নাজাতের ৪র্থ দিন আজ

19

মাওলানা মাহমুদুল হাসান
আজ ২৪ রমজান। জাহান্নাম থেকে নাজাত তথা মুক্তির চতুর্থ দিন। রোজা পালনের সঙ্গে সঙ্গে একজন মুসলমান ঈমানদারকে সদকায়ে ফিতর আদায় করতে হয়। ইসলামি শরিয়তে সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব অর্থাৎ অত্যাবশ্যক পালনীয় একটি ইবাদত। সদকাতুল ফিতরের অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হচ্ছে ঈদের খুশিতে গরিব শ্রেণির লোককে ও ঈদ আনন্দে শামিল করা। কেননা ঈদের আগেই যখন একজন অভাবী-অনাহারী দুঃস্থ অসহায় লোক কিছু পায়, তখন তা তার আনন্দের কারণ হয়। অন্যদিক বিবেচনা করলে সাদকাতুল ফিতর হচ্ছে রোজার জাকাত। জাকাত যেমন সম্পদকে পাক পবিত্র করে, তেমনি ফিতরা ও রোজাকে পবিত্র করে। মানুষ ভুলত্রুটির উর্ধ্বে নয়, রোজার ত্রুটিবিচ্যুতির ক্ষতি পূরণ করে সদকাতুল ফিতর। ঈদের দিন সুবহে সাদিক থেকে ফিতরা ওয়াজিব হয়। গম, গমের আটা, যব, গমের আটা এবং খেজুর ও কিসমিস দিয়ে ফিতরা আদায় করা যায়। কিন্তু আমাদের দেশে কিসমিস বা খেজুর ইত্যাদির মূল্য হিসেবে ফিতরার হার নির্ধারণ করা হয় না। এটা রীতিমত দুঃখজনক এবং গরিবের হক বিনষ্টের শামিল। শুধু গমের আটার মূল্য নির্ধারণ করে ফিতরা আদায় করবেন কেন? সমাজের ধনীদের মধ্যে ও তারতম্য আছে। তাই যে যতটুকু বেশি সম্পদের অধিকারী সে হিসেবেই অধিক মূল্যের পণ্য দ্বারা সদকাতুল ফিতর আদায় করা উত্তম। গম বা গমের আটা দ্বারা ফিতরা আদায় করলে গম অর্ধ সা’ (১ কেজি ৬৫০ গ্রাম) এবং যব বা যবের আটা কিংবা খেজুর দ্বারা আদায় করলে ১ সা’ (৩ কেজি ৩০০ গ্রাম) দিতে হবে। রুটি চাল বা অন্য খাদ্য দ্রব্য দিয়ে ফিতরা আদায় করলে মূল্য হিসেবে দিতে হবে। কিসমিস দিয়ে ফিতরা আদায় করলে ১ সা’ অর্থাৎ ৩ কেজি ৩০০ গ্রাম দিতে হবে। দুর্ভিক্ষের সময় খাদ্যদ্রব্য দ্বারা ফিতরা আদায় করা উত্তম।
ঈদুল ফিতরের আগে ফিতরা আদায় করা জায়েজ। নিজের এবং নিজের নাবালগ সন্তানের পক্ষ থেকে সদকায়ে ফিতর আদায় করা ওয়াজিব। স্ত্রী এবং বালেগ সন্তানরা ফিতরা নিজেরাই আদায় করবে। স্বামী বা পিতার ওপর তাদের ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। তবে দিয়ে দিলে আদায় হয়ে যাবে; কিন্তু পরিবারভুক্ত নয় এমন লোকের পক্ষ থেকে তর অনুমতি ছাড়া ফিতরা দিলে আদায় হবে না। কোনো ব্যক্তির ওপর তার পিতা মাতার, ছোট ভাই বোন ও নিকটাত্মীয়দের পক্ষ থেকে ফিতরা আদায় করা ওয়াজিব নয়। এক ব্যক্তির ফিতরা একজন মিসকিনকে দেওয়া উত্তম। তবে একাধিক ব্যক্তিকেও দেওয়া জায়েয।
সদকায়ে ফিতরের মাসআলা গুলো নিম্নরূপ-
