ব্যতিক্রমধর্মী খবর

52

ড. আবদুল লতিফ মাসুম
কুকুর যখন মানুষকে কামড়ায় তখন খবর হয় না। খবর হয় তখনই যখন মানুষ কুকুরকে কামড়ায়। অবশ্য এ ধরনের খবর আজো পাওয়া যায়নি। এটি একটি রূপক অর্থে ব্যবহৃত উপমা মাত্র। প্রতিদিন সংবাদপত্রে প্রকাশিত হাজারো সংবাদের মধ্যে ব্যতিক্রমধর্মী বা আজগুবি বা রহস্যঘন কোনো খবর প্রকাশিত হলে তা পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নেয়। তেমনি একটি ব্যতিক্রমধর্মী খবরে আটকে গেছে আমার চোখ। গত রোববার প্রথম আলোর তৃতীয় পৃষ্ঠায় একটি সংবাদের শিরোনাম ছিল, ‘ছাত্রলীগ সভাপতিকে গ্রেপ্তারের দাবিতে আ.লীগের ঘেরাও’। গ্রামদেশে এ ধরনের ঘটনায় লোকেরা নানা ধরনের বাগধারা ব্যবহার করে। যেমন, ‘মাছে কঞ্চি তাড়ায়’। মানুষ কঞ্চি দিয়ে মাছ ধরে। দৈবাৎ যদি মাছ কঞ্চিকে তাড়ায় তাহলে নিশ্চয়ই সেটি একটি খবর। আরো একটি প্রবাদবাক্য এ রকম ‘বারো হাত বাকুড়ের তেরো হাত বিচি’। বাকুড় একটি তরকারি। সে তরকারির দৈর্ঘ্য যদি হয় বারো হাত তাহলে বিচির পরিমাণ তেরো হাত হওয়ার কথা নয়। যদি হয় তাহলে অসম্ভব কিছুকেই বোঝানো হয়। আরো মজার মজার দু-একটি প্রচলিত কথা এ রকমÑ ‘তাঐয়ের চেয়ে পুত্রা ভারী’ অথবা ‘ভাতের চেয়ে ডাল উচা’ ইত্যাদি। এসব প্রচলিত বাগধারা, প্রবাদবাক্য বা গ্রামীণ শব্দাবলি উল্লেখ করলাম আসলেই একটি বিপরীতধর্মী এবং ব্যতিক্রমধর্মী খবর পরিবেশনের জন্য।
খবরটির বিস্তারিত বিবরণ দেয়া যাক। একটি দৈনিকের স্থানীয় প্রতিনিধি প্রেরিত খবরে বলা হয়- নীলফামারীর সৈয়দপুর ছাত্রলীগের সভাপতি নজির হোসেনকে গ্রেফতারের দাবিতে থানা ঘেরাও করেছেন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা। শনিবার দুপুরে বিক্ষোভ মিছিল করে সৈয়দপুর থানার সামনে জড়ো হন উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। এ সময় ছাত্রলীগ সভাপতির বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি ও মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে অভিযোগ দেয়া হয়। এর আগে শহরের শহীদ তুলসীরাম সড়কে অবস্থিত আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে উপজেলা ও পৌর আওয়ামী লীগ। এতে লিখিত বক্তব্য পড়ে শোনান সৈয়দপুর পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। তিনি অভিযোগ করেন, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নজির হোসেনের ব্যবহার ভালো নয়। ছাত্রলীগ কার্যালয়ে এসে মাদক ব্যবসা করেন। তিনি নিজেও একজন মাদকসেবী। এ ছাড়া সাংগঠনিক প্রভাব খাটিয়ে চাঁদাবাজি করছেন। এসব বিষয় নিয়ে কেন্দ্র ও ছাত্রলীগের জেলা কমিটিতে লিখিত অভিযোগ করেও ফল পাওয়া যায়নি।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘আমরা ব্যক্তিগতভাবে নজিরকে সতর্ক করেছি, কিন্তু সে তা আমলে নেয়নি। এ জন্য আমরা ছাত্রলীগ সভাপতি নজির হোসেনের অপসারণ চাই।’ সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন- সৈয়দপুর উপজেলা সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন, পৌর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি রফিকুল ইসলাম, সহসভাপতি ইদ্রিস আলী, সৈয়দপুর উপজেলা পরিষদের সংরক্ষিত আসনের ভাইস চেয়ারম্যান সানজিদা বেগমসহ আওয়ামী লীগ ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের নেতারা। সংবাদ সম্মেলন শেষে নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন এবং কিছুক্ষণের জন্য থানা ঘেরাও করে রাখেন। অভিযোগ প্রসঙ্গে উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি নজির হোসেন বলেন, তার বিরুদ্ধে মাদক ও চাঁদাবাজির অভিযোগ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। এটাকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা বলে উল্লেখ করেন। সৈয়দপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন এবং তদন্ত করে ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে নিশ্চিত করেন।

ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে নীলফামারীর বিক্ষোভ একমাত্র ঘটনা নয়; ঢাকা শহরের এক রকম উপকণ্ঠ কাপাসিয়ায় এক কেন্দ্রীয় ছাত্রনেতার বিরুদ্ধে বিক্ষোভের ঘটনা ঘটেছে। দৈনিক যুগান্তরে ২২ জুন ২০১৯ প্রকাশিত খবরটি এ রকম : ‘বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ ও তার পরিবার সম্পর্কে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য করায় কাপাসিয়ায় উত্তপ্ত পরিস্থিতি বিরাজ করছে। দুই দিন ধরে এর প্রতিবাদে আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ অব্যাহত রেখেছেন। সম্প্রতি ভাগ্নে সৌরভ অপহৃত হওয়ার পর ফেসবুকে সোহেল তাজের লাইভ নিয়ে ছাত্রলীগের সাবেক কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক নাজমুল আলম সিদ্দিকী তাজউদ্দীন পরিবারের বিরুদ্ধে ফেসবুকে আপত্তিকর মন্তব্য করেন। এ নিয়ে শনিবার বিকেলেও বিক্ষোভ মিছিল করে উপজেলা আওয়ামী লীগ। দলীয় কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিলটি বের হয়ে উপজেলা সদরের প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে। পরে পুরাতন বাসস্ট্যান্ড মোড়ে উপজেলা যুবলীগ সভাপতি মাহবুব উদ্দিন আহমেদ সেলিমের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন প্রধানের পরিচালনায় প্রতিবাদ সভায় বক্তব্য রাখেন- উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট আমানত হোসেন খান, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান প্রধান, কাপাসিয়া বাজার ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বদু, উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি অদুধুল কাউয়ুম ভূঁইয়া, সাধারণ সম্পাদক রাসেদুল আলম সৈকত, সেচ্ছাসেবক লীগ সভাপতি সৈয়দ মজিবুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক আবদুর রউফ দরজী, সাংগঠনিক সম্পাদক পারভেজ রানা, কাপাসিয়া কলেজ শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুল হাসান মামুন প্রমুখ। প্রতিবাদ সভায় নেতারা বলেন, বাংলাদেশ ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছাত্ররাজনীতির কুলাঙ্গার নাজমুল আলম সিদ্দিকী স্বাধীনতার কারিগর বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী কাপাসিয়ার সূর্যসন্তান বঙ্গতাজ তাজউদ্দীন আহমদ ও তার সহধর্মিণী আওয়ামী লীগের দুঃসময়ের কাণ্ডারি সৈয়দা জোহরা তাজউদ্দীন, ছোট ভাই সাবেক মন্ত্রী আফসার উদ্দীন আহমদ, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ ও কাপাসিয়ার বর্তমান সংসদ সদস্য সিমিন হোসেন রিমির বিরুদ্ধে ফেসবুকে যে আপত্তিকর মন্তব্য করেছে তা ক্ষমার অযোগ্য। এ মন্তব্য করে কাপাসিয়াসহ দেশব্যাপী মানুষের মনে চরম আঘাত দিয়েছে। নেতারা তার এ মন্তব্যের কারণে নাজমুলের গ্রেফতার ও শাস্তি দাবি করেছেন। এর আগে গত শুক্রবার রাতে কাপাসিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগের উদ্যোগে প্রতিবাদ সভা, বিক্ষোভ মিছিল ও কুশপুত্তলিকা দাহ করা হয়।’
