এটা তো ‘আইওয়াশ’ – হাইকোর্ট

101

সবুজ সিলেট ডেস্ক
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে মালামাল ওঠানোর অস্বাভাবিক খরচের ঘটনা তদন্তে সরকারের দুই কমিটি নির্ধারিত সময়ে প্রতিবেদন না দেওয়ায় উষ্মা প্রকাশ করেছে হাইকোর্ট।
একই সঙ্গে ওই দুর্নীতির ঘটনায় নাম আসা নির্বাহী প্রকৌশলী মাসুদুল আলমকে প্রত্যাহার করাটা শুধুই ‘লোক দেখানো’ কিনা সেই প্রশ্ন তুলেছে আদালত।
জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের শুনানিতে সোমবার রাষ্ট্রপক্ষ প্রতিবেদনের জন্য সময় চাইলে বিচারপতি তারিক উল হাকিম ও বিচারপতি মো. সোহরাওয়ারদীর বেঞ্চের এই মন্তব্য আসে।
এরপর গতকাল মঙ্গলবার পুনরায় শুনানি নিয়ে আদালত রুলসহ আদেশ দেয়। ওই ভবনের আসবাবপত্র বিশ্বাসযোগ্যতার সাথে (গুড ফেইথ) কেনা ও উত্তোলনের ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, তা জানতে চাওয়া হয়েছে রুলে।
গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব, গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকোশলী, রাজশাহী অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী ও নির্বাহী প্রকৌশলী এবং রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালককে রুলের জবাব দিতে বলা হয়েছে।
একই সঙ্গে এ ঘটনা তদন্তে সরকারের দুটি কমিটির প্রতিবেদন দাখিল এবং প্রতিবেদন অনুযায়ী কী ব্যবস্থা নেওয়া হল, রাষ্ট্রপক্ষকে তা দুই সপ্তাহের মধ্যে জানাতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আদালতে রিটের পক্ষে শুনানি করেন রিটকারী আইনজীবী ব্যারিস্টার সৈয়দ সায়্যেদুল হক সুমন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করিম।
রিটকারী আইনজীবী সুমন পরে সাংবাদিকদের বলেন, “রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে আসবাবপত্র কেনায় যাদের বিশ্বস্ততা দেখানোর কথা ছিল, তারা তা দেখাতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন।
“ফলে এই বিশ্বাসযোগ্যতা প্রশ্নে আদালত রুল জারি করেছেন এবং সরকার পক্ষকে বলেছেন দুই সপ্তাহের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে। রিপোর্টের ভিত্তিতে কি ব্যবস্থা নিয়েছেন তাও দুই সপ্তাহের মধ্যে আদালতকে জানাতে বলেছেন।”
রিট আবেদনের পর প্রাথমিক শুনানি নিয়ে গত ২০ মে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ প্রকল্পের আওতায় নির্মাণাধীন ভবনে আসবাবপত্র ও আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র তোলার অস্বাভাবিক খরচ তদন্তে গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন চেয়ে রিটের শুনানিও স্ট্যান্ডওভার (মুলতবি) রাখে হাইকোর্ট।
গত সোমবার মামলাটি শুনানির জন্য উঠলে রিটকারী আইনজীবী সুমন আদালতকে বলেন, “আমরা যখন হাইকোর্টে আবেদন করেছি তখন রাষ্ট্রপক্ষ বলেছিল সাতদিনের মধ্যে রিপোর্ট দেবে। কিন্তু এখনও রিপোর্ট দেয়নি।”
রিটে কী চাওয়া হয়েছে আদালত জানতে চাইলে তিনি বলেন, “প্রধানমন্ত্রীও এটা নিয়ে কথা বলেছেন। তারপরও কেন রিপোর্ট দিতে দেরি হচ্ছে? আমরা স্বাধীন তদন্ত এবং বিচারিক তদন্ত চেয়েছি রুলসহ।”
তখন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল আমাতুল করীম বলেন, “আগেই দুটি তদন্ত কমিটি করা হয়েছে। তারা কাজও শুরু করেছে। এখন তারা সময় চেয়েছে, সেটা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ঈদুল ফিতরের নয়দিনের ছুটি ছিল। তাই ১২ জুলাই পর্যন্ত এদের সময় দেওয়া হয়েছে।”
রাষ্ট্রপক্ষের এ আইনজীবী প্রতিবেদন দাখিলের জন্য ১৪ জুলাই পর্যন্ত সময় চান।
তখন বেঞ্চের জ্যেষ্ঠ বিচারক বিচারপতি তারিক উল হাকিম বলেন, “এর মধ্যে যদি আবার তদন্ত কমিটির সময় বাড়ে?”
