সিন্ডিকের কারসাজিতে মূল্যহীন পশুর চামড়া

25

নুরুল হক শিপু
বাংলাদেশে রয়েছে চামড়ার বিশাল বাজার। এই চামড়া শিল্পের বাজারে বড় জোগান দিয়ে থাকে কুরবানির পশুর চামড়া। বিগত সময়ে চামড়ার ব্যাপক চাহিদা থাকলেও গত কয়েক বছর থেকে মূল্যহীন হয়ে উঠছে কুরবানির পশুর চামড়া। কুরবানির পশুর চামড়া কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার ছাত্ররা সংগ্রহ করে। প্রতি বছর এই চামড়া বিক্রি করে মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর ব্যয় বহন করা হয়। এবার চামড়ার আড়তদার ও মৌসুমি ব্যবসায়ীদের ঠেলাঠেলিতে চামড়া হয়ে পড়ে মূল্যহীন। তাদের কারসাজিতে দেশের অর্থনীতি এবং এতিম-দুস্থরা মারাত্মক ক্ষতির মুখোমুখি হয়েছে। অনেক জায়গায় চামড়া মাটিতে পুতে ফেলা হয়েছে আবার অনেক জায়গায় নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। মূল্যের এই বিপর্যয়ের কারণে চামড়া শিল্পে মারাত্মক ধসের আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সিসিকের ময়লার স্তূপে ২০ ট্রাক চামড়া, ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জে নদীতে চামড়া ফেলে প্রতিবাদ, জগন্নাথপুরে পুঁতে ফেলা হয় ৪০ লাখ টাকার চামড়া, ট্রাকভর্তি চামড়া ফেলে পালালেন ব্যবসায়ী, রাস্তায়ও পচছে চামড়া

২০ ট্রাক চামড়া সিসিকের ময়লার স্তূপে : কুরবানির গরুর চামড়া বিক্রি করতে না পেরে রাস্তায় ফেলে দিয়েছেন সিলেট নগরীর কুরবানিদাতারা। পরে নগরীর বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া ময়লার সাথে সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্পটে পুঁতে ফেলেছে সিলেট সিটি কর্পোরেশন (সিসিক)।
এদিকে এতিম ছাত্রদের সাহায্যার্থে দিনব্যাপী বাড়ি বাড়ি হেঁটে চামড়া সংগ্রহ করে বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত তা বিক্রি করতে না পেরে রাতে ওগুলো নগরীর আম্বরখানায় একটি রাস্তায় ফেলে প্রতিবাদ জানিয়েছে একটি মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। পরে ওগুলো ময়লার সাথে তুলে নেয় (সিসিক)।
সবাই এরকম প্রতিবাদ না জানালেও অবিক্রীত চামড়া নিয়ে বিপাকে পড়েন অনেকে। সকালে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে চামড়ার স্তূপ দেখা গেছে। পরে এসব চামড়া সংগ্রহ করে ডাম্পিং স্পটে পুঁতে ফেলেছে সিসিক।
শুধু নগরী কিংবা নগরীর মাদ্রাসাই নয়, সিলেট জেলার বেশির ভাগ এলাকাতেই চামড়া বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। ফলে কোনো উপায় না দেখে অবিক্রীত চামড়াগুলো পুঁতে ফেলেন মানুষ।
এ ব্যাপারে ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে অস্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কমিটির সদস্য রুহুল আমিন বলেন, কত ট্রাক চামড়া আবর্জনার সাথে ফেলা হয়েছে তার নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা আমার জানা নেই। তবে বিপুল সংখ্যক কুরবানির চামড়া ডাম্পিং করা হয়েছে।
আর সিলেট সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমান বলেন, নগরী থেকে প্রায় ২০ ট্রাক চামড়া ডাম্পিং করা হয়েছে। সকালে নগরীর বিভিন্ন মোড়ে মোড়ে এসব চামড়া রাখা ছিল। পরে সেগুলো ডাম্পিং করা হয়। তবে কেন এবার এতো চামড়া অবিক্রীত রয়ে গেল, তা বোধগম্য নয়। এটা আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র হতে পারে।
নদীতে চামড়া ফেলে প্রতিবাদ : ওসমানীনগর প্রতিনিধি জানান, কুরবানির পশুর চামড়া কেনার লোক না পেয়ে সিলেটের ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জ উপজেলার কুরবানির পশুর চামড়া নদীতে ফেলে প্রতিবাদ করেছেন দুই উপজেলার মাদ্রাসার ছাত্র, শিক্ষক ও ব্যবসায়ীরা। একদিন-একরাত অপেক্ষা করে কোনো টেনারি বা পাইকারি ক্রেতা না পেয়ে তারা চামড়া নদীতে ফেলে দেন।
ওসমানীনগর ও বালাগঞ্জের মাদ্রাসার ছাত্র-শিক্ষকরা ঈদের সারাদিন কুরবানির চামড়া সংগ্রহ করেন। আবার কিছু লোক লাভের আশায় বাড়ি বাড়ি গিয়ে চামড়া ক্রয় করেন। সোমবার বিকেলে গোয়ালাবাজার, শেরপুর, দয়ামীর তাজপুর ও বালাগঞ্জ বাজারে চামড়া নিয়ে গেলে দেখেন সেখানে কোনো পাইকার আসেনি। দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করে তারা ক্ষোভে কুশিয়ারা নদী, কালাসার হাওরসহ বিভিন্ন স্থানে চামড়াগুলো ফেলে চলে যান।
বালাগঞ্জ উপজেলার বালাগঞ্জ ফিরোজাবাগ মাদ্রাসার ১১৯টি, বালাগঞ্জ মহিলা মাদ্রাসার ১০০টি, তিলকচানপুর আদিত্যপুর ইসলামিয়া আলিম মাদ্রাসার ৩৪টি, নতুন সুনামপুর মাদ্রাসার ৭০টি ও দক্ষিণ গৌরীপুর মাদ্রাসার ২৭টি চামড়া নদীতে ফেলে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে।
এদিকে, ওসমানীনগর উপজেলায়ও চামড়া নদীতে ফেলে দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। উপজেলার ব্যবসায়িক প্রাণকেন্দ্র গোয়ালাবাজার। কুরবানির ঈদের দিন বিকেলে সহস্রাধিক চামড়া নিয়ে এলেও সারারাত পর্যন্ত অপেক্ষা করে দেখা মেলেনি কোনো ক্রেতার। বাধ্য হয়ে তারা চামড়া ফেলে যান।
অন্যদিকে, চামড়া পচে সর্বত্র দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। চামড়া কেনার লোক না আসায় দুই উপজেলার মাদ্রারাসার এতিম গরিব শিক্ষার্থীদের অপূরণীয় ক্ষতি হবে বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ। আর খুচরা ব্যবসায়ীরাও ক্ষতির শিকার হয়েছেন।
ফিরোজাবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা আব্দুল মালিক ও মহিলা মাদ্রাসার শিক্ষা সচিব মাওলানা আব্দুল বাতিন বলেন, কুরবানির পশুর চামড়া মাদ্রাসার রাস্তায় রাখা হয়েছে। কোনো ক্রেতা নেই। এলাকাবাসী বাসা-বাড়ি থেকে বের হতে পারছে না দুর্গন্ধে। এমতাবস্থায় চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলার জন্য পর্যাপ্ত জায়গাও নেই।
এ ব্যাপারে বালাগঞ্জ সদর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন মো. আব্দুল মুনিম বলেন, মাদ্রাসার শিক্ষকরা জানালে আমি বিষয়টি ইউএনওকে অবগত করেছি।
বালাগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. নাজমুল সাকিব বলেন, বিষয়টি আমি ব্যক্তিগতভাবে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবগত করেছি।
জগন্নাথপুরে পুঁতে ফেলা হয় ৪০ লাখ টাকার চামড়া : প্রতিনিধি জানান, উপজেলায় কুরবানির পশুর চামড়ার ক্রেতা ও মূল্য না থাকায় প্রায় ৪০ লাখ টাকার চামড়া মাটিতে পুতে ফেলাসহ নদীতে ভাসিয়ে দেয়া হয়েছে। কুরবানির পশুর চামড়ার মূল্য কম থাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। অনেকে আবার ঝামেলা এড়াতে ৫০ থেকে ১০০ টাকায় গরুর এবং ১০ থেকে ২০ টাকায় খাশির চামড়া বিক্রি করেছেন। অনেক এলাকায় লোকজন ক্রেতা না পাওয়ায় মাটিতে পুতে ফেলা ছাড়াও নদীতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর সাহারপাড়া ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামের সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসেনিয়া দারুল হাদিস মাদ্রাসায় বিভিন্নজনের দান করা ৮০০টি গরুর চামড়া ও ৯৫টি ছাগল ও ভেড়ার চামড়া বিক্রি করতে না পারায় মাদ্রাসা ক্যাম্পাসের পুকুর পারে পুঁতে ফেলেন। মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানান, প্রতিবছরের মতো এবারও পবিত্র ঈদুল আজহার চামড়া সংগ্রহ করেছিল এই প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা।
গতকাল বুধবার কোনো ব্যবসায়ী না আসায় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন চামড়া ব্যবসায়ীর সঙ্গে চামড়া বিক্রির জন্য যোগাযোগ করেন। তাদের মধ্যে দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার পাগলা বাজার এলাকার একজন ব্যবসায়ী প্রতিটি গরুর চামড়া ১২০ টাকা দাম নির্ধারণ করে পরে চামড়া কিনতে না আসেনি। ফলে চামড়ায় দুর্গন্ধ মাদ্রাসা ও আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ছিল। এ কারণে সবার মতামত নিয়ে চামড়াগুলো মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দেয়া হয়।
এ ব্যাপারে মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হাফেজ মাওলানা সৈয়দ ফখরুল ইসলাম বলেন, চামড়াগুলো বিক্রির জন্য অনেক চেষ্টা করা হয়েছে। কিন্তু কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। এত চামড়া প্রক্রিয়াজাত করতে ৫০ হাজার টাকার লবণের প্রয়োজন। কিন্তু লবণ সংগ্রহ করলেই যে চামড়া বিক্রি করা যাবে তারও কোনো নিশ্চয়তা না থাকায় চামড়াগুলো মাটিতে পুঁতে ফেলা হয়েছে।
রাস্তায় পচছে চামড়া : কুরবানির পশুর চামড়া রাস্তায় পচে নষ্ট হচ্ছে। বিনামূল্যেও নেয়নি কেউ। এ নিয়ে বিপাকে পড়েন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। সিন্ডিকেট করে ফায়দা লুটছেন পোস্তার আড়তদার ও ট্যানারি মালিকরা।
রাজধানীর পুরান ঢাকার লালবাগের পোস্তার আড়তদাররা বলছেন, ৯০ ভাগ ট্যানারির মালিক পোস্তার পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি। তাই নগদ টাকার সংকটে চামড়া কিনতে পারছেন না।
অন্যদিকে ট্যানারির মালিকরা বলছেন, ঢালাওভাবে অভিযোগ করা ঠিক নয়। কয়েকটি বাদে বেশিরভাগ ট্যানারি পাওনা অর্থ পরিশোধ করেছে।
আড়তদার ও ট্যানারি মালিকদের পাল্টাপাল্টি অভিযোগে লোকসানে পড়েছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। বঞ্চিত হচ্ছে গরিব, এতিমরা।
কাঁচা চামড়ার খুচরা ব্যবসায়ী, আড়তদার ও ট্যানারির মালিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গতকালের তুলনায় আজ চামড়ার দাম আরও কম। আড়তদাররা চামড়া কিনতে চাচ্ছেন না। যত বড় গরুই হোক সর্বোচ্চ ২০০ থেকে ৩০০ টাকার বেশি দাম বলছে না।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে লালবাগ পোস্তায় ‘বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের (বিএইচএসএমএ)’ সেক্রেটারি মো. টিপু সুলতান বলেন, টাকা নেই। ট্যানারি মালিকরা আমাদের পাওনা টাকা পরিশোধ করেনি। টাকা আটকে রেখেছে। টাকা না থাকলে আমরা চামড়া কিনব কীভাবে? তাই দাম পড়ে গেছে। আজ চামড়া দেড় থেকে ২০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে।
তিনি বলেন, ট্যানারিগুলো আমাদের পাওনা আটকে রেখেছে। আবার ব্যাংক থেকেও ঋণ পাচ্ছে। আমরা তো ঋণও পাই না, কেউ টাকা ধারও দেয় না। তাই চামড়া কিনতে পারছি না।
