চামড়ার দরপতনে রিট সাড়া দেননি হাইকোর্ট

6

সবুজ সিলেট ডেস্ক
কুরবানির পশুর চামড়ার নজিরবিহীন দরপতনের কারণ খুঁজতে বিচারিক তদন্ত চেয়ে হাইকোর্টে রিট করা হয়েছে। তবে ওই রিট নিয়ে হাইকোর্টের পৃথক দুটি বেঞ্চে শুনানির জন্য গেলে তাতে সাড়া দেননি হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট বেঞ্চ।
কোরবানিতে পশুর চামড়ার দরপতন রোধে নিষ্ক্রিয়তা চ্যালেঞ্জ করে বিচারিক তদন্তের নির্দেশনা চাওয়া হয় রিটে।
রিটকারী আইনজীবী জানান, সিন্ডিকেট ও একশ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ীর কারণে চামড়ার অস্বাভাবিক দরপতন হয়েছে বলে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। চামড়াজাত পণ্য দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম রফতানি খাত, যার প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে কাঁচা চামড়া। এ অবস্থায় এ শিল্প হুমকির মুখে পড়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশনা চাওয়া হয়েছে রিটে।
গতকাল রোববার সকালে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন মো. হানিফ (ফরহাদ) হাইকোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় এ রিট আবেদন করেন। রিটে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব, বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান, বাংলাদেশ হাইড অ্যান্ড মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্টকে বিবাদী করা হয়েছে।
রিট আবেদনে চামড়ার অপ্রত্যাশিত দরপতন রোধে বিবাদীদের নিষ্ক্রিয়তা ও ব্যর্থতা কেন অবৈধ হবে না, দরপতনের কারণ খুঁজতে একটি জুডিশিয়াল (বিচারিক) তদন্ত করতে কেন নির্দেশ দেয়া হবে না, দরপতনের সঙ্গে দায়ীদের ব্যবসায়িক নিবন্ধন কেন বাতিল করা হবে না মর্মে রুল জারির আর্জি জানানো হয়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত এ-সংক্রান্ত প্রতিবেদন সংযুক্ত করে এ রিট করা হয়েছে বলে জানান ব্যারিস্টার মহিউদ্দিন মো. হানিফ (ফরহাদ)।
তিনি বলেন, রিটটি দুটি বেঞ্চে উপস্থাপন করা হলে আদালত শুনানির জন্য তা গ্রহণ করতে অপারগতা প্রকাশ করেন। তবে এ বিষয়ে শুনানির জন্য আগামীকাল অন্য একটি বেঞ্চে উপস্থাপন করা হবে।
‘সরকারের নজরদারি নেই, ব্যবসায়ীদের কারসাজি’ শিরোনামে খবর প্রকাশ করা হয় একটি পত্রিকায়। অপর একটি পত্রিকায় ‘গরিবের হকে সিন্ডিকেটের থাবা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘প্রভাবশালী সংঘবদ্ধ চক্রের কারণে এবার ‘গরিবের হক’ কুরবানির পশুর চামড়ার বাজারে বড় ধস নেমেছে। বাড়তি মুনাফার লোভে ট্যানারি মালিকদের বেশির ভাগই সিন্ডিকেট করে কুরবানির পশুর চামড়া কিনছে না। অল্প যা বিক্রি হয়েছে তা সরকারের বেঁধে দেয়া দামের চেয়ে অনেক কমে, নামমাত্র মূল্যে। এতে চামড়া সংগ্রহকারীরা বিপাকে পড়েছেন। চামড়া পচে যাচ্ছে। দুর্গন্ধে নিরূপায় হয়ে অনেকে সংগৃহীত চামড়া রাস্তা বা নদীতে ফেলে দিচ্ছে। মাটির নিচেও পুঁতে ফেলছে অনেকে।