(এক) যে মুসলমান নিসাব পরিমাণ সম্পদের অধিকারী হয়, তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। তবে জাকাত ও সদকায়ে ফিতরের মধ্যে পার্থক্য হচ্ছে এই যে জাকাত ওয়াজিব হওয়ার জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ মালিকের কাছে পূর্ণ এক বছর থাকতে হবে। পক্ষান্তরে সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হওয়ার জন্য বছর অতিক্রান্ত হওয়া আবশ্যক নয়; বরং ঈদের দিন সুবহে সাদিকের সময় যদি কেউ নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়ে যায় তবে তার ওপরও সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হয়।
(দুই) নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক যদি সফর, অসুস্থতা অথবা অবহেলা ইত্যাদি কারণে রোজা না রাখে তবুও তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে।
(তিন) যে শিশু ঈদের রাতে সুবহে সাদিকের আগে ভূমিষ্ট হয়েছে, তার সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। আর সুবহে সাদিকের পর ভূমিষ্ট হলে তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব নয়।
(চার) যে-ব্যক্তি ঈদের রাতে সুবহে সাদিকের আগে মৃত্যুবরণ করেছে, তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব নয়। আর সুবহে সাদিকের পর মৃত্যুবরণ করলে তার উপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব হবে।
(পাঁচ) একই হুকুম যে ব্যক্তি সুবহে সাদিকের আগে মুসলমান হবে তার ওপর সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব। সুবহে সাদিকের পর মুসলমান হলে ওয়াজিব নয়।
(ছয়) ঈদের দিন ঈদের নামাজে যাওয়ার পূর্বে সদকায়ে ফিতর আদায় করা উত্তম, যদি তা না করে তবে ঈদের নামাজের পরও তা আদায় করতে হবে। এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সদকায়ে ফিতর আদায় না করবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা আদায় করা ওই ব্যক্তির জন্য আবশ্যক হবে।
(সাত) যে-ব্যক্তি নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক নয় অর্থাৎ যার ওপর কুরবানি ওয়াজিব নয় বা সদকায়ে ফিতর ওয়াজিব নয়, এমন ব্যক্তিকে সদকায়ে ফিতর দেওয়া জায়েয।
(আট) সদকায়ে ফিতর আদায়কারী নিজের আপন ভাই-বোন চাচা ও ফুফুকে তা দিতে পারবে। তবে পিতা মাতা নিজ সন্তানকে এবং সন্তান স্বীয় পিতা-মাতা, দাদা-দাদি, নানা-নানিকে সদকায়ে ফিতর দিতে পারবে না।
(নয়) দরিদ্র মুসলমানকে সদকায়ে ফিতরের মালিক বানিয়ে দিতে হবে। তবে সে ব্যক্তি সৈয়দ বংশের হতে পারবে না। সদকায়ে ফিতরের টাকা সরাসরি মসজিদ ইত্যাদির কাজে লাগানো যাবে না।
(দশ) এক ব্যক্তির সদকায়ে ফিতর একাধিক দরিদ্র মুসলিম ব্যক্তিকে দেওয়া যায় এবং একাধিক ব্যক্তির সদকায়ে ফিতর একজন দরিদ্র ব্যক্তিকে দেওয়া যায়। সমাজের বিত্তবানদের প্রতি আমার বিশেষ অনুরোধ, আপনারা কিশমিশ, পনির ও খেজুর ইত্যাদির সর্বোচ্চ মূল্যের হারে সদকাতুল ফিতর আদায় করুন। আল্লাহ তায়ালা আমাদের মালের মধ্যে বরকত দেবেন।