প্রকাশিত প্রথম খবরে স্থানীয় পর্যায়ের ছাত্রলীগ নেতার বিরুদ্ধে ওই এলাকারই আওয়ামী লীগের সরাসরি দ্বন্দ্বের খবর প্রকাশিত হলো। দ্বিতীয় খবরটিতে আওয়ামী লীগের নীতিগত সিদ্ধান্তে ছাত্রলীগ নেতার ঔদ্ধত্যপূর্ণ মন্তব্য দৃশ্যমান হলো। আওয়ামী লীগ রাজনৈতিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে ধারণ করে। নিরপেক্ষ বুদ্ধিজীবীরা মনে করেন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে তাজউদ্দীন সম্পর্কে প্রচ্ছন্ন বিরোধিতা থাকলেও এমনভাবে কখনো প্রকাশিত হয়নি। তাজউদ্দীন জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু ও আওয়ামী লীগের প্রতি বিশ^স্ত ছিলেন। আওয়ামী শাসনের শেষ দিকে বাকশাল গঠনের আগে তাজউদ্দীন মন্ত্রিপরিষদ থেকে বিদায় হলেও তার আনুগত্য নিয়ে কখনো প্রশ্ন উত্থাপিত হয়নি। অথচ এখন ছাত্রলীগের নাম নেহাৎ এক নেতা এই মহান নেতা সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য করার ধৃষ্টতা দেখাল।
ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন। সে ক্ষেত্রে ছাত্রলীগের অধস্তনতা থাকার কথা আওয়ামী লীগের কাছে। অথচ বিষয়টি উল্টো হলো। আওয়ামী লীগকে নামতে হয়েছে ছাত্রলীগের বিরুদ্ধে। বিক্ষোভের মাধ্যমে ছাত্রলীগের কাছে আওয়ামী লীগের অসহায়ত্ব প্রমাণিত হয়েছে। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ কোনোক্রমেই যখন ছাত্রলীগ নেতাকে বাগে আনতে পারেননি, কেবল তখনই গ্রেফতারের দাবিতে থানা ঘেরাও করেছেন।
আসলে এটি নীলফামারীর সৈয়দপুর আওয়ামী লীগের একক সমস্যা নয়। এ সমস্যা সর্বত্র। সারা দেশে প্রায় সব আওয়ামী শাখা-প্রশাখায় একই ঘটনা দৃশ্যমান। মনীষী অ্যারিস্টটল বলেছেন, সমাজের চেহারা ছোট আয়না দিয়ে যেমন দেখা যায়, বড় আয়না দিয়েও দেখা যায়। নীলফামারী, গাইবান্ধা, সৈয়দপুর, আশুলিয়া শিমুলিয়া অর্থাৎ জেলা-উপজেলা এমনকি গ্রামপর্যায়েও তাদের সুনাম-সুখ্যাতির ছড়াছড়ি। এ কথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, রাজধানী সুরক্ষিত! রাজধানীতে বরং তাদের কার্যকলাপ আরো দৃশ্যমান ও ব্যাপক। তাজউদ্দীন আহমদ সম্পর্কে ছাত্রলীগ নেতার মন্তব্য সেই ব্যাপকতার প্রমাণ দেয়। তাদের কার্যকলাপে ক্ষিপ্ত হয়ে আওয়ামী লীগের নেতা-পাতিনেতারা আস্ফালন কম করেননি। আপসকামী নেতারা বিপুল বিনয়ের সাথে উপদেশ বর্ষণ করেই চলেছেন। কখনো কখনো তারা ছাত্রলীগের হাতে খাতা-বই-কলম তুলে দিয়ে তাদের শেখাতে চাচ্ছেন। এমনকি ছাত্রলীগের প্রধান পৃষ্ঠপোষক একবার গোসসা করেও তাদের চরিত্রের পরিবর্তন ঘটাতে পারেননি। কারণ কথা ও কাজের মধ্যে মিল না থাকলে সে কথায় ধার থাকে না। তাদের বিরুদ্ধে কথা বলার শক্তি কারো নেই। এ দেশের একজন আধনা মানুষও বোঝে, ক্ষমতার প্রয়োজনে সোনার ছেলেদের কত কদর। যে কোয়ার্সিভ বা শক্তি প্রয়োগের কৌশল দিয়ে তারা ক্ষমতায় আছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তাদের অফিসিয়াল বাহিনী হলেও আসল বাহিনীর ধারক-বাহক হলো এসব সোনার ছেলে। সুতরাং তাদের কৃত হত্যা, গুম, রাহাজানি, সন্ত্রাস এবং অভ্যন্তরীণ রক্তারক্তির বিরুদ্ধে তাদের কিছু বলার নেই। সারা দেশে অপরাধের যে সংস্কৃতি সমাজকে দারুণভাবে কলুষিত করছে, তার বেশির ভাগের দায় শিক্ষার্থী অনুগামীদের। ধর্ষণের এত অভিযোগ সম্ভবত আর কোনো সময়ে এভাবে উত্থাপিত হয়নি। অতীতের সেঞ্চুরি বা ইডেনের বা অন্য কোনো ঘটনার রেফারেন্স না দিলাম। ২৭ জুলাই প্রথম আলোতে প্রকাশিত সংবাদটি এ রকম : পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলা ছাত্রলীগের যুগ্ম আহ্বায়কের বিরুদ্ধে এক নারীকে তার ঘরে ঢুকে ধর্ষণ করার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় ওই নারী তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন। ছাত্রলীগের সুনাম(!) এতই সর্বগ্রাসী যে, তাদের কবল থেকে মানুষের জীবন, সম্পদ ও সম্মান রক্ষা করা বড় কঠিন হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন সংবাদপত্রে তাদের কীর্তিকলাপের যে প্রতিবেদন ছাপা হচ্ছে, তা সম্ভবত কর্তাব্যক্তিদের নজরে আসে না। নজরে এলেও মূলত তাদের করার কিছু নেই। তারা এখন এত বড় দেওদানব যে, ক্ষমতার অথবা ক্ষমতার বাইরের মানুষ তাদের জাদুর কলসিতে আর ভরতে পারছে না। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকের অনেকেই মনে করেন, রাজধানীর অবস্থা নীলফামারীর চেয়ে ভালো কিছু নয়। কেন্দ্রীয় নেতারা অনেকেই তাদের কাছে অসহায় বোধ করেন। গত সপ্তাহে প্রকাশিত এক খবরে জানা যায়, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী এবং পাতিনেতারা ছাত্রলীগের দুই নেতার আগমন অপেক্ষায় দুই ঘণ্টা সময় অতিবাহিত করেছেন। অনুষ্ঠান শুরু করতে পারেনি।
সোনার ছেলেদের দিয়ে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে দেশের শিক্ষাঙ্গন। এমন কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুঁজে পাওয়া দুরূহ, যেখানে তাদের পদভারে শিক্ষাঙ্গন কলুষিত হয়নি। বিষয়টির পরিসংখ্যান দেয়ার অপেক্ষা রাখে না। দেশের যেকোনো মানুষ বিশেষ করে শিক্ষার্থীরা এর সাক্ষী। তারা কোনো প্রতিষ্ঠানকে স্বাভাবিকভাবে চলতে দেয়নি, দিচ্ছে না। একক অবস্থানের মাধ্যমে সরকারের মতোই তারা শিক্ষাঙ্গনে স্বৈরাচার কায়েম করেছে। সাধারণ ছাত্ররা তাদের কাছে এতটাই অসহায় যে, তারা মনে মনে তাদের বিপক্ষে অবস্থান করলেও তাদের বিরুদ্ধে ভোট দেয়ার সাহস রাখে না। নিপীড়ন, নির্যাতন, চাঁদাবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য এবং নিত্যদিন প্রশাসনের স্বাভাবিক কাজকর্মে তারা বেপরোয়া হস্তক্ষেপ করেই চলেছে। এমনকি নকল করতে না দেয়ার অপরাধে তারা শিক্ষককে অপদস্থ করছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা তাদের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছেন। অবশ্য এমন উপাচার্জও আছেন, যারা প্রকাশ্যে চাকরিতে ছাত্রলীগের অধিকারের স্বীকৃতি দিচ্ছেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের যেকোনো নিয়োগ এমনকি শিক্ষক নিয়োগও তারা বাধাগ্রস্ত করছে। উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে তাদের অংশীদারিত্বের খতিয়ান সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছে।
এরা শিক্ষাঙ্গন, সমাজ ও রাজনীতি সর্বত্র মনস্টার বা দেওদানবে পরিণত হয়েছে। স্বাভাবিক ছাত্ররাজনীতিকে এরা অস্বাভাবিক পথে প্রবাহিত করে ছাত্ররাজনীতির মূলে কুঠারাঘাত করেছে। সে কারণে গরিষ্ঠ জনগণ ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি নীরবে-নিভৃতে লালন করছে। মাথাব্যথা করলে, মাথা কেটে দিয়ে যেমন তার সুরাহা হয় না, তেমনি ছাত্ররাজনীতি নিষিদ্ধ করলেই যে সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে তা বিশ্বাস করা কঠিন। নিষিদ্ধকরণ হবে মৌলিক মানবাধিকার-বিরোধী। ছাত্ররাজনীতির সেই গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব আমাদের সবার আর মনস্টারকে মোকাবেলা করার দায়িত্ব সরকারের। মনস্টার কাউকে রেহাই দেয় না। যদি ক্ষমতাসীনেরা এই অপ্রিয় সত্য অনুধাবনে ব্যর্থ হন, তাহলে মনস্টার তাদেরও খেয়ে ফেলবে।
লেখক : অধ্যাপক, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়