাজনীতি দ্বারা, তেমনি রাজনীতি নিয়ন্ত্রিত হয় চাটুকারিতা ও মিথ্যাচার দ্বারা।
রাজনীতির মিথ্যাচার ও চাটুকারিতা সম্পর্কে মহামতি আল বিরুনি কী বলেছেন, তা আলোচনার আগে মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমার নিজস্ব মতামত সম্পর্কে দু-চারটি কথা বলে নিই। মিথ্যাচার ও চাটুকারিতা যেন একই গর্ভজাত দু’টি বিষবৃক্ষ। এগুলো সমহারে দেশ, জাতি ও ব্যক্তি মানুষের সর্বনাশ করে ছাড়ে। চাটুকারিতা ছাড়া মিথ্যা কখনো পূর্ণতা পায় না। আবার মিথ্যা কোনোকালে আকর্ষণীয় হয়ে উঠতে পারে না চাটুকারিতা ছাড়া। মানুষের প্রাত্যহিক জীবনে মিথ্যাচারের জন্য অনেক সময় হয়তো চাটুকারিতার দরকার পড়ে না। কিন্তু চাটুকারিতার জন্য সর্বদা এবং সব সময়ই মিথ্যাচারের দরকার পড়ে। চাটুকারিতাবিহীন মিথ্যাচার হলো কাগজের ফুলের মতো গন্ধহীন। সমাজ-সংসারের দৈনন্দিন স্বার্থ, প্রতারণা, ধোঁকাবাজি এবং সীমিত মাত্রার দুর্নীতির জন্য নির্জলা মিথ্যাচার ক্ষণিকের জন্য মিথ্যাবাদীর জন্য লাভজনক বিবেচিত হয়। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে বড় মাত্রার দুর্নীতি, অন্যায়ভাবে স্বার্থ হাসিল, লোক ঠকানো এবং বিশাল আকৃতির প্রতারণার ফাঁদকে অব্যর্থ করার জন্য মিথ্যাবাদীরা মিথ্যার সাথে অলঙ্কারস্বরূপ চাটুকারিতা যোগ করে নেয়।
মানবজীবনের ভয়ঙ্কর সব প্রতারণা, মিথ্যাচার, দুর্নীতি ইত্যাদি কুকর্মগুলো সব সময়ই রাজনৈতিক লোভ-লালসা ও প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তিসংক্রান্ত হয়ে থাকে। রাষ্ট্রক্ষমতা পরিচালনা করে লোক ঠকানোর জন্য যেমন মানুষ মিথ্যাচার করে, তেমনি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্যও কম মিথ্যাচার হয় না। তবে রাষ্ট্রক্ষমতা-সংক্রান্ত অর্থাৎ রাজনীতি-সংক্রান্ত মিথ্যাচারের দুটো মৌলিক বৈশিষ্ট্য রয়েছে। রাজনীতির প্রধান ব্যক্তি সাধারণত মিথ্যাচার করেন কোনো রকম রাখঢাক না রেখেই। তার মিথ্যাচারের সাথে কোনো চাটুকারিতার সংযোগ থাকে না। দাম্ভিকতা, অহংবোধ, অভ্যাসজাত কারণ এবং ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার জন্য রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যক্তিটি মিথ্যাচার করে থাকেন। এ ছাড়া অভ্যাসগত কারণ, জন্মগত ত্রুটি ও বংশের রক্তপ্রবাহে মিথ্যাচার-সংক্রান্ত আয়রোজগার ও অর্থবিত্তের সংযোগ থাকলে মানুষ মিথ্যা না বলে থাকতে পারে না।

রাষ্ট্রের প্রধান ব্যক্তি মিথ্যাবাদী হলে সাধারণ জনগণের জীবন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে। মিথ্যাবাদী শাসকের কাছে সত্যবাদিতা ও ন্যায়নিষ্ঠতা একধরনের গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য হয়। নীতিকথা, শুভকর্ম, সৌজন্য ইত্যাদি সুকুমারবৃত্তিগুলোকে মিথ্যাবাদী শাসকেরা যমের মতো ভয় করেন। মিথ্যা কথা বলতে বলতে এমন একটা সময় তাদের জীবনে চলে আসে, যখন এক ধরনের মানসিক বিকৃতি, চারিত্রিক ভ্রষ্টাচার এবং কুৎসিত মনোবৃত্তি তাদের অক্টোপাসের মতো বেঁধে ফেলে। তারা সব মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য, মানুষজনকে