চীন সফর নিয়ে সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা ৬১ টাকায় কিনে ৯.৮ টাকায় গ্যাস দিচ্ছি

30

সবুজ সিলেট ডেস্ক
গ্যাসের দাম বৃদ্ধির কারণ হিসেবে আমদানি করা এলএনজির উচ্চমূল্যের কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, ভারতে রান্নার গ্যাসের দাম কমানোর বিষয়টি যারা তুলছেন, তারা যেন সে দেশে গ্যাসের দামের বিষয়টি বিবেচনায় আনেন।
চীন সফর নিয়ে গতকাল সোমবার বিকালে গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। চীন সফর নিয়ে সোমবার গণভবনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে বিশেষ করে শিশু ধর্ষণ বেড়ে যাওয়া নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন একজন সাংবাদিক। জানতে চান, সরকার এ ক্ষেত্রে কী ব্যবস্থা নেবে।
গত ১ থেকে ৫ জুলাই চীন সফর করেন প্রধানমন্ত্রী। দেশে ফেরেন ৬ জুলাই। শেখ হাসিনা বিদেশ সফরে গেলে এ বিষয়ে বিস্তারিত জানাতে সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে সফরের বিষয়ে একটি বিবৃতি থাকে। তবে বেশিরভাগ প্রশ্নেই থাকে দেশের সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে। এবারের সংবাদ সম্মেলনেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
সম্প্রতি এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন গ্যাসের দাম গড়ে ৩২.৮ শতাংশ বাড়িয়েছে। গ্যাসের আবাসিক সংযোগের বিল বেড়েছে ১৭৫ টাকা। আর এই দাম বৃদ্ধির প্রতিবাদে রবিবার আধাবেলা হরতাল করেছ বামপন্থি দলগুলো।
প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন ছিল এই দাম বাড়ানোর কারণ হিসেবে। সেই সঙ্গে বাংলাদেশে গ্যাসের দাম বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের পরদিন ভারতে সিলিন্ডার গ্যাসের দাম শতাধিক রুপি কমানোর বিষয়টি নিয়েও জানতে চান একজন সাংবাদিক।

৬১ টাকায় কিনে ৯.৮
টাকায় গ্যাস দিচ্ছি
চাকরির বয়স ৩৫ করা হবে না
রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে নেব না
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে
ধর্ষণের বিরুদ্ধে পুরুষরা সোচ্চার হোন
বিএনপির ভুলে এলএনজি আমদানি

জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে এলএনজি আমদানি করতেই হবে। বিদ্যুৎ উৎপাদন, শিল্পায়ন আর প্রবৃদ্ধির জন্য এটা জরুরি। আর অর্থনৈতিক উন্নতি চাইলে মেনে নিতে হবে। বিদেশেও যারা এলএনজি বা গ্যাস আমদানি করে। এটা তারা মেনে নেয়।
প্রতি ঘনমিটার এলএনজির আমদানি খরচ ৬১.১২ টাকা এবং দাম বাড়ানোর পরও সরকার তা দিচ্ছে ৯.৮ টাকায়। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তার পরেও আন্দোলন!’।
দাম বাড়ানোর পরও ১০ হাজার কোটি টাকার ওপরে ভর্তুকি দিতে হচ্ছে বলেও জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে। শেখ হাসিনা বলেন, ‘তাহলে আন্দোলন যখন করছে, এক কাজ করি, যে দামে কিনব, সে দামে বেচব। ৬১ টাকায় নেব। তাহলে আমার কোনো ভর্তুকি দিতে হচ্ছে না।’
এলএনজি আমদানির বিকল্প নেই জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা প্রবৃদ্ধি ৮.২ শতাংশ করতে চাই। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ দিতে চাই, শিল্পায়ন করতে চাই।’
