সাকিব এখন আরো বড় নির্ভরশীলতা

6

স্পোর্টস ডেস্ক
মুশফিকুর রহিম স্টাম্পের সামনে থেকে বল ধরতে গিয়ে কনুইয়ের গুঁতায় বেলস ফেলে দিচ্ছেন—এ ছবিটা বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের যন্ত্রণা দেবে বহুকাল। তখন কেন উইলিয়ামসন আউট হলে যে ম্যাচে নিরঙ্কুশ আধিপত্য প্রতিষ্ঠা হয় বাংলাদেশের। চাই-কি সে পথ ধরে ম্যাচ জেতাও অসম্ভব ছিল না। মুশফিকের ব্যর্থতাটা তাই আক্ষেপের আগুন জ্বালিয়ে রাখবে অহর্নিশ।
কিন্তু ক্যানভাসটা বড় করে যদি পূর্ণাঙ্গ ছবিটা দেখা যায়? ওই যে মুশফিকের ভুলের সঙ্গে সঙ্গে সাকিব আল হাসানের মাথায় হাত দেখা! মুখের প্রতিটি রেখায় যন্ত্রণার চিহ্ন ফুটিয়ে তোলা! তাহলে এর ভিন্ন এক অর্থ খুঁজে পাবেন এ মানচিত্রের ক্রিকেটপ্রেমীরা। ম্যাচে এমন ‘ইনভলভড’ সাকিবকে দেখে বড় কিছুর আশা তো করাই যায়। পর পর দুই ম্যাচে অমন অলরাউন্ডার পারফরম্যান্স তখন আর অবাক করে না মোটেও। বরং এর পুনরাবৃত্তির প্রত্যাশা উসকে দেয় প্রবলভাবে। তাঁর পারফরম্যান্স নিয়ে প্রশ্ন ওঠেনি কোনো কালে। ব্যাটে-বলে সত্যিকারের সব্যসাচী। এই তো সেদিন ওয়ানডে ক্রিকেট ইতিহাসে সবচেয়ে কম ম্যাচ খেলে পাঁচ হাজার রান ও আড়াই শ উইকেটের যুগলবন্দি মাইলফলক স্পর্শ করেন। সমকাল ছাড়িয়ে মহাকালের সেরাদের মধ্যে জায়গা করে নিচ্ছেন ক্রমে। আর বাংলাদেশের ইতিহাসের সর্বকালের সেরার মুকুট তো সেই কবে থেকেই সাকিবের দখলে। তবু এবারের বিশ্বকাপে যেমন প্রতিজ্ঞা-একাগ্রতা-দৃঢ়তার ছবি হয়ে আছেন তিনি, সেটি আলাদা মনোযোগ কাড়বেই।
আর অমন সাকিব যে দলের কত বড় সম্পদ, অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজা থেকে শুরু করে টিম ম্যানেজমেন্ট হয়ে ১৬ কোটি ক্রিকেটপ্রাণের তা অজানা নয়।
অথচ বিশ্বকাপ প্রস্তুতিটা তাঁর ভালো হয়নি মোটেও। বিপিএলের ফাইনালে ইনজুরিতে পড়লেন, যে কারণে যেতে পারেননি নিউজিল্যান্ড সফরে। সেরে ওঠার পর আইপিএল খেলতে গেলেন; কিন্তু বেশির ভাগ ম্যাচে হয়ে রইলেন দর্শক। আয়ারল্যান্ডে ত্রিদেশীয় সিরিজে খেললেন; আবার ইনজুরির কারণে ফাইনাল খেলতে পারলেন না। তবে সাকিবের ভেতর ভালো করার তাড়নার প্রতিফলন ওই ত্রিদেশীয় সিরিজ থেকেই স্পষ্ট। বিশ্বকাপের প্রথম দুই ম্যাচে যা স্পষ্টতর হয়েছে মাত্র।
ব্যাটিং-বোলিং-ফিল্ডিং সব ছাপিয়ে সাকিবের শরীরী ভাষায় যেন বিশ্বজয়ের আগাম বার্তা। যেন এমন এক যুদ্ধের সৈনিক তিনি, যেখানে ‘পরাজয়’ বলে কোনো শব্দের অস্তিত্ব নেই।

দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে ৮৪ বলে ৭৫ রানের বিস্ফোরক ইনিংস সাকিবের। যে ইনিংস সাহসের বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছে ড্রেসিংরুমে। বিশ্বাসের জ্বালানি হিসেবে তা বাংলাদেশের ইনিংস টেনে নিয়ে গেছে ৩৩০ পর্যন্ত। বোলিংয়ে ১০ ওভারে ৫০ রান দিয়ে নেন এইডেন মারক্রামের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট। এখানেই শেষ নয়। ফিল্ডিংয়ে ভীষণ সক্রিয় সাকিবও বাংলাদেশের বড় প্রাপ্তি। আন্দিল ফেলুকায়োর ক্যাচটি যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে মুঠোবন্দি করেন, সেটিও প্রেরণা ছড়িয়ে দেয় গোটা দলে।
বাংলাদেশের ২১ রানে জেতা সেই ম্যাচে সাকিব ছাড়া ম্যান অব দ্য ম্যাচ আর কে হতে পারতেন!
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে জিতলে সেই পুরস্কারটি নিশ্চিতভাবে উঠত এ অলরাউন্ডারের হাতে। কী করেননি তিনি সেদিন? ব্যাটিংয়ে ৬৮ বলে ৬৪ রানের ঝকঝকে ইনিংস খেলেছেন। দলের একমাত্র হাফসেঞ্চুরিয়ান তিনি, তাতেই দলের স্কোর যায় ২৪৪ পর্যন্ত। এ বিশ্বকাপে এই রান নিয়ে জেতা কঠিন। কিন্তু সাকিব হাল ছাড়েন না। ষষ্ঠ ওভারে বোলিংয়ে এসে প্রথম বলেই আউট করেন মার্টিন গাপটিলকে। দশম ওভারের শেষ বলে আরেক ওপেনার কলিন মুনরোও তাঁর বাঁহাতি স্পিনের শিকার। আফসোসটা বেড়ে যায় এ কারণেই। সাকিবের করা পরের ওভারে যদি উইলিয়ামসনকে ওই সহজ রান আউটটি করতে পারতেন মুশফিক!
রোমাঞ্চ ছড়ানো সেই ম্যাচে শেষ পর্যন্ত দুই উইকেটে হেরেছে বাংলাদেশ। তাতে সাকিবের বীরত্ব অবশ্য মলিন হচ্ছে না এতটুকুন। ফিফটি করেছেন, প্রতিপক্ষের দুই ওপেনারকে আউট করেছেন, ফিল্ডিংয়ের সময় নিজের চনমনে মনোভাব ছড়িয়ে দিয়েছেন গোটা দলে—সাকিবের কাছে এর চেয়ে বেশি আর কী চাইতে পারতেন অধিনায়ক মাশরাফি!
চাওয়া শুধু এই সাকিবকে যেন পুরো বিশ্বকাপে পাওয়া যায়। আর তাঁর মহানায়ক হয়ে ওঠার পরিপূরক হিসেবে দলে যেন কিছু পার্শ্বনায়কও দেখা যায়। তাহলেই হয়তো বিশ্বকাপে আকাশ স্পর্শ করতে পারবে বাংলাদেশ।