আমাতুল করীম বলেন, “তখন আমি আর সময় চাইব না। ওরা যা করার করুক। আমি অন্তত চাইব না।”
বিচারক তখন বলেন, “অ্যাটর্নি জেনারেল তো সাতদিনের সময় নিয়েছিলেন। আর্জেন্সি ছিল এই ম্যাটারে। কিন্তু সাতদিনের কথা বলে একমাস! যেখানে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী কনসার্ন সেখানে তদন্ত করতে এরকম হচ্ছে!”
ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এ পর্যায়ে বলেন, “একটি গুরুত্বপূর্ণ আপডেট আছে। ওই প্রকল্পের দায়িত্বপ্রাপ্ত যে প্রকৌশলী তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে।”
বিচারপতি তারিক উল হাকিম তখন বলেন, “এটা তো আইওয়াশ। নিশ্চয়ই সন্দেহজনক কিছু ছিল, নইলে তাকে প্রত্যাহার করল কেন? যেহেতু তাকে প্রত্যাহার করা হয়েছে, তাহলে তো তদন্তের কাজ আরও সহজ হয়ে গেল। ওই প্রকৌশলীকে ওখান থেকে সরিয়ে আরও ভালো জায়গায় কি দেওয়া হয়েছে?”
আমাতুল করীম বলেন, “জি না। তাকে ফ্রিজ করে রাখা হয়েছে।”
এর আগে সোমবার রিট আবেদনের ওপর শুনানি নিয়ে আদালত রুল জারি করতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেলের উপস্থিতিতে আদেশ দেওয়ার আরজি জানিয়েছিল রাষ্ট্রপক্ষ। পরে অ্যাটর্নি জেনারেল শুনানি করলে আদালত গতকাল মঙ্গলবার আদেশের জন্য রাখা হয়েছিল।
রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প এলাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারীদের থাকার জন্য নির্মাণাধীন গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীর নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা ও তা ভবনে তোলায় অনিয়ম নিয়ে গত ১৬ মে একটি দৈনিক ‘কেনা-তোলায় এত ঝাঁজ’ শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশ করে।
ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রকল্পের কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের থাকার জন্য গ্রিন সিটি আবাসন পল্লীতে ২০ তলা ১১টি ও ১৬ তলা আটটি ভবন হচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ তলা আটটি ও ১৬ তলা একটি ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। ২০ তলা ভবনের প্রতিটি ফ্ল্যাটের জন্য প্রতিটি বালিশ কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে পাঁচ হাজার ৯৫৭ টাকা। আর ভবনে বালিশ ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ৭৬০ টাকা।
প্রতিটি রেফ্রিজারেটর কেনার খরচ দেখানো হয়েছে ৯৪ হাজার ২৫০ টাকা। রেফ্রিজারেটর ভবনে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১২ হাজার ৫২১ টাকা। একেকটি খাট কেনা দেখানো হয়েছে ৪৩ হাজার ৩৫৭ টাকা। আর খাট ওপরে ওঠাতে খরচ দেখানো হয়েছে ১০ হাজার ৭৭৩ টাকা।
প্রতিটি টেলিভিশন কেনায় খরচ দেখানো হয়েছে ৮৬ হাজার ৯৭০ টাকা। আর টেলিভিশন ওপরে ওঠাতে দেখানো হয়েছে ৭ হাজার ৬৩৮ টাকার খরচ। বিছানার খরচ ৫ হাজার ৯৮৬ টাকা দেখানো হয়েছে; তা ভবনে তুলতে খরচ দেখানো হয়েছে ৯৩১ টাকা। প্রতিটি ওয়ারড্রোব কিনতে খরচ দেখানো হয়েছে ৫৯ হাজার ৮৫৮ টাকা।
আর তা ওঠাতে দেখানো হয়েছে ১৭ হাজার ৪৯৯ টাকার খরচ। এরকম বৈদ্যুতিক চুলা, বৈদ্যুতিক কেটলি, রুম পরিষ্কারের মেশিন, ইলেকট্রিক আয়রন, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি কেনাকাটা ও ভবনে তুলতে অস্বাভাবিক খরচ দেখানো হয়েছে।