বামদের হরতাল ও তাতে বিএনপির সমর্থন নিয়ে কটাক্ষও করেন সরকার প্রধান। বলেন, ‘বাম আর ডান মিলে গেছে। এক সেঙ্গ এই তো, খুব ভালো।’
আবার বলেন, ‘বহু দিন পরে হরতাল পেলাম, পরিবেশের জন্য ভালো।’
উন্নয়ন চাইলে বর্ধিত দাম মানতে হবে : প্রধানমন্ত্রী বলেন, সেখানে দাম যেটুকু বাড়ানো হয়েছে এটা যদি না বাড়ানো হয় তাহলে দুটো পথ আছে। ‘হয় আমরা এলএনজি আমদানি কমিয়ে দিয়ে এনার্জির ক্ষেত্র সংকুচিত করে ফেলব তাতে উন্নতি হবে না। আর যদি সত্যিই অর্থনৈতিক উন্নতি চান তো এটা তো মেনে নিতেই হবে।’
‘আমরা যদি দেশের উন্নতি করতে চাই এই এনার্জি একটা বিষয়। আমরা এখন জিডিপি ৮.১ শতাংশ পর্যন্ত অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি। এর কারণ আমরা এনার্জির ক্ষেত্রে যথেষ্ট মনোযোগ দিয়েছি বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি করতে পেরেছি। বিদ্যুৎ আমদানি বাড়াতে পারলেও বাংলাদেশকে গ্যাস আমদানি করতে হচ্ছে। আর এলএনজি আমদানির জন্য খরচও বেশি পড়ছে।’
‘শিল্পায়ন করতে হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে হলে সার উৎপাদন করতে হলে অর্থনৈতিক উন্নয়ন করতে হলে ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ হতে হলে সরকারকে এলএনজি আমদানি করতেই হবে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে সরকার প্রবৃদ্ধির হার ১০ শতাংশে এ নিয়ে যাবে। এ জন্য এনার্জি লাগবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ লাগবে।
গ্যাস আমদানির ওপর সব ধরনের কর মওকুফ করে দেওয়ার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী। সেই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের গ্যাসের দামের তুলনাও তিনি তুলে ধরেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ‘অনেকে আন্দোলন করেছে, বলছেন, ভারতে কমিয়েছে। ভারতে দাম কত গ্যাসের? ভারতে গৃহস্থালির জন্য গ্যাসের দাম স্থান ভেদে ৩০ থেকে ৩৭ টাকা। বাংলাদেশ দিচ্ছে ১২.৬০ টাকায়।
‘শিল্পে বাংলাদেশে দিচ্ছে ১০.৭০ টাকায়, ভারতে দাম ৪০ থেকে ৪২ টাকা।’
‘সিএনজি আমাদের এখানে ৪৩ টাকা, ওখানে (ভারতে) ৪৪ টাকা।’ ‘বাণিজ্যিকে আমরা দিচ্ছি ২৩ টাকায়, ভারতে ৬৫ টাকা।’
‘ভারতে প্রতি বছর দুই বার গ্যাসের দাম সমন্বয় হয়। এটা তারে নীতি। ১ এপ্রিল একবার, অক্টোবরে গিয়ে আবার পর্যালোচনা। তারা সমন্বয় এর কথা বলে।’
বিএনপির ভুলে এলএনজি আমদানি : বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের একটি ভুলের কারণে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। জানান, ২০০৪-২০০৫ সালে মিয়ানমারের গ্যাসে ভারত মিয়ানমার, জাপান, চীন সবাই মিলে বিনিয়োগ করেছিল। ভারত এই গ্যাস নিতে চেয়েছিল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পাইপলাইন করে।
‘কিন্তু খালেদা জিয়া সরকার এই পাইপলাইনে গ্যাস নিতে দেয়নি। আমি থাকলে কী করতাম? পাইপ লাইনে তো গ্যাস নিতে দিতামই আমি আমার ভাগটা রেখে দিতাম, যে আমাকে দিয়ে তারপর নিতে হবে। তখন যদি মিয়ানমার থেকে পাইপ লাইনে গ্যাস আনতে পারতাম আর অর্থনৈতিক কাজে লাগাতে পারতাম তাহলে আমাদের এখন এলএনজি আমদানি না করলেও চলত। কারণ সেখানে প্রচুর গ্যাসের রিজার্ভ আছে। দেশের কতগুলি বিষয়ে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে নেতৃত্ব যদি ভুল করে বা সরকার যদি ভুল করে তার খেসারত জনগণকে দিতে হয়।’
