মাগফিরাতের অষ্টম দিন আজ

18

মাওলানা মাহমুদুল হাসান
আজ ১৮ রমজান। মাগফিরাতের অষ্টম দিন। আজ রমজানের গুরুত্বপূর্ণ একটি ইবাদত ইতিকাফ সম্পর্কে আলোচনা করব। ইতিকাফ আরবি শব্দ “আকফ” মূল ধাতু থেকে নির্গত এর অর্থ হচ্ছে অবস্থান করা, যেমন আল্লাহর বাণী-“তোমরা নামাজের নির্দিষ্ট স্থানগুলোতে অবস্থান রত”। শরিয়তের পরিভাষায় যে মসজিদে জামাআতের সাথে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করা হয়, এমন মসজিদে আল্লাহর ইবাদতের নিয়্যতে অবস্থান করাকে ইতিকাফ বলে। হজরত নবীয়ে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নিজে ইতিকাফ করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামকে ও ইতিকাফ করার জন্য উৎসাহ ও অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। তিনি বলেন, মসজিদ মুত্তাকিদের ঘর, যে ব্যক্তি ইবাদতের উদ্দেশ্যে মসজিদে অবস্থান করবে, আল্লাহ তার প্রতি শান্তি ও রহমত নাজিল করবেন এবং পুলসিরাত পার পূর্বক বেহেশতে পৌঁছার জিম্মাদার হবেন। ইতিকাফের নিয়ম হলো-পাক পবিত্র হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের নিয়ত করে মসজিদে বা নামাজের নির্ধারিত স্থানে অবস্থান করতে হয়। নিয়ত ছাড়া ইতিকাফ করলে সর্বসম্মতক্রমে গ্রহণযোগ্য নয়। পুরুষের জন্য ইতিহাফের স্থান এমন মসজিদে হওয়া চাই, সেখানে অন্তত নিয়মিত আযান ও ইকামতের সঙ্গে জামাতে নামাজ আদায় করা হয়। ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো মসজিদে হারাম বা বায়তুল্লাহ শরিফ। এরপর মসজিদে নববী (সা.) অত:পর বায়তুল মুকাদ্দাস, তারপর জামে মসজিদের মধ্যে যে মসজিদে মুসল্লির সংখ্যা অধিক। স্ত্রী লোকের ক্ষেত্রে ইতিকাফের জন্য সর্বোত্তম স্থান হলো নিজ নিজ ঘরের নামাযের নির্ধারিত স্থান, এ স্থানটি হওয়া বাঞ্চনীয় যেখানে পর্দা ও সার্বিক নিরাপত্তার যাবতীয় শর্ত বিরাজমান। মহিলাদের ইতিকাফের ক্ষেত্রে একটি বিশেষ শর্ত হলো, স্বামীর অনুমতি নেওয়া। অর্থাৎ স্বামীর অনুমতি ছাড়া ইতিকাফ করা অনুচিৎ। এ ক্ষেত্রে স্বামীর কর্তব্য হচ্ছে স্ত্রীকে ইতিকাফ করতে বেশি বেশি উৎসাহ দেওয়া। ইতিকাফ তিন প্রকার-(১) ওয়াজিব (২) সুন্নাতে মুআক্বায়দা (৩) মুস্তাহাব।
ইতিকাফ যে কোনো সময় পাওয়া যায়-যেমন কেউ যদি মাগরিব থেকে ইশা পর্যন্ত ইতিকাফের নিয়তে মসজিদে অবস্থান করেন এবং ইতিকাফের যাবতীয় শর্ত মেনে কেবল ইবাদত-বন্দেগিতেই সময় কাটান। তবে তার ইতিকাফ হয়ে যাবে। এ ধরনের ইতিকাফ হচ্ছে নফল ইতিকাফ। কিন্তু উলামায়ে কেরামগণের সর্বসম্মতিক্রমে ‘সুন্নাতে মুআক্বাদা আলাল কিফায়া’ যে ইতিকাফকে বলা হয়, তা হচ্ছে রমজানের শেষ দশ দিনের ইতিকাফ। রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ইতিকাফ করেছেন বলে হাদিসে প্রমাণ পাওয়া যায়। হজরত আবু হুরায়রা রাজি. বলেন-রাসুলুল্লাহ (সা.) প্রতি রমজানে দশ দিন করে ইতিকাফ করতেন। কিন্তু তার ইন্তিকালের বছর শেষ বিশ দিন তিনি ইতিকাফ করেন। বলাবাহুল্য এ ইতিকাফটি ছিল নবীজির (সা.) সর্বশেষ ইতিকাফ। রমজানের শেষ দশ দিনের ইতিকাফের বিরাট একটি অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য রয়েছে। আর তা হচ্ছে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর অর্পিত মহান আল্লাহ তায়ালার শ্রেষ্ঠতম নিয়ামত লাইলাতুল ক্বদর প্রাপ্তির উদ্দেশ্য। এ মহান উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে একবার স্বয়ং মহানবী (সা.) নিজে সারা রমজান ইতিকাফ করেছেন এবং উম্মতের জন্য নির্ধারিত করে গেছেন যে, রমজানের শেষ দশ দিনেই এ মহিমান্বিত রাত। হজরত আবু সাঈদ খুদরী রাজি. থেকে বর্ণিত তিনি বলেন রাসুলুল্লাহ (সা.) রমজানে প্রথম দশ দিন ইতিকাফ করলেন, তারপর দ্বিতীয় দশ দিনেও ইতিকাফ করলেন, তারপর তিনি তুর্কি তাবুর নিচে অবস্থান করছিলেন। তা থেকে মাথা বের করে বললেন, আমি এ রাতটি অর্থাৎ শবে কদরের সন্ধানে প্রথম দশ দিনের ইতিকাফ করলাম তারপর মধ্যের দশ দিনও ইতিকাফ করলাম, জনৈক আগন্তুক (ফেরেশতা) মারফত আমাকে বলা হলো, রাতটি শেষ দশ দিনেই ইতিকাফ করা উচিত। ইতিকাফকারীকে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে, জ্ঞানবান হতে হবে, জানাবাত এবং হায়েজ নেফাস থেকে পবিত্র হতে হবে, এগুলো ইতিকাফ সহিহ হওয়ার জন্য পূর্বশর্ত। বালেগ হওয়া ইতিকাফ সহিহ হওয়ার জন্য পূর্ব শর্ত নয়। তাই জ্ঞানবান নাবালেগের জন্যও ইতিকাফ সহিহ হবে। ইতিকাফ অবস্থায় বিনা ওজরে মসজিদ থেকে বের হওয়া যাবে না। মহিলাদের ক্ষেত্রেও একই হুকুম, তারাও ঘরের নির্ধারিত স্থান থেকে বের হবেন না। প্রস্রাব, পায়খানা ও জুমার নামাজ আদায় ইত্যাদি প্রয়োজনে মসজিদ থেকে বের হওয়া জায়েয। ইতিকাফকারী ইতিকাফের স্থানেই ঘুমাবেন, খাওয়া দাওয়া করবেন এর জন্য মসজিদ থেকে বের হতে হবে না। মসজিদ ভেঙ্গে যাওয়ার কারণে অথবা জোরপূর্বক বের করে দেওয়ার কারণে ইতিকাফকারী ব্যক্তি যদি মসজিদ থেকে বের হয়ে সঙ্গে সঙ্গে অন্য মসজিদে চলে যান, তবে এতে ইতিকাফ ফাসেদ হবে না। জান-মালের ক্ষতির আশংকা হলেও এ হুকুমই প্রযোজ্য। অসুস্থ ব্যক্তির সেবার জন্য মসজিদ থেকে বের হলে কোনো মৃত ব্যক্তিকে দেখার উদ্দেশ্যে বা তার জানাযায় শরিক হওয়ার উদ্দেশ্যে এমন কি পানিতে ডুবন্ত বা আগুনে নিমজ্জিত কোনো মানুষকে রক্ষা করার জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যাবে, অনুরূপ ভাবে অসুস্থতার কারণে সামান্য সময়ের জন্য মসজিদ থেকে বের হলেও ইতিকাফ ফাসিদ হবে, অবশ্য মান্নত ইতিকাফকারী যদি মান্নতের সময় রোগীর সেবা, জানাযার নামাজ ও ইলমের মজলিসে যাওয়ার শর্ত করে, তাহলে এসব তার জন্য জায়েজ ইতিকাফ ফাসিদ হওয়ার একটি কারণ হলো সহবাস ও সহবাসের দিকে আকৃষ্টকারী কাজ তা দিনেই হোক অথবা রাতেই হোক। স্বপ্ন দোষে ইতিকাফ ফাসিদ হয় না। কয়েক দিন বেহুশ বা পাগল থাকার কারণে লাগাতার ইতিকাফ করতে না পারলে ইতিকাফ ফাসিদ হয়ে যায়। ইতিকাফকালে ইতিকাফকারী সাময়িক ভাবে তার সংসার বা পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয় বটে কিন্তু ইতিকাফের বিধি-বিধান সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা করলে একেই মোটেই নির্জনবাস বলা চলে না। কেননা হারমাইন মসজিদ দ্বয়ে বা বায়তুল মুকাদ্দাসের মসজিদে গোটা বিশ্বের সামর্থবান ইতিকাফকারীরা সমবেত হয়ে থাকেন। জামে মসজিদ বা পাড়ার মসজিদেও একাকী ইতিকাফ করা যায় না। এমতাবস্থায় আল্লাহ ওয়ালা লোকদের সাহায্য গ্রহণের এক সুবর্ণ সুযোগ বলা চলে। একে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এর অন্যদের নিজ থেকে শিক্ষা গ্রহণ ও অন্যদেরকে শিক্ষা দানের অপূর্ব সুযোগ রূপে অবিহিত করা যায়। তাই জগদ্বিখ্যাত মহান বুজুর্গ শায়খুল ইসলাম আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদনী (রহ.) শায়খুল হাদিস আল্লামা জাকারিয়া (রহ.) প্রমুখ ওলীগণ শত শত ভক্ত অনুরক্ত মুরীদ মুতাআল্লীকিনদেরকে নিয়ে ইতিকাফ করতেন।