চামড়ার দরপতনের বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক ও সালমা ট্যানারির মালিক সাখাওয়াত উল্লাহ বলেন, ট্যানারির মালিকরা পাওনা অর্থ পরিশোধ করছে না, এ কথা ঠিক নয়। ঢালাওভাবে অভিযোগ করাও ঠিক হচ্ছে না। কারণ বেশিরভাগ ট্যানারি আড়তদারদের টাকা দিয়েছে। তারা কম দামে চামড়া কিনছে। আমাদের কাছে বেশি দামেই চামড়া বিক্রি করবে। লবণযুক্ত চামড়া আমাদের এক হাজার টাকার উপরে কিনতে হবে।
এদিকে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষ্যে সরকার ও ব্যবসায়ীরা মিলে কুরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করে দেয়। এবার ঢাকায় প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ৪৫-৫০ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৩৫-৪০ টাকা। গত বছর প্রতি বর্গফুটের দাম একই ছিল।
২০১৭ সালে প্রতি বর্গফুট গরুর চামড়ার দাম ছিল ঢাকায় ৪৫-৫৫ টাকা এবং ঢাকার বাইরে ৪০-৪৫ টাকা।
এছাড়া সারা দেশে খাসির চামড়া প্রতি বর্গফুট ১৮-২০ টাকা এবং বকরির চামড়া ১৩-১৫ টাকায় সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে ব্যবসায়ীদের। গতবার খাসির চামড়ার দামও ছিল একই। তবে ২০১৭ সালে খাসির চামড়ার দাম ছিল প্রতি বর্গফুট ২০-২২ এবং বকরির চামড়া ১৫-১৭।
ট্রাকভর্তি চামড়া ফেলে পালালেন ব্যবসায়ী : সারা দেশে কাঁচা চামড়ার বাজারে হাহাকার। কেনা দামের থেকে কম মূল্যে চামড়া বিক্রি করে বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছেন মৌসুমি ব্যবসায়ীরা।
ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ক্ষোভে অনেক ব্যবসায়ীই মাটিতে চামড়া পুঁতে ফেলছেন। আবার কেউ কেউ আড়তদারদের সামনে চামড়া ফেলে রেখে চলে যাচ্ছেন।
তবে এবার ঘটল আরেকটি ভিন্ন ঘটনা। সিলেটের এক ব্যবসায়ী এক ট্রাক চামড়া ফেলে পালিয়েছেন। ট্রাকের চালককেও দিয়ে যাননি ভাড়ার টাকা। এছাড়া ৩০০ চামড়ায় লবণ ছিটানো শ্রমিকদের পাওনাও দেননি।
গতকাল বুধবার সকালে সাভারের হেমায়েতপুরে অবস্থিত বেসিক শিল্প নগরীতে স্থানান্তরিত ট্যানারি পল্লিতে এ ঘটনা ঘটে।
সরেজমিনে দেখা যায়, ট্যানারি পল্লির চৌধুরী অ্যান্ড কোং নামে একটি ট্যানারির সামনে একটি ট্রাকে কাঁচা চামড়া পরে আছে। এছাড়া ট্যানারিটির প্রধান ফটকের সামনে পড়ে আছে আরও কতগুলো চামড়া। এদিকে ট্রাকটিকে ঘিরে রেখেছেন স্থানীয় শ্রমিকরা। ট্রাকের দিকে অসহায় দৃষ্টিতে তাকানো ছাড়া আর কিছুই করতে পারছেন না চালক।
ট্রাকের চালক ও শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এক ব্যবসায়ী গত সোমবার সিলেট থেকে প্রায় এক হাজার ৫০০ কাঁচা চামড়া নিয়ে এসেছেন চৌধুরী অ্যান্ড কোং ট্যানারির কাছে বিক্রি করতে। ঐ দিন রাতে প্রায় ৩০০ চামড়া নামিয়ে লবণ ছিটানো হয়। বাকি চামড়ার কাজ সকালে করার কথা শ্রমিকদের। সকালে উঠে শ্রমিকরা ও ট্রাক চালক দেখেন, ট্রাকে চামড়া পড়ে রয়েছে কিন্তু ব্যবসায়ী নেই। বার বার তার মোবাইল ফোনে কল করেও খোলা পাওয়া যায়নি। পরে তারা নানাভাবে নিশ্চিত হয়েছেন তিনি পালিয়ে গেছেন।
ট্রাকচালক মো. রিপন বলেন, ‘সোমবার ভোর ৫টার দিকে চামড়া নিয়ে সিলেট থেকে রওয়ানা হয়ে সন্ধ্যা ৬টায় হেমায়েতপুরে পৌঁছায়। পরে সকালে উঠে দেখি ব্যবসায়ী পালিয়ে গেছেন। আমাকে ভাড়ার টাকা না দিয়ে তিনি পালিয়েছেন। ট্রাকের সব চামড়া পচে গেছে, কেউ নামাচ্ছেন না। হাতে টাকাও নেই। এখন কিভাবে আমি সিলেট যাব?’
