ভূমিখেকো শাকুর-ডালিম চক্রের কান্ড : কেয়ারটেকারের ঘরকে দাবি করছে মসজিদ

33

স্টাফ রিপোর্টার
ধর্মীয় বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে শহরতলির বাইপাসে ভূমি দখল করতে ভূমিখেকো চক্র চৌকিদারের বসতঘরকে মসজিদের রূপ দিয়ে সাইনবোর্ড টানিয়েছে। বিভিন্নভাবে জবরদখল করার উদ্দ্যেশ্যে সিলেটের আলোচিত ভূমিখেকো কানাইঘাটের শাকুর সিদ্দিকী, জৈন্তাপুরের মুজিবুর রহমান ডালিম চক্র তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। মানববসতিবিহীন হাওর সংলগ্ন এলাকায় মা খাদিজা জামে মসজিদ নামে সাইনবোর্ড টানিয়ে তারা ভূমির মালিক ও তার লোকজনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা করে হয়রানি করছে। ভূমিখেকো চক্রের মামলায় আসামি করা হয়েছে চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক থেকে শুরু করে ভূমির কেয়ারটেকারদেরও।

সরেজমিনে জানা গেছে, বছরখানেক আগেও সিলেট শহর বাইপাস নামে পরিচিত এলাকায় রাস্তার পশ্চিম দিকে মা খাদিজা জামে মসজিদসহ বিভিন্ন সাইনবোর্ড টানিয়ে ভূমি দখলের পাঁয়তারা করে শাকুর-ডালিম চক্র। হঠাৎ করে গত এপ্রিল মাসে শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম চক্র রাস্তার পূর্বপাশের একটি ভূমিতে সাইনবোর্ড টানিয়ে দখলে নেয়। তারা ভূমির কেয়ারটেকারকে উচ্ছেদ করে কেয়ারটেকারের বসতঘরে মসজিদের মিম্বর ও ছাদে মাইক লাগিয়ে মা খাদিজা জামে মসজিদ নামে প্রচার শুরু করে। পরবর্তীতে দখল করা এ ভূমিকে মসজিদের ভূমি বলে প্রচার করে অবৈধ ফায়দা হাসিলের চেষ্টা করতে থাকে।

অবৈধ ভূমি দখলকে পাকাপোক্ত করতে গত ৮ এপ্রিল তারিখ মামলা করে ভূমিখেকো শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম চক্রের সদস্য খাদিমনগর পীরেরবাজার চৌধুরীপাড়ার আহমদ আলীর ছেলে আবদুল মান্নান। এ মামলায় চিকিৎসক, রাজনীতিবিদ, চাকরিজীবী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে আসামি করা হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, শহরতলিতে নানা কারণেই আলোচিত শাকুর সিদ্দিকী ও ডালিম। তাদের শেল্টারদাতা সমাজসেবী নামধারী একশ্রেণির টাউট বাটপার ও কথিত রাজনীতিবিদরা। ওই চক্রের কাজ হচ্ছে ভূমিদখল, মামলা, হামলা ও থানার দালালি করা। তাদের অর্থজোগানদাতা বিতর্কিত শাকুর সিদ্দিকী। মানুষকে হয়রানি করে ভূমিদখল করার পাশাপাশি সন্ত্রাসী কর্মকান্ড করে মানুষের কাছ থেকে অবৈধ টাকা আয় করাই যেন তাদের পেশা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মা খাদিজা মসজিদ নামে যে ভূমি দখল করার চেষ্টা চলছে, সেই ভূমিটির বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নেই। ১৯৭৪ সালে কয়েকজন ব্যক্তি ভূমিটি বন্দোবস্ত পান। শামসুদ্দিন নামক জনৈক বন্দোবস্ত গ্রহীতাদের কাছ থেকে কৌশলে স্বল্পমূল্যে ভূমিটি ক্রয় করেন। স্থানীয় ভূমিহীন কয়েকজন কৃষক শর্তভঙ্গ করে ভূমিটি বিক্রয় করায় জেলা প্রশাসক বরাবরে বন্দোবস্ত বাতিলের মামলা করেন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক কার্যালয়ে স্মারক নম্বর এসএ/১সি/১২২/৮৫/১৭৩(৪) নম্বরে অফিসের নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, মৌজা বহর জে এল নং-৭০ খতিয়ানে লিখিত এলএস কেইস (বন্দোবস্ত মামলা ২৭৫/১৬৩৩, ২৭৪/১৮৩৪, ২৭১/১৮৩২, ২৭৩/১৮৩৫, ২৩৬/৯১৭) নম্বরে ব্যক্তিবর্গের নামে বরাদ্দকৃত ভূমি শর্ত লঙ্ঘন করায় ১৯৮৫ সালের ১২ মে তাদের বন্দোবস্ত বাতিল করা হয়।

