ঐতিহ্যের বলিষ্ঠ নিদর্শন বিলীনের পথে মণিপুরি রাজাগম্ভীর সিংয়ের রাজবাড়ি

10

সবুজ সিলেট ডেস্ক
নগরীর মির্জাজাঙ্গালে অবস্থিত মণিপুরি রাজবাড়ি। ঊনবিংশ শতাব্দীতে তৎকালীন মণিপুরি রাজ্যের তিন সহোদর রাজা চৌর্জিৎ সিং, মার্জিত সিং ও গম্ভীর সিং রাজবাড়িটি তৈরি করেন। এরপর কালের বিবর্তনে বিলীন হওয়ার পথে মণিপুরি রাজবাড়ি। অথচ মির্জাজাঙ্গালে অবস্থিত মণিপুরি রাজবাড়ি প্রাচীন স্থাপত্যকীর্তির অন্যতম নিদর্শন। এ ভবনের নির্মাণশৈলী সিলেট অঞ্চলের কৃষ্টি-সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ। এই ভবনটি ঐতিহ্যের একটি বলিষ্ঠ নিদর্শন।
এককালের প্রভাবশালী রাজা গম্ভীর সিং এর স্মৃতিধন্য এ বাড়িটি আজ অবহেলিত ও বিলীনপ্রায়। বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রকৃত ভবন হারিয়েছে তার স্বকীয়তা। বাড়ির সুপ্রাচীন প্রধান ফটক, সীমানা দেয়াল, মনোহর কারুকাজের সিড়ি ও বালাখানার ধ্বংসাবশেষই বর্তমান মণিপুরি রাজবাড়ির স্মৃতি সম্বল। রাজা কর্তৃক নির্মিত প্রাসাদের তিন চতুর্থাংশের কোনো অস্তিত্ব নেই। উপরন্তু রাজবাড়ির সামনে অপরিকল্পিতভাবে মন্দির নির্মাণ করে রাজবাড়ির পুরাকীর্তি ঢেকে রাখা হয়েছে।
এছাড়া বাড়িটির ভেতরে এখন অবহেলিত অবস্থায় একটি ঘর রয়েছে। যা কালের সাক্ষী হয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। এবং এই ঘরের সামনে একটি সাইনবোর্ড টানানো রয়েছে। সেখানে লেখা রয়েছে-‘মহারাজা গম্ভীর সিংহ (১৮১৯-১৮২৬) এর স্মৃতি বিজরিত ধ্বংসাবশেষ সমূহ স্বেচ্ছাশ্রমের মাধ্যমে সংস্কারকরণ- ভারতের মণিপুরি রাজ্যের ইম্ফাল থেকে আগত স্বনামধন্য মুতুয়া মিউজিয়াম কর্তৃপক্ষ, সংস্কার কাল- জানুয়ারি-২০১২ খ্রীষ্টাব্দ’।
এছাড়া আর কোথাও রাজা গম্ভীর সিংয়ের স্মৃতি নেই। বর্তমানে মণিপুরি ঠাকুর ও ব্রাহ্মণ পরিবারের লোকজন বংশ পরম্পরায় বসবাস করছেন এ রাজবাড়িতে। পূর্বসূরি রাজার রেখে যাওয়া নানা বস্তুকে স্বর্ণালি স্মৃতি হিসেবে ধারণ করে আছে পরিবারগুলো। তাঁরা বলছেন, বর্তমান বানানো বাড়িটিতে আগের বিভিন্ন জিনিসপত্র ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলো রাজা গম্ভীর সিংয়ের শাসন আমলের।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ঊনবিংশ শতাব্দীতে নগরীর মির্জাজাঙ্গালে রাজবাড়িটি স্থাপিত হয়। তৎকালীন মণিপুরি রাজ্যের তিন সহোদর রাজা চৌর্জিৎ সিং, মার্জিত সিং ও গম্ভীর সিং রাজবাড়িটি তৈরি করে এখানে বসবাস করেন। পরে চৌর্জিৎ সিং ও মার্জিত সিং কমলগঞ্জের ভানুগাছ এলাকায় বসতি স্থাপন করলেও রাজা গম্ভীর সিং থেকে যান মির্জাজাঙ্গালের রাজবাড়িতে। ১৮২৬ সালে ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় বার্মার সাথে যুদ্ধ করে মনিপুর রাজ্য পুরুদ্ধারের আগ পর্যন্ত রাজা গম্ভীর সিং সপরিবারে এখানেই অবস্থান করেন।
ইতিহাসে মণিপুরিদের কালো অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত হয় ১৮১৯-১৮২৬ সাল পর্যন্ত। ১৮২২ সালে মণিপুরি রাজ্যের সাথে বার্মার যুদ্ধ হয়। এ যুদ্ধে রাজ্যের এক-তৃতীয়াংশ লোক মারা যায়। অসংখ্য মণিপুরি পরিবার নিজ আবাসভূমি ছেড়ে বিভিন্ন দেশে পালিয়ে যায়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজা চৌর্জিৎ সিংও কাছাড়ে পালিয়ে যান। রাজ্যভার গ্রহণ করেন তার সহোদর মার্জিত সিং। এক পর্যায়ে মার্জিত সিং বার্মিজদের কাছে পরাস্থ হন। পরিশেষে চৌর্জিৎ, মার্জিত ও গম্ভীর তিন ভাই একত্রে পুনরায় চলে আসেন মির্জাজাঙ্গালের রাজবাড়িতে।
তৎকালীন ব্রিটিশ উপনিবেশ শাসকদের আশ্রয়ে এখানেই বসতী স্থাপন করেন। ব্রিটিশ সরকারের অনুরোধে সিলেটে সশস্ত্র খাসিয়াদের দমনে মণিপুরি লেভি (সৈন্যবাহিনী) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এদিকে, সিলেটে দীর্ঘদিন অবস্থানের সুবাদে মনিপুরিদের সাংস্কৃতিক সম্ভারের নানা দিক এ অঞ্চলে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। যা এখনো প্রতীয়মান হয় মণিপুরি নৃত্য, গান ও পোষাক ছাড়াও সিলেটের কৃষ্টি-সংস্কৃতিতে।
মণিপুরি রাজবাড়ি পরিবারের সদস্য অশোক শর্মা বলেন, আগের অনেক জিনিস বিভিন্নভাবে নষ্ট হয়ে গেছে। আর আগের কিছু জিনিস ছিল, যেগুলো বর্তমান ঘরে আমরা ব্যবহার করেছি। তিনি বলেন, আগের পুরনো একটি ঘর রয়েছে। সেটা কয়েক বছর আগে সংষ্কার করা হয়েছে। ভারতের মণিপুরি রাজ্যর অর্থায়নে এটি সংস্কার করা হয়।