স্থানীয় শ্রমিক মো. শান্ত বলেন, ‘রাতে আমাদের দিয়ে ৩০০ চামড়ায় লবণ ছিটানো হয়। ব্যবসায়ীর কাছে আমরা ৩২ হাজার টাকা পাই। এখন তার নাম ঠিকানা কিছুই জানি না। শুধু ফোন নম্বর আছে, কিন্তু কল করলে বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। আমাদের টাকা না পাওয়া পর্যন্ত ট্রাক ছাড়ব না।’
এ বিষয়ে চৌধুরী এন্ড কোং ট্যানারির স্বত্বাধিকারী হাসান চৌধুরী বলেন, ‘ঐ ব্যবসায়ীর নাম ঠিকানা কিছুই জানা নেই। ট্রাকের চালক বলছেন, তারা নাকি সিলেট থেকে এসেছেন। কিন্তু ব্যবসায়ীকে পাওয়া যাচ্ছে না। লোকসান হবে বলে হয়তো তিনি পালিয়ে গেছেন। কাউকে টাকা না দিয়ে। এছাড়া ১২ ঘণ্টার ভেতরে লবণ না পড়ায় সব চামড়া পচে গেছে।’
এদিকে একাধিক ট্যানারি শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এ বছর চামড়ার ব্যবসায়ীরা অনেক টাকা লোকসানের সম্মুখীন হচ্ছেন। তাই কেউ চামড়া মাটিতে পুঁতে ফেলছেন, নয়তো চামড়া ফেলে খালি হাতে চলে যাচ্ছেন।
চামড়ার দাম কমায় ক্ষতিগ্রস্ত দুস্থ ও এতিমরা : এবার কাঁচা চামড়ার দামে মহাবিপর্যয় হলেও চামড়া ব্যবসায়ীদের কোনও লোকসান হচ্ছে না। শুধু তা-ই নয়, ট্যানারি পর্যন্ত চামড়া পৌঁছাতে চার স্তরের হাতবদলের যে চক্রটি কাজ করে তাদের কেউ এবার লোকসানও দিচ্ছে না। তবে ভয়াবহভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছে গরিব-মিসকিন ও এতিমরা।
ধর্মীয় রেওয়াজ অনুযায়ী, কাঁচা চামড়া বিক্রির টাকা কুরবানিদাতারা গরিব-মিসকিন ও এতিমদের মধ্যে দান করে থাকেন। কিন্তু, আন্তর্জাতিক বাজারে চামড়া ও চামড়া জাতীয় পণ্যের বাজার চড়া থাকলেও এবছর সরকারিভাবে কাঁচা চামড়ার দাম গতবছরের দরেই নির্ধারিত হয়েছে। এরপর কাঁচা চামড়া কেনার পাইকার ও ব্যবসায়ীরা আগে থেকেই ‘টাকা নেই’, ‘বেশি দামে চামড়া কিনলে বেচতে পারবেন না’, ‘সংরক্ষণ করার প্রস্তুতি রাখুন’, ‘চামড়া পচে যেতে পারে’ ইত্যাদি হুজুগ তোলায় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা চামড়া কিনেছেন প্রায় বিনামূল্যে। ফলে চামড়ার দাম একেবারেই পড়ে যাওয়ায় কুরবানিদাতার দানের টাকার পরিমাণ গেছে কমে। ফলে চামড়া ব্যবসায়ে জড়িত সবাই লাভবান হলেও বঞ্চিত হয়েছেন কেবল এতিম ও দুস্থরা। তাদের প্রাপ্য অংশ এবার ভয়াবহভাবে কমে গেছে।
এ প্রসঙ্গে কাঁচা চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড স্কিন মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি দেলোয়ার হোসেন বলেন, এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা সবচেয়ে কম দামে কাঁচা চামড়া সংগ্রহ করেছে। ফলে চামড়া ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত সব স্তরের ব্যবসায়ীরাই এবার লাভ করতে পারবে বলে আশা করা যায়। তিনি উল্লেখ করেন, ফরিয়া বা মৌসুমি ব্যবসায়ীরা গরুর মালিকের কাছ থেকে যে চামড়া