অপমান এবং খোঁটা না দিয়ে থাকতে পারেন না। হররোজ মিথ্যাচার, দাম্ভিকতা প্রদর্শন এবং জুলুম-অত্যাচার না করলে তাদের যেমন পেটের ভাত হজম হয় না, তেমনি তাদের নিদ্রা ও বিনোদন এবং বর্জ্য ত্যাগের জন্যও মিথ্যাচারের দরকার পড়ে। ফলে তারা বেঁচে থাকার জন্য নিজেদের চার পাশে মিথ্যাবাদী ও চাটুকারদের দুর্ভেদ্য এক দেয়াল গড়ে তোলেন এবং সেই দেয়ালের মধ্যখানে থেকে তারা মিথ্যাকে নিজেদের জন্য অপরিহার্য উপকরণ বানিয়ে ফেলেন। ফলে দেয়ালের বাইরে যে সত্যনিষ্ঠ দুনিয়া রয়েছে তা তারা ভুলে যান- অথবা সেই দুনিয়ার রূপ-রস-গন্ধ ও শব্দ অনুধাবনের জন্য তাদের ইন্দ্রীয়গুলো অনভূতিহীন ও অকেজো হয়ে পড়ে।
রাজনীতি-সংক্রান্ত মিথ্যাচারের উল্লেখিত বৈশিষ্ট্যের বাইরে দ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যটি হলো- মিথ্যাবাদী শাসককে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা প্রভাবশালী চাটুকারদের আধিক্য। পৃথিবীর সব রাজদরবার, রাজনীতি ও রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রগুলোতে কমবেশি চাটুকারেরা থাকেন। তবে উত্তম শাসকের কাছে চাটুকারেরা সাধারণত সুবিধা করতে পারেন না। তবে মন্দ, বোকা ও চরিত্রহীন শাসককে কেন্দ্র করে চাটুকারেরা খুব সহজেই তাদের অশুভ তৎপরতা চালাতে পারেন। অন্য দিকে, শাসক যদি মিথ্যাবাদী হন তবে তাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা চাটুকারেরা সর্বাধিক সুবিধা অর্জন করেন। তখন চাটুকারদের ভেতর থেকেই উজির-নাজির, আমির-ওমরাহ, সেনাপতি-কোতোয়াল, চৌকিদার-দ্বাররক্ষী, কাজী, দেওয়ান প্রভৃতি গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ লাভ করেন। চাটুকারেরা রাজার সাথে তাল মিলিয়ে এবং রাজার কণ্ঠে উচ্চারিত মিথ্যার ফুলঝুরির সাথে কাব্যরস মিশিয়ে পরস্পরের সাথে পাল্লা দিয়ে মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার এক যুগপৎ রসায়ন সৃষ্টি করে সারা দেশে হিরক রাজার রাজ্যের আদলে পরিবেশ ও প্রতিবেশ তৈরি করে ফেলেন।
সাধারণ চাটুকার এবং মিথ্যাবাদী শাসককেন্দ্রিক চাটুকারদের মধ্যে মৌলিক কতগুলো পার্থক্য রয়েছে। সাধারণ চাটুকারেরা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য চাটুকারিতার পথ অবলম্বন করেন এবং কাক্সিক্ষত সফলতা লাভের পর তারা সাধারণত সামাজিক জীবনে অনাসৃষ্টি করেন না। চাটুকারিতার দ্বারা অর্জিত ধনসম্পদ, পদ-পদবি এবং অন্যান্য সুবিধা তারা খুব সতর্কতার সাথে ব্যবহার করেন। কারণ তারা জানেন, সমাজ-সংসারের লোকজন তাদের ঘৃণা করে। সুতরাং তারা দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাত এড়ানোর জন্য প্রায়ই নিরিবিলি, নিভৃত এবং ক্ষেত্রবিশেষে জনবিচ্ছিন্ন জীবন যাপন করেন। সাধারণ চাটুকারেরা সাধারণত দম্ভ, জুলুম, অত্যাচার করতে সাহস পান না। অন্য দিকে, রাজনীতির চাটুকারেরা হয়ে থাকেন জুলুম-অত্যাচার, অনাচার-ব্যভিচার এবং অসভ্যতামির সর্বোচ্চ মূর্ত প্রতীক। তারা তাদের রাজার কৃতকর্মগুলো মস্তিষ্কে ধারণ করে সর্বদা সব কুকর্মে রাজাকে অতিক্রম করার অপচেষ্টায় প্রাণান্ত চেষ্টা করতে থাকেন।
