নাজাতের পঞ্চম দিন আজ মাওলানা মাহমুদুল হাসান

25

মাওলানা মাহমুদুল হাসান
আজ ২৫ রমজান। নাজাতের পঞ্চম দিন। আরবি মাস সমূহের মধ্যে রমজান মাসের গুরুত্ব ও মর্যাদা অপরিসীম। এ মাসটি তিনটি মহান বিষয়ের সাথে সম্পৃক্ত হওয়ায় এর সম্মান সর্বোচ্চ। প্রথমত : এ মাসে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে রোজা রাখা, দ্বিতীয়ত : এ পবিত্র মাসে কুরআন মজিদ নাজিল হওয়া, তৃতীয়ত : এ মাসের একটি রাত ‘লাইলাতুল কদর’ বা মহিমান্বিত রজনী হিসেবে ঘোষিত হওয়ায়। এই তিনটি বৈশিষ্ট্যের সমন্বয়ে ইসলামি জীবন বিধানের পরিপূর্ণতা সম্পন্ন হয়েছে। রমজান কুরআন ও লাইলাতুল কদর একই সূত্রে গাঁথা। ইসলামকে যদি একটি বৃক্ষের সাথে তুলনা করা হয় তাহলে দ্বীন হচ্ছে মূল, কুরআন হচ্ছে কান্ড, রমজান হচ্ছে শাখা, লাইলাতুল কদর হচ্ছে এর প্রশাখা। রমজান মাসের কোনো দিন ক্ষণে মহাগ্রন্থ আল কুরআন নাজিল হয়েছে তা আল্লাহ তায়ালা ঘোষণা করেছেন। ইরশাদ হয়েছে-আমি এটা (কুরআন) নাজিল করেছি লাইলাতুল কদর বা মহিমান্বিত রজনীতে। আর মহিমান্বিত রজনী সম্বন্ধে তুমি কি জানো? মহিমান্বিত রজনী অর্থাৎ লাইলাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও শ্রেষ্ঠ। এই রজনীতে ফেরেশতাগণ ও রূহ জিব্রাইল (আ.) অবতীর্ণ হয়, প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতি ক্রমে। শান্তি, সেই রজনীর ঊষার আবির্ভাব পর্যন্ত। (সূরা কদর)।
হাদিস শরিফে লাইলাতুল ক্বদরের প্রসঙ্গ অবতারণার ঘটনাটি নিম্নরূপ। একদিন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সাহাবায়ে কেরামের উদ্দেশ্যে বণী ইসরাইলের একজন ইবাদতকারী সম্পর্কে বলছিলেন-যিনি সারা রাত ইবাদত-বন্দেগিতে লিপ্ত থাকেন এবং সকাল হলেই আল্লাহর রাস্তায় জিহাদে বেরিয়ে পড়েন। এ রকম দুটি পুণ্যময় কাজে তার এক হাজার মাস কেটে যায়। সাহাবাগণ এ ধরনের একজন পুণ্যবান লোকের কথা শোনে খুবই বিস্মিত হলেন। তারা আরয করলেন ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদের অনেকেই তো এক হাজার মাস অর্থাৎ তিরাশি বছর চারমাস বাঁচেন না, তাহলে কিভাবে অল্প আয়ুষ্কালের মধ্যে এত বেশি ইবাদত করা সম্ভব? তাদের মধ্যে এ ঘটনা চিন্তার উদ্রেক করে। তখনই উম্মতে মোহাম্মদীর (সা.) শান্ত¡নার জন্য সূরা কদর নাজিল হয়। জিব্রাইল আ. রাসুল (সা.) এর কাছে আরয করলেন, যেহেতু আপনার উম্মতগণ পূর্বের উম্মতের এক হাজার মাসের ইবাদতের জন্য ইর্ষান্বিত, তাই আল্লাহ তায়ালা এক হাজার মাসের চাইতে উত্তম এক মহিমান্বিত রজনী দান করেছেন”। এরপর সূরা কদর পড়ে শুনালেন। হাদিস শরিফে এ রাতের বহু ফযীলত ও গুরুত্বের কথা বর্ণনা করা হয়েছে-রাসুল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি শব-ই কদর রাতে ঈমানের সাথে সওয়াবের নিয়তে ইবাদতের জন্য দাড়াবে তার পেছনের সকল গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। (বুখারি)।
