সমুদ্র দূষণ ও সম্পদ

23

জাতিসংঘের একটি সমীক্ষা বলছে, প্রতি বছর ৫০ লাখ থেকে দেড় কোটি টন প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে প্রবেশ করে। এর একটা বড় অংশ যায় মাছ ও সামুদ্রিক পাখিদের দেহে। এমনকি সমুদ্রের তলদেশে থাকা প্রাণীদের শরীরেও প্লাস্টিকের সন্ধান মিলেছে। প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ সংস্থার (আইইউসিএন) মতে গাড়ির টায়ার ও বিভিন্ন টেক্সটাইল কারখানা থেকে নিঃসৃত ছোট ছোট প্লাস্টিকের বর্জ্য বিশ্বের বিভিন্ন এলাকায় সমুদ্র দূষণের মূল কারণ। মোট দূষণের প্রায় ৩০ শতাংশই প্লাস্টিকের কারণে হয়ে থাকে। অথচ আমরা যে অক্সিজেন গ্রহণ করি তার অর্ধেকই উৎপাদন করে সমুদ্র, অর্থাৎ সমুদ্রের শৈবাল এবং ফিটোপ্লাঙ্কটন নামক এককোষী উদ্ভিদ। সাগর আমাদের আবহাওয়ামন্ডল থেকে পঞ্চাশ গুণ বেশি হারে কার্বন ডাই অক্সাইড শোষণ করে জলবায়ু পরিবর্তন হ্রাস করে থাকে। সাগরের বৈচিত্র্য এবং উৎপাদনশীলতা সমগ্র মানবজাতির জন্য অপরিহার্য। আমাদের প্রয়োজনেই সাগরকে সুরক্ষা দিতে হবে। ৮ জুন ছিল বিশ্ব সমুদ্র দিবস। এই দিনে আমাদের জীবনে সমুদ্রের গুরুত্ব অনুধাবনের প্রয়াস থাকারই কথা। চলতি বছর ঈদের ছুটির মধ্যে বিশ্ব সমুদ্র দিবস পড়ায় এ নিয়ে বিশেষ কোন আয়োজন দৃষ্টিগোচর হয়নি। তবে আগামীতে সমুদ্র রক্ষা এবং সমুদ্রসম্পদ আহরণের গুরুত্ব বিবেচনা করে ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে বলে আশা করতে পারি। সমুদ্রের দূষণ রোধে যেমন ব্যবস্থা নিতে হবে, তেমনি এর সম্পদ আহরণেও বিশেষ উদ্যোগী হতে হবে।
আমাদের বঙ্গোপসাগরের দিকে ফিরে তাকানো যাক। সমুদ্র জয়ের পর বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে। সমুদ্রে জরিপ, গবেষণা ও সম্পদ অনুসন্ধানে ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদফতরকে (জিএসবি) সরকার নির্দেশনাও প্রদান করেছে। এটা ঠিক যে, বিশাল সমুদ্রসীমা জয়ের ফলে বাংলাদেশের সামনে জাহাজ নির্মাণ শিল্প ও বন্দর সুবিধা বৃদ্ধি, মৎস্য ও জলজসম্পদসহ সমুদ্র তলদেশে থাকা প্রাকৃতিক সম্পদ আহরণ এবং পর্যটন ব্যবসা সম্প্রসারণ প্রভৃতি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। সমুদ্রসীমা নিষ্পত্তির পর সমুদ্র বিষয়ে মহাপরিকল্পনা, জাতীয় নিরাপত্তা ও সম্পদ উত্তোলনে জাতীয় সক্ষমতা বিকাশের কাজটি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। যতটা জানা তার চেয়ে অনেক বেশি অজানা বিশাল সম্পদের আধার এই সমুদ্র। এই সমুদ্রসীমায় বাংলাদেশের কর্তৃত্ব নিশ্চিত করা এবং সম্পদের সর্বোত্তম ব্যবহারে প্রয়োজনীয় উদ্যোগের বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করতে হবে।
বাংলাদেশের সমুদ্র সীমানার মধ্যে শুধু বিপুল মৎস্যভান্ডার নয়, রয়েছে অফুরন্ত প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের ভান্ডারও। বিশেষ গঠন-প্রকৃতির কারণেই তেল-গ্যাসসহ নানান খনিজসম্পদ সঞ্চিত রয়েছে সাগরের তলদেশে। প্রাকৃতিক ও খনিজসম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক দেশই তাদের টেকসই উন্নয়ন কর্মসূূচীর মাধ্যমে উন্নয়নের ধারা অব্যাহত রাখার পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। বাংলাদেশের মতো একটি উপকূলীয় রাষ্ট্রের জন্য বিভিন্ন ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সমুদ্র পরিবহন ও বন্দর সহযোগিতা বৃদ্ধি, মৎস্য আহরণ, মৎস্য রফতানি, পর্যটন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, সামুদ্রিক সম্পদ আহরণ, কৃত্রিম দ্বীপ নির্মাণ, সর্বোপরি জীববিজ্ঞান ও সমুদ্রবিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্রে উন্নয়নের একটি নতুন দ্বার উন্মোচিত হওয়ার উত্তম সম্ভাবনা রয়েছে। সকল সম্ভাবনাকে সর্বতোভাবে কাজে লাগানোই এখন আসল লক্ষ্য। সামুদ্রিক বিষয়ে গবেষণার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব মেরিটাইম রিসার্চ এ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (বিমরাড) তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।