নাজাতের তৃতীয় দিন আজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান

21

আজ ২৩ রমজান। নাজাতের তৃতীয় দিন। রমজানের সিয়াম সাধনার শেষে রোজার ত্রুটি বিচ্যুতির ঘাটতি পুরণে এবং অভাব গ্রস্থ নিঃস্ব অসহায় দরিদ্র মানুষকে ঈদুল ফিতরের আনন্দে শরিক করার জন্য ইসলামি শরিয়তে স্বচ্ছল মানুষের পক্ষ থেকে দান খয়রতের বিধান করা হয়েছে। একে বলা হয় সাদকাতুল ফিতর। রমজানুল মোবারকের শেষ পর্বের করণীয় কিছু গুরুত্বপূর্ণ ও ফযিলতপূর্ণ আমলের অন্যতম সাদকায়ে ফিতর বা ফিতরার হিসাব নিকাশ করে ফিতরা দেওয়ার প্রস্তুতি গ্রহণ। সমাজের অসহায় দরিদ্র মানুষের হাতে ফিতরা তুলে দেওয়ার প্রধান সময় যদিও ঈদুল ফিতরের দিন সকালে ঈদের জামাতে যাওয়ার প্রাক্কালে কিন্তু বেশি সওয়াবের আশায় এবং ফিতরা প্রাপক মানুষটির টাকা ব্যায়ের প্রস্তুতি নেওয়ার সুবিধার্থে অনেকেই রমজানের শেষ দিকে, ফিতরা দিতে শুরু করেন। জাকাত কুরবানির মতই সাদকাতুল ফিতর বা ফিতরা ইসলামের একটি আর্থিক ইবাদত। জাকাতের জন্য ফরজ হওয়ার নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হওয়া এবং সে অবস্থায় একটি বছর অতিবাহিত হওয়া শর্ত, ফিতরার জন্য তেমন শর্ত নেই। কেবল ঈদুল ফিতরের দিনের সকালে যিনি নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যান বা মালিক হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা যার বিদ্যমান থাকে, ফিতরা দেওয়া তার ওপরই ওয়াজিব।
দীর্ঘ একটি মাসের সংযম শেষে যে আনন্দ বা পুরস্কার প্রাপ্তির দিনকে ঈদের দিন হিসেবে ইসলামে ঘোষণা করা হয়েছে তার বাহ্যিক ও অনুমোদিত আনন্দ আয়োজনে ধনী-গরিব সবাইকে শরিক করার এক তাৎপর্যপূর্ণ বিধান হচ্ছে ফিতরা প্রদান। সাদাকাহ আরবীশব্দ-যার আভিধানিক অর্থ হচ্ছে দান। পরিভাষায় যে দান দ্বারা আল্লাহর নিকট সওয়াবের আশা করা যায় তাকে সাদাকাহ বলে। সাদাকাতুল ফিতর অর্থ হলো-নিসাব পরিমাণ মালের মালিকের উপর ঈদুল ফিতরের দিন সুবহে সাদিকের সময়ে দেওয়া ওয়াজিব হয়। সাদকাতুল ফিতরের অপর নাম হচ্ছে জাকাতুল ফিতর।
এক হাদিসের বর্ণনা অনুযায়ী ফিতরা দিয়ে এক দিনের জন্য হলেও গরিব মানুষের অসহায়ত্ব ও প্রার্থী হওয়ার মত দুরাবস্তা মোচন করতে মুসলমানদের উৎসাহিত করা হয়েছে ও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। আর্থিকভাবে স্বচ্ছল রোজাদারদের সে জন্যই ফিতরা প্রদানের জন্য বর্ণিত পাঁচ প্রকার খাদ্য খেজুর, পনির, যব, কিশমিশ, গমের মধ্য থেকে নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ উত্তম ও মূল্যবান জিনিস বা তার মূল্য দান করার চেষ্টা করা উচিত। তবে সাধারণ নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণী (যাদের উপর ফেতরা দেওয়া ওয়াজিব) সর্বনিম্ন হার নির্দ্দিষ্ট পরিমাণ গমের মূল্য ধরে ফিতরা দিতে পারেন। আফসোস হয় এ জন্য আমাদের সমাজে অনেক শীর্ষ পর্যায়ের বিত্তবানরা দায়সারা ভাবে ফিতরা আদায় করেন।
হাদিসের ভাষ্য অনুযায়ী ফিতরার আরেকটি গুঢ় তাৎপর্য হলো রোজাদারদের এক মাসের রোজায় মান ও পূর্ণতাগত যে সব বিচ্যুতিও ত্রুটি সংঘটিত হয়েছে তার ক্ষতিপুরণ দান। প্রত্যেক রোজাদার যেহেতু মানুষ, তাই ইচ্ছায়-অনিচ্ছায় রমজানের পূর্ণ পবিত্রতা মান রক্ষা করা অনেক সময়ই সবার পক্ষে সম্ভব হয় না, ফিতরা প্রদানের মাধ্যমে সে অক্ষমতাও ব্যর্থতা থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার এই সুবর্ণ সুযোগ আমাদের কারো নষ্ট করা উচিত নয়। সংযম সাধনার মাস রমজানের সঙ্গে রমজান পরবর্তী ঈদের সঙ্গে জড়িয়ে দেওয়া মহান আর্থিক ঈবাদতের মধ্যে আনন্দে সার্বজনীনতা দান, সহমর্মিতা প্রকাশ ও নিজেদের রোজার অপূর্ণাঙ্গতা ঘটিত ক্ষতিপূরণ এর সুন্দর অবকাশ বিদ্যমান।বাহ্যিক প্রস্তুতির পাশাপাশি নিষ্ঠা আত্মিক প্রস্তুতির মধ্য দিয়ে তাই সবার উচিত ফিতরা প্রদানে কোনো গড়িমসি না করা এবং একই সঙ্গে ফিতরা দানে সক্ষম প্রত্যেককে ফিতরা দিতে উদ্বুদ্ধ করার দায়িত্বটি ও আমাদের পালন করা উচিত।
কোনো ব্যক্তি যদি ঈদের নামাজের আগে রমজানের মধ্যে সাদাকায়ে ফিতর আদায় করে দেয় তবে তাও জায়িয আছে। ঈদের দিন তা পুনরায় আদায় করতে হবে না। আর যদি ঈদের নামাজের আগে আদায় না করে তবে তার সাদকায়ে ফিতর মাফ হবে না। অন্য সময় তা আদায় করতে হবে। অবশ্য নামাজের আগে আদায় করা মুস্তাহাব। (হিদায়া ১ম খন্ড)। ফিতরা এবং রোজা দুটি পৃথক পৃথক ইবাদত। তাই কেউ যদি বার্ধ্যক্ষজনিত কারণে বা অসুস্থতার কারণে রোজা রাখতে না পারে তবে তার থেকে সাদকায়ে ফিতর রহিত হবে না। বরং তাদের উপর সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। (আলমগিরি ১ম খন্ড)।