অন্য এক হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল (সা.) বলেন, তোমাদের কাছে এ মাস (রমজান) এসেছে। এ মাসের মধ্যে এমন একটি রাত আছে যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে এক মাস হতভাগা লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না। (ইবনে মাযাহ, মিশকাত, আত-তারগীর) হজরত আনাস রাজি. থেকে বর্ণিত-হাদিসে আছে-শবে ক্বদরে হজরত জিব্রাইল আ. একদল ফেরেশতা নিয়ে দুনিয়ায় অবতরণ করেন। তারা সে সব লোকের জন্য দু’আ করতে থাকেন, যারা এ রাতে দাঁড়ানো বা বসা অবস্থায় আল্লাহর ইবাদতে মশগুল থাকে।” (বায়হাকী, তাফসীরে ইবনে কছীর) প্রকৃত পক্ষে শবে কদর উম্মতে মুহাম্মদীর জন্য একটি মহামূল্যবান নিয়ামত। আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি বিশেষ অনুগ্রহ। আউলিয়ায়ে কোমগণ শবে কদর পাওয়ার জন্য জীবনভর সাধনা করেছেন। আমরা কত দুর্ভাগা জাতি এ নিয়ামত যার কোনো তুলনা হয় না সেটি পাওয়ার পরও এর যথাযথ কদর সম্মান করতে জানি না। অথচ সাধারণত শবে বরাত যে উৎসাহ উদ্দীপনা নিয়ে পালন করি তার অর্ধেক গুরুত্ব ও দিয়ে শবে কদর পালন করা হয় না। হজরত আব্দুল্যাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, যে ব্যক্তি সারা বছর ধরে রাত জাগে (তাহাজ্জুদ নামাজ পড়ে ও ইবাদত-বন্দেগি করে রাত কাটায়) সে লাইলাতুল কদর পায়।
আকাশে যত তারা আছে তার চেয়েও বেশি ফেরেশতা অবতীর্ণ হয়। এসব ফেরেশতা যারা সিদরাতুল মুনতাহায় থাকেন তারা জিব্রাইলের সাথে সূর্যাস্ত যাওয়ার পর থেকে নামতে থাকেন। অত:পর ভূ পৃষ্ঠের এমন কোনো জায়গা বাকি থাকে না যেখানে কোনো না কোনো ফেরেশতা থাকেন না। তারা হয় সিজদায় থাকেন নতুবা দাড়িয়ে থাকেন এবং মুমিন পুরুষের ও নারীদের জন্য দোয়া করতে থাকেন। (ইবনে কছীর)। এই রাতে হজরত জিব্রাইল আ. যে মুমিন ব্যক্তিরই পাশে দিয়ে যান তার সাথে মুসাফাহা করেন। এর ফলে ঐ মুমিনের শরির শিহরিত হয় এবং তার মনটি বিগলিত হয়ে চোখ দুটি অশ্রুসিক্ত হয়। (তাফসীরে কবীর)।
আল্লামা যাহহাক (র.) বলেন-লাইলাতুল কদরে আল্লাহ পাক প্রত্যেক তওবাকারীর তওবা কবুল করেন এবং সূর্যাস্ত থেকে সূর্যোদয় পর্যন্ত (অর্থাৎ সমস্ত রাত) আকাশের দরজা সমূহ খোলা থাকে।
লাইলাতুল ক্বদরের রাতটির মাহাত্ম্য এমন যে এ রাতটি হবে শান্ত, স্নিগ্ধ ও স্বচ্ছ। রাতটির আরো বৈশিষ্ট হলো এই যে, রাতটি হবে নাতিসিতুষ্ণ না গরম না শীত। ঐ রাতে চাদের জোৎস্না তারকাগুলোকে ম্লান করে দেয় (ইবনে খুযায়মা)। ঐ রাতটি হবে নিঝুম নিস্তব্ধ, চাঁদ হবে জোৎস্নাময়। (কিয়ামূল লাইল)।
সে রাতের প্রভাতের সূর্য উপরে না উঠা পর্যন্ত তা নি®প্রভ থাকবে। (আবু দাউদ ১৩৭৮ মুসলিম, নাসায়ী) সূর্যের কিরণে অনুজ্জল বা নি®প্রভ হওয়ার কারণ সম্পর্কে হজরত কাসাব (রা.) বলেন ঐ রাতের সুবহে সাদিকে সর্বপ্রথম আকাশে উঠে যান জিব্রাইল (আ.)। তিনি যখন দিক চক্রবালে থাকেন, তখন তাঁর ডানা দুটিকে ছড়িয়ে দেন। তার সবুজ রংয়ের দুটি বিশেষ ডানা যা তিনি ঐ সময় ছাড়া আর কখনও ছড়ান না। ফলে সূর্যের কিরণ নি¯প্রভ হয়। তার পর তিনি একে একে ফেরেশতাদের ডাকতে থাকেন। তারাও চড়াও হতে থাকেন। ফলে ঐ সব ফেরেশতাদের জ্যোতি এবং জিব্রাঈলের দু ডানার জ্যোতি একত্রে সমাবেশ হয়। তাই ঐ দিন সূর্যের কিরণ ক্রমশ কেনো দিকে বিচ্ছুরিত হতে পারে না। (ইবনে কসীর)।
আগামী কল্য রাতশবে কদর হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি অতএব মহিমান্বিত এ রাতে নিজেকে ক্ষমা প্রাপ্তির তালিকাভুক্ত করানোর জন্য পূর্ণ প্রস্তুতি গ্রহণ করা সকলের ঈমানী ও নৈতিক দায়িত্ব, আল্লাহ তায়ালা শবে ক্বদরের যথাযথ: কদর করার তৌফিক দিন। আ-মিন।