নাজাতের অষ্টম দিন আজ

30

মাওলানা মাহমুদুল হাসান
আজ ২৮ রমজান। নাজাতের অষ্টম দিন। রহমত মাগফিরাত আর নাজাতের সেই মহিমান্বিত মাস অতি দ্রুত আমাদের মধ্য থেকে বিদায় হয়ে যাচ্ছে। শবে কদর পালিত হয়েছে যথাযথ; ভাবগাম্ভীর্যপূর্ণ পরিবেশে মুসলিম উম্মাহর সুখশান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে। মসজিদে মসজিদে বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রত্যেক মুসলমান নারী-পুরুষ নিজের অনেক প্রয়োজন পুরণের আকাঙ্খা নিয়ে মহান রাব্বুল আলামীনের নিকট প্রার্থনা করেছেন। দুনিয়াবি অনেক হাজাত আছে দোয়া করার পরও পুরণ হয় না। এতে অনেক নিরাশ হন। অথচ রাসুলে করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন মুমিন বান্দার সকল দুআ আল্লাহর দরবারে কবুল করা হয়। কারো চাওয়া অনুযায়ী তার আকাঙ্খিত বস্তু দান করা হয়। কারো দুআর বিনিময়ে আগত রুগ বা বিপদ থেকে তাকে হেফাজত করা হয়। কারো দুআর বিনিময়ে পরকালে তার বদলা প্রদান করা হয়। তাই দুআ প্রার্থী কোনো ব্যক্তির আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হওয়া মোটেও উচিত নয়। রমজানের পালিত যথাসাধ্য সিয়াম সাধনাকে পুঁজি করে পুরো বছর নিজেকে ইবাদত-বন্দেগিতে জড়িয়ে রাখাই হবে বুদ্ধিমান ব্যক্তির কাজ।
রোজার সওয়াব এত বেশি যা একমাত্র আল্লাহই জানেন অন্য কাউকে জানানো হয়নি। মানুষের নেক আমলের সওয়াব ও বদ আমলের আযাব লিখার জন্য নিযুক্ত ফিরিশতা কেরামান কাতিবীন (রা.) ও জানেন না। বস্তুত আত্ম নিয়ন্ত্রণ ও সংযমের জন্য বরাদ্দ রয়েছে অপরিমিত পুরস্কার। আন্তরিকতা ও নিষ্ঠার মাত্রা অনুযায়ী আল্লাহ তা বরাদ্দ করবেন। আশরাফুল মাখলুকাত বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জাতি মানুষের প্রতি মহান রাব্বুল আলামিনের করুণা ও অনুগ্রহের এই অসীম বরাদ্দ হয় পানাহার ও কামাচার বর্জনের হুকুম পালনের বিনিময়ে। এতে যে ব্যক্তি যত উন্নত মান বজায় রাখতে সক্ষম হয়, আনুষাঙ্গিক চাহিদা ও দাবী মেটাতে যে যেমন সফল হয়, তার জন্য নির্ধারিত হয়ে যায় পুরস্কার ও প্রতিদানের তেমনই পরিমাণ ও মাত্রা। এ প্রসঙ্গে আধ্যাত্মিক সাধকরা রোজা চার প্রকার বলে বর্ণনা করেছেন।
(১) সাধারণ মানুষদের রোজা। এটা ন্যূনতম পর্যায়ের। কমপক্ষে এতটুকু না হলে রোজা আদায়ের ফরজ হুকুম থেকে কেউ দায়মুক্ত হতে পারবে না।
(২) সাধারণদের মধ্যে বিশেষ ব্যক্তিদের রোজা, পানাহারও কামাচার বর্জনের পাশাপাশি যদি পাপাচার ও বর্জন করা যায়, তাহলে এই প্রকারের রোজা হয়। এটা সবার কাছেই কাম্য। কেননা মহানবী (সা.) বলেছেন-যে ব্যক্তি অসৎ উক্তিও কর্ম পরিত্যাগ করল না, তার পানাহার বর্জনে আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। তাই হারাম কাজ কর্ম ও বস্তুবাজি থেকে সংযমী হওয়াও রোজার দাবি।
(৩) বিশেষ ব্যক্তিদের রোজা। শুধু হারাম কাজ কর্ম নয়, অপ্রসংশনীয় ও অপ্রয়োজনীয় কথাবার্তা, কাজ কর্ম ও আচরণ থেকেও সংযম পালন করা তাদের বৈশিষ্ট। এমনটি যদি কারো পক্ষে সম্ভব হয়, তাহলে তার জন্য উন্নত মর্যাদা ও পুরস্কারের আশা করা খুবই যুক্তি সঙ্গত। সিয়াম পালন নয়, সাধনাই তখনই বাস্তবায়িত হয়। আর দীর্ঘ এক মাস লাগাতার এই সাধনায় লিপ্ত থাকতে পারলে প্রকৃতই তাকওয়ার অধিকারী হওয়া যায়।
(৪) অতি বিশেষ ব্যক্তিদের রোজা। এটা রোজার সর্বোচ্চ মান। আল্লাহ প্রেমিক ও দুনিয়া বিমুখ সাধকদের বক্তব্য রমজানে সিয়াম পালনের দাবি আল্লাহ ছাড়া সবকিছু থেকে অন্যমনস্ক থাকা। হৃদয় মন একমাত্র আল্লাহর জন্য নিবেদিত রাখা এবং মনোজগতে শুধু আল্লাহ তায়ালারই স্মরণ কে স্থান দেওয়া তাদের দাবী। এ পর্যায়টি হাসিল করা যেমন কঠিন তেমনি বিরল ঘটনা। কিন্তু এই অসাধারণ স্তরে যদি উন্নীত হতে পারেন, তাহলে আল্লাহর কাছে ও জান্নাতে তিনি যে অসাধারণ মর্যাদার অধিকারী হবেন, তাতে কোনো সন্দেহ নেই। আল্লাহ তায়ালার নির্দেশ পানের জন্যই রোজা রাখা হয়। আর এতে রয়েছে অনেক ফযিলত। মাসব্যাপী কষ্টের এই ইবাদতটি যদি নিছক দায়সারা উপায়ে না করে উন্নত থেকে উন্নততর পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করা হয়, তাহলে কুরআন নাজিলের এই মাসটি আমাদের জীনকে আরো অর্থবহ করে তুলবে। আমরা প্রত্যেকে নিজেদের রোজা পালনের হিসাব করে নির্ণয় করতে পারি যে উপরোক্ত চার প্রকার এর মধ্যে আমরা কোনো প্রকারের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তায়ালা সর্বোচ্চ শ্রেণীর সিয়াম সাধনাকারীদের তালিকা ভুক্ত করুন। আ-মিন।