প্রাচীন নির্মাণশৈলীর নিদর্শন ছাতকের খরিদিচর ৯ গম্বুজ মসজিদ

20

বিজয় রায়, ছাতক
দু’শতাধিক বছরের পুরোনো ছাতকের খরিদিচর ৯ গম্বুজ আদি জামে মসজিদ মুসলমানদের ধর্মীয় অনুপ্রেরণার প্রতীক হিসেবে স্ব মহিমায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রাচীনতম এ মসজিদটি এক সময় ইসলাম ধর্মে বিশ্বাসী অত্র অঞ্চলের মানুষের একমাত্র উপাসনালয় হিসেবে পরিচিত ছিল। দুরদুরান্ত থেকে নামাজ পড়তে এ মসজিদে আসতেন মুসল্লীরা। সবুজ ছায়া ঘেরা পরিবেশে নির্মিত খরিদিচর ৯ গম্বুজ আদি জামে মসজিদটি জেলার প্রাচীন নির্মাণশৈলীর অন্যতম একটি মসজিদ। কিন্তু লোকচক্ষুর আড়ালে থাকায় প্রতিষ্ঠার পর উল্লেখযোগ্য কোনো সংস্কার কাজ হয়নি।
বর্ষা মৌসুমে চুন-সুরকির নির্মিত এ মসজিদটির ছাদ ঘেমে ভেতরে বৃষ্টির পানি পড়তে থাকে। এর ফলে নামাজ আদায় ও ধর্মীয় উপাসনাকালে বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় মুসল্লিদের। দৃষ্টিনন্দন ও পুরাতন এ মসজিদটির নির্মাণশৈলী এখনো মানুষের নজর কাড়ে। ছাতক-জাউয়া-সুনামগঞ্জ সড়কের পাশে খরিদিচর গ্রামে এক নয়নাভিরাম পরিবেশ ৯ গম্বুজ খরিদিচর জামে মসজিদ নির্মিত হয় দু শতাধিক বছর আগে। এ মসজিদটি সুনামগঞ্জ জেলার দ্বিতীয় পুরাতন মসজিদ বলে এখনো এ অঞ্চলে জনশ্রুতি রয়েছে।
প্রতিষ্ঠাকালীন কোনো সময়, তারিখ কেউ বলতে না পারলেও কারুকাজমন্ডিত এ মসজিদটি যে বহু পুরোনো তা এক কথায় এলাকার সবাই বলে দিতে পারে। উপজেলার চরমহল্লা ইউনিয়নের খরিদিচর গ্রামের কুলীন মুসলিম পরিবারে সন্তান আলিম উল্লাহর পুত্র মুন্সি আশরাফ আলী মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন। গ্রামের ইসলাম অনুসারী মানুষের নামাজ ও ধর্মীয় কার্যক্রম পরিচালনা করার মহৎ উদ্দেশ্যে নিজ অর্থে ও প্রচেষ্টায় নিজের ভূমিতে এ মসজিদটি প্রতিষ্ঠা করেন তিনি। কালের পরিবর্তনে যোগাযোগ ব্যবস্থাসহ তথ্য-প্রযুক্তিগত আমূল পরিবর্তন সাধিত হলেও পুরাতন এ মসজিদটিতে এতটুকু উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি। প্রতিষ্ঠাতার বংশ পরম্পরায় যুগ-যুগ ধরে প্রাচীনতম এ নিদর্শনটির দেখভাল হয়ে আসঠে। বর্তমান এ মহান ব্যক্তির ৪র্থ বংশধর বুরহান উদ্দিন, মাওলানা নুরুল হুদা, আজিজুস সামাদ ও এনামুল হক মসজিদের তত্ত্বাবধানে রয়েছেন।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, চুন-সুরকির নির্মিত মসজিদের প্রতিটি দেয়াল ৫০-৬০ ইঞ্চি প্রশস্ত। মসজিদে ডান পাশে রয়েছে ১ গম্বুজ বিশিষ্ট একটি এবাদত খানাযেখানে প্রতিষ্ঠাতা মুন্সি আশরাফ আলী সৃষ্টিকর্তার জিকির-আজকার করতেন বলে তার বংশধররা জানিয়েছেন। ভেতরে প্রবেশের জন্য রয়েছে ৩টি প্রধান ফটক এবং ডান পাশে রয়েছে আজান দেয়ার জন্য উপরে উঠার সিঁড়ি। দুটি সুউচ্চ মিনার রয়েছে মসজিদের দু’প্রান্তে। মুসল্লিদের ওজু করা জন্য নির্মাণ করা হয়েছিল একটি ইন্দিরা (কূপ)। প্রায় ৬ শতক ভূমির উপর নির্মিত খরিদিচর ৯ গম্বুজ মসজিদের ডান পাশে একটি পুকুর, সামনে খরিদিচর মাদ্রাসা ও বামপাশে রয়েছে খরিদিচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়।
দেড় শত বছর পূর্বে ভয়াবহ এক ভূমিকম্পে সুউচ্চ মসজিদটি সরাসরি ৫ থেকে ৬ নিচে দেবে যায় মাটিতে। পরবর্তীতে নামমাত্র সংস্কারের মাধ্যমে মসজিদের মেঝে ভরাট করে নামাজ পড়ার উপযোগি করে তোলা হয়। মসজিদের কেয়ারটেকার বুরহান উদ্দিন, মাওলানা নুরুল হুদা জানান, গ্রামের বহু মানুষ এ মসজিদে নামাজ আদায় করে থাকেন। বাইরে থেকে মুসল্লিরা আসেন এখান ইবাদতের জন্য। বর্তমানে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটি বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত হয়ে পড়েছে। অর্থ সংকটের কারণে কোনো সংস্কার কাজ করতে পারছেন না কর্তৃপক্ষ।
বর্ষায় পুরোনো ছাদ ও দেয়াল দিয়ে বৃষ্টির পানি পড়ে মেঝ স্যাঁতস্যাঁতে হয়ে পড়ে। নামাজ আদায় করার সময় প্রায় ছাদ দিয়ে পড়া পানিতে ভিজতে হয় মুসল্লিদের। জেলার প্রাচীনতম ও অপরূপ কারুকাজ বিশিষ্ট খরিদিচর মসজিদটি সংস্কার করা অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব মুসলিম জাহানের একমাত্র উপাসনাল হচ্ছে মসজিদ। মসজিদ রক্ষায় ও নির্মাণে মুসলিম জনগোষ্ঠীর আত্মদান ও অবদান ইতিহাসের পরতে-পরতে লিপিবদ্ধ রয়েছে।
ছাতকের ঐতিহাসিক খরিদিচর আদি জামে মসজিদ যুগ-যুগ ধরে ইসলামের আলো ছড়িয়ে আলোকিত করে আসছে এ অঞ্চলের মানুষকে। এখন বয়সের ভারে নিজের আলোই হারিয়ে ফেলছে অপুর্ব নির্মাণশৈলীর ৯ গম্বুজ এ মসজিটি। আল্লাহর ঘর এ মসজিদটি রক্ষা করার একমাত্র উপায় সংস্কার। প্রতিষ্ঠাতা মুন্সি আশরাফ আলীর বংশধরদের দাবি সরকারি অনুদান, মুসলিম ধনাঢ্য ব্যক্তি বা প্রবাসীরা আর্থিক সহায়তা করলে ঐতিহ্যবাহী এ মসজিদটিকে রক্ষা করা সম্ভব হবে। অন্যথায় পুরাতন এ মসজিদটি এক সময় বয়সের ভারে হারিয়ে যেতে পারে।