ধর্ষণের বিরুদ্ধে পুরুষরা সোচ্চার হোন : পুরুষদেরকে ধর্ষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। বলেছেন, নির্যাতিত হয়ে নারীরাই কেন কেবল চিৎকার করবে। যারা ধর্ষণ করছে, তাদের স্বজাতিদেরও চিৎকার করতে হবে।
যারা ধর্ষণ করে, তারা ‘মানুষ না’ উল্লেখ করে এই জঘন্য কান্ডে লিপ্তদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যা যা করা দরকার, তার সবই করবে বলেও জানান সরকার প্রধান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ষণটা তো পুরুষ সমাজ করে যাচ্ছে। পুরুষ সমাজেরও একটা আওয়াজ তোলা উচিত। যারা এই ধরনের জঘন্য কাজ করে, তাদেরও কিছু করা উচিত। কেবল নারীরাই চিৎকার করে যাবে নাকি? নির্যাতিত হয়ে সব চিৎকার করবে আর নির্যাতনকারীদের স্বজাতি যারা আছে, তাদেরও এ ব্যাপারে সোচ্চার হওয়া দরকার বলে আমি মনে করি।’
গত ১ জুলাই পাঁচ দিনের সফরে চীন যান শেখ হাসিনা। দেশে ফেরেন গত ৬ জুলাই। ওই সফরে চীনের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির কথা তুলে ধরেন তিনি। তবে সংবাদ সম্মেলনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বেশিরভাগ প্রসঙ্গই ছিল দেশে ঘটে যাওয়া সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ। এর মধ্যে গুরুত্ব পায় শিশু ধর্ষণ পরিস্থিতি।
গত শুক্রবার রাতে রাজধানীর ওয়ারীতে সাত বছর বয়সি একটি শিশুকে ধর্ষণ করে মেরে ফেলার তথ্য পাওয়া গেছে। পুলিশ এরই মধ্যে প্রধান সন্দেহভাজনকে গ্রেপ্তার করেছে। এই ঘটনাটি নিত্যদিন ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক বিষয়টি সামনে নিয়ে এসেছে।
বেসরকারি সংগঠন মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের হিসাবে গত ছয় মাসে দেশে অন্তত ৪০০ শিশুকে ধর্ষণ অথবা ধর্ষণ চেষ্টার ঘটনা ঘটেছে। এগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্যের ভিত্তিতে হিসাব করা। অপ্রকাশিত ঘটনা আছে আরো বহুত।
একজন নারী সাংবাদিক জানতে চান, ‘যে পরিমাণে বেড়েছে, ধর্ষণ বন্ধে সরকারের আরো কোনো পদক্ষেপ নেয়ার ইচ্ছা আছে কি না।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ষণটা কিন্তু সব সময় সব দেশে আছে। এখন মেয়েরা সাহস করে কথাটা বলে। আমাদের দেশে এক সময় সামাজিক লজ্জার কারণে অনেকে বলতেই পারত না। এর বিরুদ্ধে যে ব্যবস্থা নেয়ার, আমরা কিন্তু নিচ্ছি। সঙ্গে সঙ্গে এদেরকে ধরা হচ্ছে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে, এবং এদের বিরুদ্ধে যথাযথ শান্তিমূলক ব্যবস্থা আমরা নিচ্ছি।’
ওয়ারী ধর্ষেণের কথা তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, ‘যারা এটা করছে, জঘন্য কাজ। আপনারা দেখেন, ওই যে শিশুটাকে যেভাবে ধর্ষণ করল, তাকে কিন্তু পুলিশ ঠিকই খুঁজে বের করেছ। তাকে গ্রেপ্তারও করা হয়েছে। সে স্বীকারও করেছে। এই ধরনের নোংরা জঘন্য কাজ যারা করছে, তারা কিন্তু মানুষ না। কাজেই এদের বিরুদ্ধে যা যা ব্যবস্থা নেয়া দরকার আমরা সবই নেব।’