তাই বহর মৌজায় শামসুদ্দিনের নামে কোনো ভূমি নেই। এমনকি সহকারী কমিশনার ভূমি শামসুদ্দিনের নামে বহর মৌজায় কোনো ভূমির রেকর্ড পাওয়া যায়নি। এদিকে যে স্থানে মা খাদিজা জামে মসজিদ করা হচ্ছে, সেই ভূমির প্রকৃত মালিক নগরীর রায়নগরের বাসিন্দা ও সবুজ সিলেটের সম্পাদক মুজিবুর রহমান। তিনি ২০০৬ সালে তার কেয়ারটেকার থাকার জন্য একটি ঘর নির্মাণ করে দেন। ২০১৮ সালে সম্পাদক মুজিবুর রহমান বিদেশে অসুস্থ থাকাকালে ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে তা দখলে নেয় শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম চক্র। তারা প্রথমে সিদ্দিকনগর আবাসিক এলাকা নামে সাইনবোর্ড টানায়।
২০১৯ সালে মুজিবুর রহমান দেশে ফিরে সিলেটের সিনিয়র সহকারী জজ সদর আদালতে স্বত্ব মামলা (নম্বর-৬৫/২০১৯) করেন। মামলায় আসামি করা হয়েছে বিয়ানীবাজারের দেউলগ্রামের মৃত আকলু মিয়ার ছেলে মো. শামসুদ্দিন আহমদ, খাদিমপাড়ার ১০৫২ ইসলামপুর কলোনির মৃত জোয়াদ উল্লাহর ছেলে মো. আরজু মিয়া, জৈন্তাপুরের দরবস্ত রণীফৌদ গ্রামের মো. ফজলুর রহমানের ছেলে মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান ওরফে ডালিম, খাদিমনগর বাহুবল আবাসিক এলাকার মৃত আজির উদ্দিন ওরফে শওকত আলী চৌধুরীর ছেলে এম এ শাকুর সিদ্দিকীকে।

এদিকে মামলার খবর পেয়ে শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম গং রাতারাতি রাস্তার পশ্চিম পাশ থেকে রাস্তার পূর্বপাশে বর্ণিত ভূমিতে মা খাদিজা মসজিদের সাইনবোর্ড টানিয়ে কেয়ারটেকারের ঘরকে মসজিদ হিসেবে আখ্যা দেয়।
স্থানীয়রা জানান, হঠাৎ করেই ভূমিখেকোরা কেয়ারটেকারের বসতঘরকে মসজিদ বানিয়ে ফেলার চেষ্টা করছে। অথচ এ এলাকায় কোনো বসতিই নেই। ভূমিখেকোরা জায়গা দখলের জন্য মসজিদের সাইনবোর্ড ব্যবহার করছে।

এ ব্যাপারে সবুজ সিলেট সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, ২০০৬ সালে আমার কেয়ারটেকার থাকার জন্য মাটি ভরাট করে এ ঘরটি বানিয়েছিলাম। ভূমিদখলের জন্য ধর্মব্যবসায়ীরাই যে-কোনো ঘরকে মসজিদ দাবি করতে পারে, আর জালিয়াত শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম চক্র জালিয়াতির মাধ্যমে অন্যের ভূমি দখলের পাঁয়তারা করছে। তিনি আরো বলেন, সম্প্রতি এই জালিয়াত চক্রের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন তিনি। শামসুদ্দিন জাল কাগজপত্র দিয়ে দানপত্র দলিল করেছে।