রাজনীতির চাটুকারেরা যদি কোনো মিথ্যাবাদী রাজাকে নিজেদের কুমর্মের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে পেয়ে যান, তবে তারা সেটিকে এক পরম সৌভাগ্য বলে মনে করতে থাকেন। তখন চাটুকারেরা শত হস্তে, শত পদে এবং শত মুখে রাজার কুকর্মগুলোকে রাজ্যময় আবাদ করতে শুরু করে দেন। কুকর্মের বাহারি ব্যঞ্জনে আপ্যায়িত করে এক দিকে যেমন নিজেদের বংশ বৃদ্ধি করতে থাকেন, তেমনি মিথ্যাবাদী রাজাকে টানতে টানতে একেবারে জাহান্নামের সদর দরজায় নিয়ে জাহান্নামের রক্ষীদের কাছে হস্তান্তর না করা পর্যন্ত ক্ষান্ত হন না। রাজনীতির চাটুকারেরা কেবল মিথ্যাচার কিংবা চাটুকারিতার মধ্যে নিজেদের কুকর্ম সীমাবদ্ধ রাখেন না। তারা রাষ্ট্রশক্তির সব হাতিয়ার, সুযোগ-সুবিধা এবং সুনাম-সুখ্যাতি ব্যবহার করে অন্তহীনভাবে জুলুম-অত্যাচার, খুন-জখম, চুরি-ডাকাতি-রাহাজানি করতে থাকেন। তারা নিজেদের মধ্যকার পাশবিক সত্তাকে বের করে আনেন এবং সেই পাশবিক শক্তির ওপর সওয়ার হয়ে পুরো জমিনে তাণ্ডব চালাতে থাকেন। তারা কেবল মিথ্যাবাদী রাজার স্বার্থ দেখেন- রাজাকে ভয় করেন এবং তাকে খুশি করার জন্য চাটুকারিতার নিত্যনতুন মহাকাব্য রচনা করেন।
মিথ্যাবাদী শাসক এমনিতেই নিজের কুকর্মের কারণে অন্ধ, বধির ও পক্ষাঘাতগ্রস্ত প্রাণীদের মতো নির্জীব হয়ে পড়েন। ফলে চাটুকারদের তাণ্ডব, ছলচাতুরী, জুলুম-অত্যাচার এবং শয়তানি ফন্দি-ফিকির ছাড়া মিথ্যাবাদী শাসকদের কোনো গত্যন্তর থাকে না। বাইরের দুনিয়ার মানুষ মিথ্যাবাদী শাসককে যতই শক্তিশালী ভাবুক না কেন- তিনি আসলে চাটুকারদের হাতের পুতুল ছাড়া অন্য কিছু নন। রাজ্য-রাজা-রাজনীতিকেন্দ্রিক মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার উল্লেখিত বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি এবং এসব জানার জন্য খুব বেশি পাণ্ডিত্য অথবা গবেষণার দরকার নেই। কাজেই আল বিরুনির মতো যুগশ্রেষ্ঠ মহামানব তার অমূল্য গ্রন্থ ভারততত্ত্বে রাজনীতি, মিথ্যাচার ও চাটুকারিতার সাধারণ মিথগুলো নিয়ে আলোচনা করেননি। তিনি মিথ্যার বেসাতি ও কারণ সম্পর্কে এমন মৌলিক কিছু বিষয়ের অবতারণা করেছেন- যা ৯০০ বছর আগে রচিত হওয়া সত্ত্বেও আজো মানুষের চিন্তার খোরাক জোগাচ্ছে।
আল বিরুনি তার ভারততত্ত্ব গ্রন্থে মিথ্যাচারের জন্য পারস্পরিক সোহবত অর্থাৎ মিথ্যাবাদীদের মধ্যকার ঐক্য, সম্প্রীতি ও মেলামেশাকে দায়ী করেছেন। তার মতে, মিথ্যাবাদীরা যদি ভালো মানুষের সঙ্গ পেত, তাহলে তাদের মিথ্যা বলার প্রবণতা কমে যেত। তিনি জনশ্রুতিকেও মিথ্যাচারের অন্যতম কারণ বলে উল্লেখ করেছেন। লোকমুখে শোনা কথা প্রচার হতে হতে একসময় কিছু কিছু জনশ্রুতি ভয়ঙ্কর গুজবে পরিণত হয়। কাজেই কোনো মানুষ যদি মিথ্যাকে পরিহার করতে চায়, তবে তার উচিত কোনো ঘটনা সম্পর্কে সাক্ষ্য দেয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ঘটনা প্রত্যক্ষভাবে দর্শন করা। আল বিরুনির মতে, সংবাদদাতাদের চরিত্র, বুদ্ধিশুদ্ধি, বিচার-বিবেচনার