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ যথেষ্ট উন্নতি করেছে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ক্রিকেট দল যথেষ্ট উন্নতি করেছে। ওয়ার্ল্ড কাপ পাওয়া একেকটা নামিদামি দলের সঙ্গে খেলা, সেটা কিন্তু কম কথা নয়। কিন্তু সেখানে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স অত্যন্ত চমৎকার ছিল। আমরা যে খেলতে পেরেছি বা এতটা যেতে পেরেছি, এটা অনেক বড় কথা। আমাদের যারা খেলোয়াড়, যেমন সাকিব আল হাসান, সে তো বিশ্বে একটা স্থান করে নিয়েছে। মোস্তাফিজ একটা স্থান করে নিয়েছে।’
বিশ্বকাপে বাংলাদেশ দলের পারফরমেন্স এক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘খেলা এমন একটা জিনিস, অনেক সময় ভাগ্যও কিন্তু লাগে। সবসময় যে একই রকম হবে, তা নয়। খেলায় সাহসী মনোভাব নিয়ে মোকাবিলা করতে পারা-আমি এটা প্রশংসা করি। এতোগুলো দল খেললো, তার মধ্যে মাত্র চারটি দল সেমিফাইনালে উঠেছে। তার মানে কি বাকিরা সবাই খারাপ খেলেছে? একেকটা জাঁদরেল জাঁদরেল দল, দীর্ঘদিন ধরে যারা খেলে খেলে অভ্যস্ত, তাদের সঙ্গে মোকাবিলা করে খেলায় ছেলেদের কনফিডেন্সের কোনও অভাব দেখিনি।’
তিনি বলেন, আমি নিজে খেলা দেখেছি। আমাদের ছেলেদের ধন্যবাদ জানাবো, তারা যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিয়েছে। তাদের ভেতর একটা আলাদা আত্মবিশ্বাস ফিরে এসেছে। ধীরে ধীরে আরও উন্নতি হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘একটা বিষয় খেয়াল রাখবেন, খেলাধুলায় আসে কারা, প্লেয়ার পাচ্ছেন কতজন। আমরা যখন প্রথম সরকারে ছিলাম আমাদের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের তখন স্পোটর্স মিনিস্টার, তখন থেকে আমরা উদ্যোগ গ্রহণ করি। ছোটবেলা থেকে ছেলেরা যাতে খেলায় অংশ নিয়ে অভ্যস্ত হয়, সে পদক্ষেপ নিয়েছি। ছোটবেলা থেকে প্র্যাকটিস করে তাদের তৈরি করেছি। এটা আস্তে আস্তে করে যাচ্ছি।’
তিনি বলেন, আমি আমার ছেলেদের কখনও নিরুৎসাহিত করি না। আমি বলি, তোমরা ভালো খেলেছো। ৩৮১ রানের টার্গেটে ৩৩৩ করেছে। এটাকে খারাপ বলবেন কি? বলবো না। আমাদের ছেলেদের কেউ খারাপ বলতে পারবে না। আমি নিজে খেলা দেখেছি, যেখানে আমাদের ছেলেরা যথেষ্ট ভালো খেলেছে। খেলোয়াড়দের কনফিডেন্স, তাদের পারফরম্যান্স বাড়াতে আমরা কাজ করছি।
রাখাইনকে বাংলাদেশের সঙ্গে নেব না : মিয়ানমারের রাখাইন প্রদেশকে বাংলাদেশের ভূখন্ডে যুক্ত করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের এক কংগ্রেসম্যানের প্রস্তাবকে প্রত্যাখ্যান করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। এ ধরনের কথা বলাকে অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ জানিয়ে তিনি বলেছেন, আমরা এই অঞ্চলে শান্তিতে বিশ্বাসী। কারও ভূখন্ড আমাদের লাগবে না।
সংবাদ সম্মেলনে মাসুদা ভাট্টি মার্কিন কংগ্রেসে বেন শারমেনের প্রস্তাবের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ওই কংগ্রেসম্যান প্রস্তাব দিয়েছেন রাখাইনের যে মানচিত্রটি আছে তা বাংলাদেশের সঙ্গে জুড়ে দেওয়া হোক। এ বিষয়ে সুদানের উদাহরণ টেনে ওই কংগ্রেসম্যান প্রশ্ন রেখেছেন, অন্যান্য জায়গায় হলে এখানে হবে না কেন? এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর মতামত জানতে চান তিনি।
