সুনামগঞ্জে রোহিঙ্গা নারীকে জন্ম সনদ দিয়েছে পৌরসভা!

855

সুনামগঞ্জে রোহিঙ্গাদের স্থানীয় বাসিন্দা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে জন্ম সনদ প্রদান করেছে সুনামগঞ্জ পৌরসভা। আর এই জন্ম সনদ নিয়ে রোহিঙ্গা নারীরা বাংলাদেশি নাগরিক পরিচয়ে স্থানীয়দের সহায়তায় পাসপোর্ট তৈরির চেষ্টা করেছে।

জানা গেছে, গত ৪ এপ্রিল পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত জন্ম সনদ নিয়ে সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসে যান মোছা. রিয়া আক্তার (ছদ্মনাম) এক রোহিঙ্গা নারী। এ সময় পাসপোর্টের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইকারী কর্মকর্তা ঐ নারীর সাথে কথা বললে তার কথা অসঙ্গতিপূর্ণ মনে হওয়ায় কর্মকর্তার সন্দেহ জাগে। পরে তাকে ব্যাপকভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেই সাথে বাংলায় পিতা ও মাতার নাম লিখতে বলা হয়। ওই নারী নামগুলো কাগজে সঠিকভাবে লিখেন। তারপরও পাসপোর্ট অফিসের কর্মকর্তাদের কাছে মোছা. রিয়া আক্তারের কথাবার্তা অসামঞ্জস্যপূর্ণ মনে হয়। পরে কর্মকর্তারা জানতে পারেন তার আসল না রিয়াজুল জান্নাত।

এরপর রিয়াজুলের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তার ভাই আব্দুল হালিমকে আটক করে পুলিশ। আটক হালিম সুনামগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলতে পারেনি। তাতে সন্দেহ আরও প্রকট হয়। পরে সুনামগঞ্জ পৌরসভা কর্তৃক প্রদত্ত জন্মসনদ ভূয়া না সঠিক তা যাচাইয়ের জন্য পৌরসভার সার্ভারে অনলাইনে যাচাই-বাছাই করা হয়। সেখানে দেখা যায় যে জন্ম সনদটি ঠিক আছে এবং অনলাইনে তা সঠিকভাবে দেখাচ্ছে।

আরও জানা গেছে, রিয়াজুল জান্নাতের পাসপোর্ট ফরম আইনি বৈধতার জন্য নাম এফিডেফিট করে দেন অ্যাডভোকেট কাওসার আলী। তিনিই আবার ওই ফরমটি তার ব্যবহৃত সিল দিয়ে সত্যায়ন করে দেন এবং তাকে দুই বছর যাবৎ চিনেন এই মর্মে প্রত্যয়নও করেন।

পরে পুলিশ তদন্তের স্বার্থে মোছা. রিয়া বেগম নামধারী নারীকে আটক করে থানায় নিয়ে যায়। আটকের পর যাচাই-বাছাই শেষে তার ভাইসহ তাকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পুশ ব্যাক করা হয়। ওই সূত্র ধরে পুলিশ এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট আরও চারজন দালালকে আটক করে। আটককৃতরা হলেন- ফরহাদ আহমদ (৩৬), জসিম উদ্দিন (২৪), নূর হোসেন (২৩) ও আমির উদ্দিন (২২)। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ বাদী হয়ে মামলা দায়ের করেছে।

সুনামগঞ্জ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-তদন্ত) আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘মামলাটি তদন্তাধীন রয়েছে। আমরা দালাল চক্রকে ধরতে অভিযান অব্যাহত রাখব।’

সুনামগঞ্জ আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক অজুর্ন কুমার ঘোষ বলেন, ‘বিগত কয়েকদিন আগে মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ আসে যে পাসপোর্ট যারা করতে আসবে তাদের তথ্য যেন কয়েকবার যাচাই করা হয় এবং যে লোক পাসপোর্ট নেবে তার সাথে যেন কথা বলি। সুনামগঞ্জে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৭০টি পাসপোর্ট হয়। এই কারণে আমরা সময় নিয়ে কথা বলতে পারি। ওই নারীর সকল কাগজপত্র বৈধ ছিল, কিন্তু কথাবার্তা সন্দেহজনক ছিল। পরে আমরা পুলিশকে খবর দেই।’

এ ব্যাপারে সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখতের কাছে মোবাইলের মাধ্যমে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘আমি অনেক সময় কাজে ঢাকায় গেলে ভারপ্রাপ্ত মেয়র দায়িত্বে থাকেন। এ রকম জন্ম সনদ দেয়ার কথা না। আমার ঠিক মনে পড়ছে না। আমরা ছবি দেখে তারপর যাচাই করে দেই। কেউ যদি পৌর এলাকায় বেশিদিন বসবাস করেন, তাহলে যাচাইপূর্ব সনদ দেয়া হয়। কিন্তু এটা আমার মনে পড়ছে না।’ এরপর তিনি ব্যস্ত আছেন বলে কল কেটে দেন।’

সুনামগঞ্জ স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক মো. এমরান হোসেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি তদন্ত করে দেখব। যদি অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে আইনগতভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

মোছা. রিয়া আক্তার নামের জন্ম সনদে যে সকল তথ্য দেয়া হয়েছে তা হলো- নিবন্ধন বহি নং- ২৮, নিবন্ধনের তারিখ- ০২/০৪/২০১৯, সনদ ইস্যুর তারিখ- ০২/০৪/২০১৯, জন্ম নিবন্ধন নম্বর- ১৯৯৭৯০২৬০০১০৮২৬৫২। নাম- মোছা. রিয়া আক্তার, জন্ম তারিখ- ০৫-০৩-১৯৯৭। লিঙ্গ- নারী, জন্মস্থান- সুনামগঞ্জ, পিতার নাম- মো.আজিম আলী, জাতীয়তা- বাংলাদেশি। মাতার নাম- মোছা. মরিয়ম খাতুন, জাতীয়তা- বাংলাদেশি। স্থায়ী ঠিকানা- গ্রাম: সুজাতপুর, থানা ও উপজেলা: জামালগঞ্জ, জেলা: সুনামগঞ্জ। বর্তমান ঠিকানা- আলীপাড়া, সুনামগঞ্জ।

আলীপাড়া এলাকা হলো পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের অধীনে। সেখানে বর্তমান কাউন্সিলর হিসেবে রয়েছেন হোসেন আহমদ রাসেল। নিয়ম অনুযায়ী যে কোনো এলাকা থেকে পৌরসভা কর্তৃক সনদ নিতে হলে ওই এলাকার কাউন্সিলরের সুপারিশ নিতে হয়। তাই এক্ষেত্রে দায় কিছুটা পৌর কাউন্সিলরেরও থেকে যায়। বিজ্ঞপতি:-