সাত বছরেও হদিস মিলেনি ইলিয়াস আলীর

9

নিজস্ব প্রতিবেদক:
ঢাকা থেকে রহস্যজনকভাবে নিঁখোজ হয়ে যাওয়ার সাত বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যাবদি খোঁজ মিলেনি বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীর। নিখোঁজের পর প্রথমদিকে ইলিয়াস আলীর সন্ধান দাবিতে আন্দোলন ও পুলিশের অভিযানের তোড়জোড় থাকলেও ধীরে ধীরে তা স্থিমিত হয়ে এসেছে। ফলে আদৌ বিএনপির সাবেক এই সাংগঠনিক সম্পাদকের কোনো হদিস মিলবে কী না এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর রূপসী বাংলা হোটেলে আড্ডা শেষে বনানীর বাসায় ফিরছিলেন সিলেট জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি ও সিলেট-২ আসনের সাবেক সাংসদ ইলিয়াস আলী। পথে মহাখালী সাউথ পয়েন্ট স্কুলের সামনে থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ নিখোঁজ হন তিনি। ঘটনাস্থল থেকে পুলিশ তার ব্যবহৃত গাড়িটি উদ্ধার করে পরিত্যক্ত অবস্থায়। তবে ইলিয়াসের কোনো সন্ধান মিলেনি আজ পর্যন্ত।

তাকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে তিনদিনব্যাপী কর্মসূচী ঘোষণা করেছে সিলেট জেলা বিএনপি। এছাড়া মঙ্গলবারও একই দাবিতে নগরীতে মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।

বাংলাদেশের রাজনীতিতে ইলিয়াস আলী এক আলোচিত-সমালোচিত নাম। সাংগঠনিক দক্ষতার মাধ্যমে সিলেট বিভাগে বিএনপি চাঙ্গা করায় দলে আলোচিত ছিলেন জেলা বিএনপির সাবেক এই সভাপতি আবার সন্ত্রাসী কর্মকান্ডের কারণে সমালোচিতও ছিলেন সাবেক এই সাংসদ। রাজনৈতিক জীবনের মতো তাঁর অন্তর্ধানও আলোচনা-সমালোচনাময়।

বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, ইলিয়াস আলীকে সরকার গুম করেছে। ইলিয়াস আলীকে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছে দলটি। নিখোঁজ হওয়ার পর ইলিয়াস আলীকে ফিরে পাওয়ার দাবিতে সিলেটে বিএনপি ব্যাপক বিক্ষোভ করলেও ধীরে ধীরে ম্রিয়মান হয়ে এসেছে।

এদিকে, সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে প্রথমদিকে ইলিয়াসকে উদ্ধারের জোর চেষ্টা চালানো হচ্ছে বলে দাবি করা হলেও দীর্ঘ ৭ বছরেও তার কোনো সন্ধান দিতে পারেনি তারা। থেমে গেছে ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারে প্রশাসনের তৎপরতাও।

ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদীর লুনা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপ-রেজিস্ট্রার। তিনি জানান, অপেক্ষার অনিশ্চয়তা নিয়েই দিন কাটাচ্ছেন তারা। ইলিয়াস আলীর ব্যাপারে নতুন কোনো তথ্য নেই। নিখোঁজের পর পুলিশ তো মামলা নেয়নি। বনানী থানায় একটি জিডি করেছিলেন। সে জিডির ভিত্তিতে তেমন কোনো অনুসন্ধান চালানো হয়নি। এখনো জানি না পুলিশের অগ্রগতি কী? হাইকোর্টে রিট দায়েরের পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উদ্ধার তৎপরতা সম্পর্কে জানাতে একটি নির্দেশ দিয়েছিল উচ্চ আদালত। সে নির্দেশ আর রক্ষা করেনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। এক সময় নানা গুঞ্জন-গুজব শোনা যেত। এখন সেসবও বন্ধ হয়ে গেছে। তবুও আমি শেষদিন পর্যন্ত বিশ্বাস রাখতে চাই ইলিয়াস একদিন ফিরে আসবে। তার এলাকার মানুষও এটাই বিশ্বাস করে।

লুনা জানান, ইলিয়াস আলীকে উদ্ধারের দাবিতে সিলেটের লোকজন রাস্তায় নেমে এসে প্রাণবিসর্জন দিতেও দ্বিধা করেনি। এ ঘটনায় উল্টো বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীসহ অন্তত ১২ হাজার এলাকাবাসীর বিরুদ্ধে বিশ্বনাথ ও ওসমানীনগর থানায় দায়ের করা হয়েছিল ৪টি মামলা। সেগুলো এখন বিচারাধীন। ইলিয়াস আলী ফিরে না এলেও মামলার ঘানি টানছেন সিলেটের হাজার হাজার মানুষ।

২০০১ সালে সিলেট-২ আসন থেকে দলের টিকিটে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন ইলিয়াস আলী। তার অবর্তমানে গত একাদশ সংসদ নির্বাচনে তার স্ত্রী তাহসিনা রুশদির লুনা বিএনপি থেকে মনোনয়নপত্র জমা দিলেও তা বাতিল হয়ে যায়। এরপর আসনটিতে গণফোরামের প্রার্থী মোকাব্বির খানকে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট জাতীয় ঐক্যফ্রন্ট সমর্থন দিলে বিপুল ভোটে তিনি নির্বাচিত হন। তবে জোটের নিষেধ সত্ত্বেও শপথ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনার শিকার হন মুকাব্বির খান।

এদিকে, নিখোঁজ’ বিএনপি নেতা এম ইলিয়াস আলীকে ফিরে পেতে তিন দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে সিলেট জেলা বিএনপি।

ঘোষিত কর্মসূচি অনুযায়ী আজ ১৭ এপ্রিল বাদ আসর হজরত শাহজালাল (রহ.) দরগাহ মসজিদে মিলাদ ও দোয়া মাহফিল এবং ১৮ এপ্রিল দুপুর ১২টায় সিলেট জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে সরকার বরাবর ইলিয়াস আলীসহ গুম হওয়া নেতাকর্মীদের ফেরত পাওয়ার দাবিতে স্মারকলিপি দেয়া হবে। এ ছাড়া আগামী ২৯ এপ্রিল বিকাল ৩টায় নগরীর মিরের ময়দানে লা-রোজ হোটেলের কনফারেন্স হলে ‘গুমের অপরাজনীতি ও বর্তমান বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হবে।

আলোচনাসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সাবেক মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীসহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতারা।

তিন দিনব্যাপী এ কর্মসূচিতে বিএনপি এবং অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের সব নেতাকর্মীকে যথাসময়ে উপস্থিত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সিলেট জেলা বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবদুল কাহির চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক আলী।

এদিকে, আজ বুধবার রাজধানীর ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সকাল ১০টায় প্রতিবাদ সভা করবে বিএনপি। এই সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকার কথা রয়েছে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের।