পদ্মা সেতুতে মানুষের মাথা লাগার ভিডিও ইউটিইউবে ॥ এক গুজবকারী সুনামগঞ্জের

44

সবুজ সিলেট ডেস্ক
পদ্মা সেতু নির্মাণে এক লাখ মানুষের মানুষের মাথায় লাগবে বলে কথিত ‘তথ্য প্রমাণ’সহ যারা ইউটিউবে ভিডিও ছাড়ছেন, তাদের একজন বলেছেন, অন্যের দেখাদেখি তিনি ভিডিও বানিয়েছেন। তার কাছে কোনো তথ্য নেই।
পুলিশ অবশ্য যারা বার্তা ছড়াচ্ছে, তাদেরকে সতর্ক করার পাশাপাশি ব্যবস্থাও নিতে যাচ্ছে। যারা ইচ্ছাকৃত মানুষকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে, তাদেরকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও সতর্কতা দেওয়া হয়েছে।
যে গুজব ছড়ানো হয়েছে, সেটি ভয়াবহ। বলা হচ্ছে, পদ্মা সেতু নির্মাণে মানুষের মাথা জোগাড় করতে ৪২টি দল দেশের বিভিন্ন এলাকায় কাজ করছে। আর এরই মধ্যে কিছু মানুষ ধরাও পড়েছে।
ফেসবুক, ইউটিউব, ইমোতে এই গুজব এতটাই বিস্তার লাভ করেছে যে সরকারকে রীতিমতো বিবৃতি দিয়ে জানাতে হয়েছে যে, এই তথ্যের কোনো ভিত্তি নেই। তারপরেও গুজব থেমে নেই। দেশের বিভিন্ন এলাকায় ‘মাথা সংগ্রহের চেষ্টায়’ থাকার সন্দেহে পেটানো হচ্ছে মানুষকে। কয়েকজনকে গণপিটুনি দিয়ে হত্যাও করা হয়েছে। রাজধানীর মোহাম্মদপুর বেড়িবাঁধে গত দুই দিনে দুজনের মৃত্যুর ঘটনাও ঘটেছে গণপিটুনিতে।
যারা কথিত প্রমাণসহ ভিডিও ছাড়ছেন, তাদের একজন আরজে সোহাগ। তিনি ইউটিউবে ‘মাই স্পোর্টস টিভি’ নামে একটি চ্যানেল চালান। ‘পদ্মা সেতুর গলাকাটা লাশ প্রমাণসহ’ শিরোনামে পাঁচ মিনিট ৪৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিওচিত্র তিনি ছেড়েছেন। এর পরিচালনা ও উপস্থাপনা সোহাগ নিজেই করেছেন।
ভিডিওর শুরুতেই বলা হয়, ‘পদ্মা সেতু নির্মাণের শুরুতে পাঁচ থেকে সাতজন মানুষের মাথা পানিতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছিল।’
বহু চেষ্টা করে সোহাগের সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়েছে। তার বাড়ি সুনামগঞ্জ। সেতু করতে মানুষের মাথা লাগে-এমন উদ্ভট তথ্য কীভাবে কোথায় পেলেন-এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ‘ইউটিউবে এমন অনেক ভিডিও আছে। আমরা একজন আরেকজনের দেখাদেখি ভিডিও করি। অনেকেই বলছে পাঁচটা, ১০টা মাথা পাওয়া গেছে।’
কেবল ‘শখের বসে’ এই চ্যানেলটি চালানোর দাবি করেছেন এই ইউটিউবার। বলেছেন, সমসায়য়িক বিষয় নিয়ে তারা আলোচনা করে থাকেন।
ইউটিউবে এমন আরও অনেক চ্যানেলেই এ ধরনের ভিডিওচিত্র প্রকাশ করতে দেখা গেছে। ‘এম কে অফিসিয়াল’ নামে একটি চ্যানেলে ভিডিওর শিরোনামে দেওয়া হয়েছে, ‘মাথা কেটে নিচ্ছে নিরীহ মানুষের। পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য মাথা লাগবেই।’
‘বিডি টিচ নিউজ’ নামের একটি চ্যানেলে প্রকাশ করা ভিডিওর শিরোনাম ‘পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা লাগবে, সবাই সাবধান।’
‘বিডিনিউজ টুডে’ নামের আরও একটি চ্যানেলে শিরোনাম রাখা হয়েছে ‘মেহেরপুরে তিন মহিলা পুলিশের হাতে। মাথা লাগবে পদ্মা সেতুতে। সবাই সাবধান।’