এর জবাবে প্রধানমন্ত্রী জানান, আমাদের যে সীমানা আছে আমরা তাতেই খুশি। এর বাইরে আর কোনও প্রদেশ জুড়ে দেওয়ার ব্যাপার আমরা সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করি। এটা আমরা কখনোই নেবো না। মিয়ানমার তার সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে, সেখানে বাংলাদেশের সঙ্গে তাদের সীমানা জুড়ে দেওয়ার প্রসঙ্গ আসে কেন? এ ধরনের কথা বলা অত্যন্ত গর্হিত ও অন্যায় কাজ বলে আমি মনে করি।
এ সময় ওই প্রস্তাবকারী কংগ্রেসম্যানকে যুক্তরাষ্ট্রের গৃহযুদ্ধের কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যে রাখাইন প্রদেশে সার্বক্ষণিক সমস্যার সৃষ্টি হচ্ছে, সেটাকে আমরা বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্ত করবো কেন? এটা আমরা কখনোই করবো না।’
তিনি বলেন, ‘মিয়ানমার আমাদের প্রতিবেশী দেশ। সেখানে যখন এ ধরনের একটা ঘটনা ঘটেছে, সেখানকার লোকজন আমাদের কাছে আশ্রয় চেয়েছে, মানবিক কারণে আমরা তাদের আশ্রয় দিয়েছি। আশ্রয় দেওয়ার অর্থ এটা নয়, আমরা তাদের রাষ্ট্রের একটা অংশ নিয়ে চলে আসবো। এই মানসিকতা আমাদের নেই। এটা আমরা চাই না। প্রত্যেকটা দেশ তাদের সার্বভৌমত্ব নিয়ে থাকবে, এটাই আমি চাই।’
এ অঞ্চলে শান্তি কামনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশীদের সঙ্গে আমরা শান্তি চাই। যুক্তরাষ্ট্র যেখানেই সমস্যা সমাধানের মোড়লগিরি করেছে সেখানেই সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের সৃষ্টি হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তাদের রাখাইনকে জুড়ে দেওয়ার পরামর্শ না দিয়ে মিয়ানমার কীভাবে রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে, সে বিষয়ে কাজ করার তাগিদ দেন।
তিনি বলেন, এসব কথা না বলে বরং মিয়ানমার কীভাবে তাদের নাগরিকদের ফিরিয়ে নিয়ে যাবে, এই কংগ্রেসম্যানদের সে বিষয়ে কাজ করা উচিত।
চাকরির বয়স ৩৫ করা হবে না : সরকারি চাকরিতে প্রবেশে ৩৫ বছর বয়স-সীমা না করার পক্ষে বেশ কিছু যুক্তি তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘কাজ করার একটা সময় থাকে। একটা এনার্জি থাকে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন জন্ম নিবন্ধন করা হয়, বয়স লুকানো যায় না। আমরা যদি ধরেই নেই, একজন ছেলে বা মেয়ে যদি নিয়মিত পড়াশোনা করে, যদি একটু দেরিও হয়, তাহলেও ১৬ বছরে এসএসসি পাস করে। করে না? এরপর দুই বছর পর অর্থাৎ ১৮ বছর বয়সে এইসএসসি পাস করে। এরপর অনার্স ৪ বছর, মাস্টার্স ১ বছর। ২৩ বছরের মধ্যে মাস্টার্স কমপ্লিট হয়ে যায়। এরপরই সরকারি চাকরির জন্য পরীক্ষা দিতে পারে। এরপরও যদি এক-দুই বছর দেরিও হয়, তাহলেও ২৪/২৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে।’
৩৫ তম বিসিএসের ফল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের মধ্যে যারা বিসিএস পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে, তাদের পাসের হার হলো ৪০ দশমিক ৭ ভাগ, ২৫ থেকে ২৭ বছর যাদের বয়স, তাদের পাসের হার হলো ৩০ দশমিক ২৯ ভাগ। আর ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের পাসের হার হলো ১৩ দশমিক ১৭। ২৯ বছরের বেশি বয়সিদের পাসের হার ৩ দশমিক ৪৫ ভাগ।’