ওপরও অনেক কিছু নির্ভর করে। অর্থাৎ প্রত্যক্ষদর্শী হওয়া সত্ত্বেও অনেকে অনেক ঘটনা নির্ভুলভাবে বর্ণনা করতে পারেন না অথবা করেন না। ব্যক্তিগত বোধবুদ্ধির অভাব অথবা ব্যক্তিগত রাগ-ক্ষোভ, লোভ-লালসা বা স্বার্থে প্ররোচিত হয়ে অনেক সংবাদদাতা মিথ্যা কথা প্রচার করে থাকেন। কাজেই কোনো প্রত্যক্ষদর্শীর বক্তব্য বিশ্বাস করার আগে সংশ্লিষ্ট লোকটির স্বভাব-চরিত্র, স্থান-কাল-পাত্র ইত্যাদি বিবেচনা করেই তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা উচিত এবং সেই সাক্ষ্যকে নিজের বক্তব্য বলে প্রচার করার ব্যাপারে সতর্ক থাকা একান্ত অবশ্যক।
আল বিরুনির মতে, কিছু মানুষ রয়েছে যারা মিথ্যাচার করে কেবল সমাজে হানাহানি ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য। নিজের অন্তরের লুকায়িত ক্ষোভ-বিক্ষোভ, হিংসা-বিদ্বেষ প্রভৃতির কারণেও মানুষ মিথ্যাচার করে। অনেকে নিজেকে বড় করার জন্য এবং অন্যকে ছোট করার জন্য অনবরত মিথ্যা বলে থাকেন। কিছু মানুষ রয়েছে, যারা হাতিয়ার দিয়ে আঘাত করে তার প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করার ক্ষমতা রাখে না। তখন তারা প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা রটনা প্রচার করে নিজেদের জিঘাংসামূলক মনোবৃত্তি চরিতার্থ করার অপচেষ্টা চালায়। চাটুকারদের সম্পর্কে ইঙ্গিত করতে গিয়ে আল বিরুনি বলেন- তারা ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির জন্য কারো মিথ্যা গুণগান আরম্ভ করে অথবা কাউকে খুশি করার জন্য ব্যক্তি বা শ্রেণী-বিশেষের বিরুদ্ধে মিথ্যা রচনা, বদনামিমূলক রটনা এবং অসম্মানজনক কুৎসা আরোপ করে প্রচার-প্রপাগান্ডা শুরু করে। চাটুকারদের এহেন তৎপরতা সব সময়ই ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধির অভিলাষ দ্বারা প্রভাবিত থাকে। অবাঞ্ছনীয় অর্থলিপ্সা, হিংসাদ্বেষ এবং পদ-পদবি লাভের লালসা দ্বারা প্রলুব্ধ হয়ে চাটুকারেরা এসব কর্ম করে থাকেন।
আল বিরুনি আরো বলেন, মিথ্যাবাদীরা বংশগত শত্রুতার কারণে তাদের প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে মিথ্যা বলেন। তারা যদি কারো দ্বারা উপকৃত হন তখন সেই উপকারীর তাঁবেদার হিসেবেও তারা মিথ্যাচার শুরু করেন। অতীতের অপ্রিয় ঘটনা, ব্যক্তিগত শত্রুতা, হিংসা বা ঈর্ষার কারণেও মিথ্যাচার হয়ে থাকে। তবে যারা স্বভাবজাতভাবে নিচু প্রকৃতির, তাদের মিথ্যাচারই সব সময় জঘন্যতম হয়ে থাকে, যা কিনা প্রায়ই ভয়াবহ পরিণতি বয়ে আনে। কিছু মিথ্যাবাদী অবশ্য মিথ্যাকে নিজেদের অলঙ্কার, বেশভূষা ও বেঁচে থাকার অবলম্বন বানিয়ে নেয়। এ শ্রেণীর লোকদের অস্থিমজ্জার সাথে মিথ্যা মিশে যায়। তারা মিথ্যা ছাড়া থাকতে পারেন না। নিজেদের চারিত্রিক নিকৃষ্টতা এবং অন্তরাত্মার ভ্রষ্টতার কারণে তারা মিথ্যার দাস হয়ে যান। কিছু মানুষ অবশ্য অজ্ঞতাবশত মিথ্যা কথা বলে। একশ্রেণীর লোকের একাংশ আবার সেসব লোকের অন্ধ অনুসরণ করে, যারা তাদের মিথ্যা বলা শিখিয়েছে অথবা মিথ্যা তথ্য দিয়ে প্রভাবিত করেছে।

লেখক : সাবেক সংসদ সদস্য