‘মরণগেমে’ অংশ নিয়ে ধরা পড়েন ছাতকের শরীফ

10

সুনামগঞ্জ প্রতিনিধি
ভূমধ্যসাগর হয়ে ইউরোপ যাওয়ার আগে অভিবাসীদের লিবিয়া উপকূলে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ইউরোপ যাত্রার বাঁচা-মরার ‘গেমে’ অংশ নেন অভিবাসীরা। ঝুঁকিপূর্ণ এ ‘গেমে’ দু’বার অংশ নেন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার নুরুল্লাপুর গ্রামের যুবক মো. শরীফ উদ্দিন। দ্বিতীয়বার গেমে অংশ নিয়ে ধরা পড়ার পর সম্প্রতি দেশে ফিরে এসেছেন তিনি। লিবিয়ায় যাত্রা ও ‘গেমে’ অংশ নেওয়ার বিষয়ে বিস্তারিত জানান শরীফ উদ্দিন।
শরীফ উদ্দিন জানান, তিনি ও তার দুই বন্ধু ২০১৮ সালের ২৫ মে দালালের মাধ্যমে অবৈধভাবে ইতালির উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করেন। এ জন্য কোনো প্রমাণপত্র ছাড়াই দালালের হাতে প্রথমে তুলে দেন নগদ সাড়ে পাঁচ লাখ টাকা। চেকের মাধ্যমে দালালরা টাকা নেন না। এমনকি কোনো চুক্তিপত্র বা সাক্ষীও থাকে না। টাকা নেওয়ার সময় দালালরা বলে, ইতালি পৌঁছানোর আগে টাকার বিষয়ে কাউকে কিছু বলা যাবে না।
তিনি জানান, রাতে তারা তিন বন্ধু ঢাকার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়ি থেকে রওনা দেন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে প্রথমে তারা দুবাই যান। বিমানে ওঠার পরপরই দুবাইয়ের ভিজিট ভিসা ছিড়ে ফেলেন সবাই। বিমানে থাকা অবস্থায় লিবিয়া যাওয়ার পারমিট বের করে হাতে নেন তারা। পরে দুবাই থেকে বিমানে চড়ে যান মিশরে। সেখান থেকে আলেকজান্দ্রা হয়ে লিবিয়ার বেনগাজি শহরে পৌঁছান।
শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘মিশরে যাওয়ার পর দালালরা সবার পাসপোর্ট কেড়ে নেয়। সেখানে একটি কক্ষে গাদাগাদি করে ১৫ দিন রাখা হয়। এ সময় লিবিয়ায় অবস্থানকারী এক দালাল জানায়, লিবিয়ার উপকূলীয় শহর জিলটনে যেতে হলে আবারও টাকা দিতে হবে। এরপর বাড়িতে যোগাযোগ করে পরিবার-পরিজনকে আরও টাকা দিতে বলে দালালরা। চাহিদা মতো টাকা দিতে না পারলে, প্রাণে মেরে ফেলারও হুমকি দেয় তারা। পরিবার টাকা পাঠানোর পর নিয়ে যাওয়া হয় জিলটন শহরে। সেখানে একটি ঘরের মধ্যে নজরবন্দি করে রাখা হয় ৫-৬ মাস। এ সময় প্রতিদিন নামমাত্র খাবার দেওয়া হতো। অন্য জায়গায় কাজ করার কথা বললে, তাদেরকে মাফিয়া চক্রের হাতে তুলে দেওয়ার ভয় দেখাতো বাঙালি দালাল। এভাবে অনেক দিন কেটে যায় তাদের।