৩৬তম বিসিএসের ফল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের পাসের হার ৩৭ দশমিক ৪৫ ভাগ। ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সিদের পাসের হার ৩৪ দশমিক ৭৮ ভাগ। ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের পাসের হার ১৪ দশমিক ৮৯ ভাগ। ২৯ বছরের বেশি বয়সিদের পাসের হার ৩ দশমিক ২৩ ভাগ।’
৩৭তম বিএসএসের ফল প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২৩ থেকে ২৫ বছর বয়সিদের পাসের হার ৪৩ দশমিক ৬৫ ভাগ। ২৫ থেকে ২৭ বছর বয়সিদের পাসের হার ২৩ দশমিক ৩৫ ভাগ। ২৭ থেকে ২৯ বছর বয়সিদের পাসের হার ৭ দশমিক ২০ ভাগ। ২৯ বছরের বেশি বয়সিদের পাসের হার ০ দশমিক ৬১ ভাগ।’
বিসিএসের তিন পর্বের ফল বিশ্লেষণ করে শেখ হাসিনা প্রশ্ন করেন, ‘কোনটা গ্রহণ করবো এখন বলুন। আমি আর কিছু বলতে চাই না, আমি কেবল হিসাবটা দিলাম। চাকরিতে প্রবেশের বয়স ৩৫ পর্যন্ত করলে অবস্থাটা কী দাঁড়াবে, আমাকে একটু বুঝিয়ে বলুন। কারণ তখন তো বিয়েশাদি হবে, ছেলে-মেয়ে হবে, ঘর সামলাতে হবে, বউ সামলাতে হবে আর বই কিনতে হবে। তখন তো আরও করুণ অবস্থা হয়ে যাবে। কাজ করার একটা সময় থাকে। একটা এনার্জি থাকে। এই যে একটা দাবি তোলা, এখন দাবি তোলার জন্য যদি দাবি তোলা হয়, আমার কিছু বলার নেই। এই দাবি তোলার জন্য কোনও না কোনও জায়গা থেকে নিশ্চয় কোনও প্রেরণা পাচ্ছে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘৩৫ বছর বয়সে পরীক্ষা দিলে এর রেজাল্ট, ট্রেনিং, ট্রেনিং শেষ হতে যদি আরও দুই বছর লাগে, তাহলে ৩৭ বছর গেলো। ৩৭ বছরে চাকরি হলে কী হবে? চাকরির বয়স কিন্তু ২৫ বছর না হলে ফুল পেনশন পাবে না। ঠিক আছে, পেনশন না পেলো। তাহলে একটা সরকার কাদের দিয়ে চালাবো? আমরা সবসময় বলি, যারা মেধাবী, তরুণ, কর্মক্ষম তাদের দিয়েই তো আমাদের দেশের উন্নয়ন কাজ করবো। কিন্তু বয়স বাড়লে তো কাজের গতিও কমে। এটাই স্বাভাবিক ব্যাপার। যাই হোক, আমি শুধু হিসাবটাই দিলাম, দেশবাসী বিচার করুক, আপনারও বিচার করুন।’
পার্লামেন্টে বিষয়টি নিয়ে একটি প্রস্তাব এসেছিল উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘ঠিক এই বিষয়গুলো তখন বিবেচনায় নেওয়া হয়। কারণ পার্লামেন্টে কণ্ঠভোটে পাস হলে কী হবে? তারা আন্দোলন করেই যাবে? ভালো কথা আন্দোলন করুক, আমি তো আন্দোলনে বাধা দেবো না। আন্দোলন তো ভালো জিনিস। আন্দোলন করলে অন্তত রাজনীতিটা শিখবে ভালো করে। তবে যদি কারও প্ররোচনায় আন্দোলন করে থাকে, তাহলে কী হবে, সেটা বুঝতেই পারেন।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আপনারা জানেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় একসময় ছিল প্রাচ্যের অক্সফোর্ড, আমি এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের একসময় ঐতিহ্য ছিল। কিন্তু ৭৫-এ জাতির পিতাকে হত্যার পর আমরা কী দেখেছি? একটা শ্রেণি নেমে গেলো অস্ত্র হাতে। গুলি-বোমা-অস্ত্রের ঝনঝনানি ছাড়া আর কিছুই শোনা যেতো না। সেশনজট তো নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার ছিল। আমরা আসার পর ধীরে ধীরে সে অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছি।’