অনুসন্ধানে এক ঘণ্টারও কম সময়ে অর্ধশতাধিক চ্যানেলে এই ধরনের গুজব ছড়ানোর প্রমাণ পাওয়া গেছে, যেখানে ভিডিওর সংখ্যা কয়েকশ। যার প্রতিটি ভিডিও কমপক্ষে এক লাখ মানুষ দেখেছে।
একই ধরনের তথ্য ছড়িয়ে দেয়া হয়েছে ফেসবুকের মাধ্যমে। ম্যাসেঞ্জারে একটি খুদে বার্তার মাধ্যমে প্রথমে এই গুজব ছড়ানো হয়। বার্তাটি ম্যাসেঞ্জারের মাধ্যমে খুব দ্রুতই পৌঁছে যায় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মাঝে। আবার কেউ কেউ এই বার্তাটিকে পোস্ট করেছেন নিজেদের ফেসবুক আইডিতে। সেখান থেকে মুখে মুখে প্রচার হতে শুরু করে পদ্মা সেতুর জন্য মানুষের মাথা প্রয়োজন।
রাজধানীর নিম্নাঞ্চলগুলো এবিষয় নিয়ে আলোচনা সমালোচনা বেশি হচ্ছে। আলোচনার কেন্দ্র হয়ে উঠেছে পদ্মা সেতু প্রসঙ্গ। এসব আলোচনা বেশি হচ্ছে চায়ের দোকানে। রাজধানীসহ সারা দেশের স্বল্পশিক্ষিত ও নিরক্ষর মানুষের মধ্যে এর প্রভাব বেশি পড়েছে বলে জানা গেছে।
বিষয়টি নিয়ে ‘উই আর বাংলাদেশ-ওয়াব’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপের এডমিন আলী আকবরের সাথে যোগযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘ফেসবুক ব্যবহারকারীদের মধ্যে সচেতনতার তীব্র অভাব রয়েছে। কোনো একটি বিষয় নিশ্চিত না হয়েই ছড়িয়ে দেয়ার মানসিকতা থেকে প্রায়ই এধরনের গুজবের জন্ম নিচ্ছে।’
‘ফেসবুক ব্যবহারকারীদের একটা অংশ ফেসবুকের ব্যবহারটা জানেন না। তারা একটা বিষয় পেলেই তা ছড়িয়ে দেয়। যাচাই করার প্রয়োজন বোধ করে না। এ বিষয়টি নিয়ে সচেতন হওয়া উচিত। সাইবার ইউনিটের মাধ্যমে সচেতনতা আরও বাড়ালে এ ধরনের জিনিস কমে আসবে। যারা এগুলো ছড়ায় তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া উচিত। কয়েকজন বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে এটা কমে আসবে। অনেকেই নিজেকে প্রচার করতে, কেউ কেউ নিজের স্বার্থে এগুলো করছে।’
ঢাকা মহানগর পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিট এরই মধ্যে এই গুজবের বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে। এ ধরনের গুজব দ-নীয় অপরাধ উল্লেখ করে গত মঙ্গলবার সাইবার ক্রাইমের ভ্যারিফাইড ফেসবুক পেজে একটি বার্তা দিয়েছে পুলিশের এ সংস্থাটি। বার্তায় বলা হয়, ‘কিছু ব্যক্তিকে আমরা শনাক্ত করতে পেরেছি। এছাড়াও পুলিশ হেডকোয়ার্টার্স, সিআইডি, পিবিআইসহ অন্যান্য সংস্থাও এদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করছে। সুতরাং এমন অপপ্রচার থেকে বিরত থাকুন এবং এ ধরনের গুজবে বিভ্রান্ত না হয়ে কঠোরভাবে প্রতিবাদ করুন। আপনার নিকটস্থ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে তথ্য দিয়ে সাহায্য করুন, দেশ গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখুন।’
সাইবার ক্রাইম ইউনিটের উপকমিশনার আলীমুজ্জামান বলেন, ‘আমরা আমাদের ফেসবুক পেজে এ সংক্রান্ত একটি বার্তা দিয়েছি। সেই সাথে যারা এ ধরনের গুজব ছড়াচ্ছে তাদের শনাক্ত করতে কাজ করছি।’