তিনি বলেন, ‘এরমধ্যে ইতালি যাওয়ার ‘গেম’ খেলার দিন চলে আসে। যেদিন ‘গেম’ হবে, সেদিন সবাইকে লিবিয়া উপকূলের কোনো একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখান থেকে তোলা হয় নৌকায়।’ শরীফ জানান, ‘গেম’ হয় তিনভাবে-প্লাস্টিকের নৌকায়, কাঠের নৌকায় ও শিপে চড়ে। প্রথমে নৌকায় মোট যাত্রী ছিল ১২৫ জন, এরমধ্যে ৪৫ জন বাংলাদেশি। প্লাস্টিকের বোটে চড়ে তারা সাগড় পাড়ি দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাদের বহনকারী নৌকাটি ২৩ ঘণ্টা চলার পর লিক হয়ে যায়। লিক হওয়ার কারণে সাগরে তিন থেকে চার ঘণ্টা ভেসে থাকে। এ সময় তার চোখের সামনে ৪-৫ জন যাত্রী সাগড়ে ডুবে মারা যান। খবর পেয়ে লিবিয়ার উপকূল রক্ষীবাহিনী তাদের উদ্ধার করে। পরে লিবিয়ায় এনে তাদের জেলে আটক রাখা হয়। জনপ্রতি একলাখ টাকা করে দিয়ে ছাড়া পান তারা।
দেশে ফিরে আসা শরীফ উদ্দিন বলেন, ‘২০১৮ সালের ৬ নভেম্বর তিন বন্ধু দ্বিতীয়বার ‘গেমে’অংশ নেন। দ্বিতীয় গেমের জন্য আবারও দেশ থেকে টাকা আনিয়ে দালালদের হাতে তুলে দিই। গেমের দিন সকাল ১০টার দিকে আমাদেরকে প্লাস্টিকের নৌকায় তোলা হয়। নৌকাটি ছুটে চলে মাঝ সাগরের দিকে। কথা ছিল, ইতালির উপকূলের দিকে যাওয়া জাহাজে আমাদের তুলে দেওয়া হবে। এরপর জাহাজ উপকূলের কাছাকাছি পৌঁছালে সেখান থেকে ছোট নৌকায় করে ইতালি নিয়ে যাওয়া হবে।’
তিনি বলেন, ‘জিলটন থেকে জাহাজে করে ইতালি যেতে সময় লাগে ৩২ ঘণ্টা। বোটে যেতে লাগে ৬০ থেকে ৭২ ঘণ্টা। মালটা সাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যেতে হয়। দ্বিতীয় গেমের সময় বোটে ৯৯ জন যাত্রী ছিল। কিন্তু বোটের ধারণ ক্ষমতা ছিল মাত্র ৩০ জনের। যাত্রীদের মধ্যে সিলেটের ছিল আট জন, তাদের গড় বয়স ২২ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে। আমাদের বোটটি সাগরে সাত ঘণ্টা চলার পর লিক হয়ে যায়। অচল বোটটি সাগরের বাতাসে মাল্টা হয়ে ইতালির ২০০ কিলোমিটার জলসীমার ভেতরে চলে যায়। সেখানে বোটে থাকা দালালরা পানামার একটি শিপের সঙ্গে যোগাযোগ করলে, তারা ইতালির সিসিলি দ্বীপে আমাদেরকে নামিয়ে দেওয়ার কথা বলে। কিন্তু সেখানে আবারও আমরা ধরা পড়ে যাই। লিবিয়ার উপকূল রক্ষীবাহিনী আমাদের সেখান থেকে নিয়ে আসে এবং জেলে আটকে রাখে। জেলে আমাদের মারধর করা হতো।’
শরীফ উদ্দিন জানান, জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থার (আইওএম) সহযোগিতায় তিনি প্রথমে ঢাকায় এবং পরে ছাতকের গ্রামের বাড়ি নুরুল্লাপুরে আসেন। তিনি আরও জানান, এক বছর হলো তার বাবা মারা গেছেন। তাদের পরিবার এখন ঋণে জর্জরিত। যে দালালের মাধ্যমে তিনি ইতালির উদ্দেশে লিবিয়ায় যান, সেই দালালের মোবাইল ফোন এখন বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।