তিনি বলেন, আমি ২০১৮ সালে অসুস্থ থাকাকালে শাকুর সিদ্দিকী-ডালিম চক্র স্থানীয় টাউট বাটপারদের নিয়ে ভুয়া দানপত্র দলিল করছে শামসুদ্দিনের কাছ থেকে। অথচ শামসুদ্দিনের সাথে তাদের কোনো ধরনের রক্তের সম্পর্ক নেই। শামসুদ্দিন লিজডিড বাতিল হওয়ায় সাফ কবালা না হওয়ায় প্রতারণার মাধ্যমে তারা দানপত্র দলিল সম্পাদন করে। আমার জমি আত্মসাতের চেষ্টা করছে। বাইপাস রাস্তার পূর্ব ও পশ্চিমে ৯ কোটি টাকা মূল্যেল ৯ একর ভূমি আত্মসাতের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে এ চক্রটি।

সম্পাদক মুজিবুর রহমান আরো বলেন, শামসুদ্দিনের বাতিলকৃত ভূমি রাস্তার পশ্চিম পাশে ৪৫৩৭ দাগের সন্নিকটে গ্রামের কাছাকাছি। রাস্তার সাথে কোনো ভূমি না। শাকুর-ডালিম চক্র ভূমির চৌহদ্দা পরিবর্তন করে সাবেক ৪৫৬৫ দাগের বর্তমান ৯০৪৮ ও ৯১২০ দাগের ৯ একর জমি জাল দলিলে রেজিস্ট্রি করে। রাস্তার পূর্বপাশে ৯১২০ দাগে মাত্র দেড় শতক ভূমির উপর নির্মিত চৌকিদার বসবাসের ঘরকে মসজিদের আকৃতি দিয়ে সাইনবোর্ড লাগিয়ে রাস্তার পশ্চিমে ৭ একর ও পূর্বে ২ একর সর্বমোট ৯ একর ভূমি আত্মসাত করার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, শামসুদ্দিন ২০১১ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ৩২৫৯/১১ দলিলে আমার সাথে চুক্তি করে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেন। ২০১৪ সালের ৮ এপ্রিল একতরফাভাবে মুজিবুর রহমানের ৩২৫৯/১১ আমমোক্তার বাতিলনামা সম্পাদন করে পরবর্তীতে আরেকজনের নামের পাওয়ার দেয়। পরে কৌশলে বাতিল দেখায়। এদিকে পাওয়ার বাতিল না করে ডালিম ৮০ শতক ও শাকুরের নামে ৮.২০ একর জাল দানপত্র দলিল করে। তারা চৌকিদারের ঘরকে মসজিদ আখ্যা দিয়ে বেআইনি ধর্মীয় অনুভূতি নিয়ে উস্কানি দিচ্ছে। এ চক্রকে সামাজিকভাবে সামাজিকভাবে বয়কটের পাশাপাশি তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে প্রশাসনের প্রতি আহবান জানান তিনি।

এ ব্যাপারে বিজ্ঞ মুফতিদের ফতোয়া হলো, ‘কারো মালিকানাধীন জমিতে জোরপূর্বক মসজিদ নির্মাণ করা জায়েজ নয়। মসজিদ নির্মাণ করতে হলে নির্ভেজাল জমি মসজিদের নামে ওয়াক্ফ হওয়া জরুরি। ওয়াক্ফবিহীন জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হলে সেটা শরিয়তমতে মসজিদ হবে না। যদি কোনো জমির মালিক তাঁর জমি ওয়াক্ফ করতে রাজি না হন এবং জোরপূর্বক তাঁর জমিতে মসজিদ নির্মাণ করা হয়, তাহলে ওই মসজিদ ভেঙে জমি তার মালিককে ফেরত দিতে হবে। কোনো জমিতে মালিকের অনুমতি নিয়ে মসজিদ নির্মাণ করা হলে তাতে নামাজ পড়া জায়েজ হবে। অনুমতি ছাড়া মসজিদ নির্মাণ করা হলে তাতে নামাজ পড়া মাকরুহ হবে। ‘(ফাতওয়া হিন্দিয়া, খন্ড ২, পৃষ্ঠা ৩৪৮; রদ্দুল মুহতার, খন্ড ৪, পৃষ্ঠা ৩৯০; আদদুররুল মুখতার, খন্ড ১, পৃষ্ঠা ৩৮১)।