এবার ২শ’ টাকায় কিনেছে, সেই চামড়া তারা পাইকারদের কাছে বিক্রি করেছে ৫শ’ থেকে ৬শ’ টাকায়। নিচের ধাপেই দাম কম থাকায় এর পরের স্তরের পাইকার, আড়তদার ও শেষে ট্যানারি মালিকরা সবাই হয়তো এবার মুনাফা করতে পারবে। তবে আমাদের হাতে এই মুহূর্তে সব চামড়া কেনার মতো টাকা নেই। যে কারণে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে এবার সব চামড়া আমরা কিনতে পারছি না।
তিনি বলেন, ট্যানারি মালিকরা সাড়ে তিনশ’ কোটি টাকার বেশি বকেয়া রেখেছেন। অন্যান্য ঈদের সময় ১০ থেকে ২০ শতাংশ নগদ টাকা দিলেও এবার হাতেগোনা কয়েকজন টাকা পেয়েছেন। যারা টাকা পেয়েছেন তারা চামড়া কিনছেন। এবছর ২৪৫ জন আড়তদারের মধ্যে মাত্র ২০ থেকে ৩০ জন আড়তদার চামড়া কিনতে পারছেন বলেও জানান তিনি।
প্রসঙ্গত, চামড়া বিক্রির টাকা গরিব, এতিম ও দুস্থদের হক বলে মনে করা হয়।
এ প্রসঙ্গে পাবনার মাওলানা নুর ইয়া-হিয়া হেলাল বলেন, চামড়া বিক্রির টাকা মূলত গরিব, এতিম ও দুস্থদের হক। কাজেই চামড়ার দাম কমে যাওয়া মানেই গরিব, এতিমদের অংশ কমে যাওয়া। তিনি বলেন, চার বছর আগে বড় একটি গরুর চামড়ার টাকা দিয়ে একজন এতিম ছয় মাস চলতে পারতো। কিন্তু এবার ওই ধরনের বড় গরুর চামড়ার টাকায় তার এক মাসও যাবে না।
মূলত যারা গরু, মহিষ, ছাগল বা হালাল পশু কুরবানি করেন, সেই পশুর চামড়া বিক্রির টাকা স্থানীয় মাদ্রাসার গরিব ছাত্র, এতিম-মিসকিন বা গরিব বা দুস্থদের মধ্যে ভাগবাঁটোয়ারা করে দিয়ে থাকেন। কিন্তু, কয়েক বছর হলো সেই চামড়ার দাম পাচ্ছেন না পশু কুরবানিদাতারা। এবার কুরবানির পশুর চামড়ার দাম ভয়াবহভাবে কমে গেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩১ বছরের মধ্যে এবারই সবচেয়ে কমদামে বিক্রি হয়েছে পশুর চামড়া। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ৮০ হাজার টাকার গরুর চামড়ার দাম দিয়েছেন ২শ’ টাকারও কম। এক লাখ টাকার গরুর চামড়া বিক্রি হয়েছে মাত্র ৩শ’ টাকায়। চামড়ার দাম না পাওয়ায় কুরবানি দাতাদের অনেকেই ক্ষুব্ধ হয়ে চামড়া মাটিতেও পুঁতে দিচ্ছেন।
দুই তিন বছর আগেও ঈদের দিন সকাল থেকেই কুরবানির পশুর চামড়া কিনতে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের তৎপরতা লক্ষ্য করা যেত। গ্রাম-গঞ্জে পাড়া-মহল্লায় চামড়া কেনার জন্য তারা অপেক্ষা করতো। মৌসুমি ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও হুজুরদেরও দেখা যেত। পশু কুরবানির পর চামড়া নিয়ে মৌসুমি ব্যবসায়ীদের মধ্যে টানাটানিও হতো। কিন্তু এবার সে ধরনের কোনও দৃশ্য দেখা যায়নি।
মৌসুমী ব্যবসায়ী ও পাইকারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এবার মৌসুমি ব্যবসায়ীরা ভালো চামড়া গড়ে ৩শ’ টাকার কম দরে সংগ্রহ করতে পেরেছেন। আর সেই চামড়া পাইকাররা গড়ে ৫শ’ থেকে সাড়ে ৫শ’ টাকা করে চামড়া কিনছেন।