ঈদের পরদিন মঙ্গলবার থেকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের ফতুল্লার জালকুড়ির ক্রিকেট স্টেডিয়ামের পাশের রাস্তায় কয়েক হাজার কুরবানি পশুর চামড়া পড়ে থাকতে দেখা যায়। সিলেট সিটি কর্পোরেশনের বিভিন্ন এলাকায় ফেলে রাখা অন্তত ২০ ট্রাক চামড়া ডাম্পিং স্পটে পুঁতে ফেলা হয়েছে। এ ছাড়া সিলেটের বিভিন্ন উপজেলায় আরও অন্তত ২৫০ পশুর চামড়া নদীতে ফেলে দেয়ার খবর পাওয়া গেছে। সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার সৈয়দপুর হাফিজিয়া হোসেনিয়া দারুল হাদিস কর্তৃপক্ষ পুঁতে ফেলেছে নষ্ট হয়ে যাওয়া ৯০০ চামড়া। কোথাও মাত্র ৫০ টাকায় গরুর চামড়া বিক্রির ঘটনাও ঘটেছে। আবার ন্যায্যমূল্যে চামড়া কিনে আড়তদারদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি জেলার মৌসুমি ব্যসায়ীরা।
ঢাকা ও ঢাকার বাইরের বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, কুরবানির পশুর যে চামড়া দুই-আড়াই হাজার টাকায় বিক্রি হতো, এবার তা বিক্রি করতে হয়েছে ৫০ থেকে ৩০০ টাকায়। ক্রেতার ঘাটতি থাকায় দাম নির্ধারণ ছাড়াই ট্যানারি মালিক এবং ব্যবসায়ীদের কাছে চামড়া দিতে বাধ্য হয়েছে রাজধানীর মসজিদ ও মাদরাসা কর্তৃপক্ষ। কুরবানির চামড়ার এ দশা নিয়ে নগরবাসী, জনপ্রতিনিধি, মৌসুমি ব্যবসায়ী এবং মসজিদ-মাদরাসার নেতাদের মধ্যে বিরাজ করছে ক্ষোভ। চামড়ার ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় এতিম ও দরিদ্র শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা করছেন অনেকে।
রাজধানীর দুই সিটি কর্পোরেশনের তথ্য অনুযায়ী, উত্তরের এলাকায় আড়াই লাখের মতো পশু কুরবানি করা হয়েছে গত সোমবার। এছাড়া মঙ্গল ও বুধবার আরও ৩০ হাজারের মতো কুরবানি করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এলাকায় এবার দুই লাখের মতো পশু কুরবানি করা হয়েছে। এরপর দুদিনে আরও ৫০ হাজারের মতো পশু কুরবানি দেয়া হয়েছে। তিন বছর আগেও পাঁচ লাখ পশুর চামড়া গড়ে দুই হাজার টাকা দরে বিক্রি করে ১০০ কোটি টাকার বেশি অর্থ পাওয়া যেতো। এ অর্থ মসজিদ, মাদরাসা, এতিম ও গরিব মিসকিনদের দান করা হতো। কিন্তু মৌসুমী ব্যবসায়ীরা এবার রাজধানীতে চামড়াপ্রতি গড়ে ২০০- ৩০০ টাকার বেশি দিতে রাজি হয়নি। ছাগলের চামড়া ১০ টাকার বেশিতে নিতে চাননি। রাজধানীর কোনো কোনো এলাকায় মৌসুমী ক্রেতাদের না পাওয়ায় দামদর ঠিক না করেই চামড়া আড়তদারদের দিয়ে দেয়া হয়েছে। ফলে চামড়া বিক্রি বাবদ কত টাকা আসবে সে ব্যাপারে কিছুই জানেন না বিক্রেতারা।
ব্যবসায়ীদের কারসাজি : এদিকে চামড়ার বাজারে ধস নামার পেছনে ব্যবসায়ীদের কারসাজি আছে বলে অভিযোগ করেছেন খোদ বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি। গত বুধবার রংপুর নগরীর শালবন এলাকায় তার বাসভবনে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন। চামড়ার এ দশা হওয়ায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ঈদের পর দিনই জরুরি বৈঠক করে কাঁচা চামড়া রফতানির অনুমতি দেয় যাতে কুরবানির চামড়া সংগ্রহকারীরা নায্যমূল্য পান। কিন্ত তাতে আপত্তি তুলেছেন ট্যানারি মালিকরা।