বিক্ষোভ-বিশৃঙ্খলায় শেষ হলো নিউইয়র্কের নাসাউ কলিসিয়ামের ফোবানা সম্মেলন ২০১৯

31

কামরুজ্জামান হেলাল

যুক্তরাষ্ট্র:

তপন চৌধুরী, রিজিয়া পারভীন, বেবী নাজনীন, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী ও শুভ্র দেবসহ জনপ্রিয় শিল্পীদের গান শোনতে ৩০ ডলার থেকে ১০০ ডলার দিয়ে টিকেট কেটে দূর-দূরান্ত থেকে নিউইয়র্কের বিশ্বখ্যাত অডিটরিয়াম নাসাউ কলিসিয়ামে গিয়েছিলেন বাংলাদেশী দর্শকেরা কিন্তু স্পন্সরদের খুশি রাখতে গিয়ে আয়োজকদের ‘বাড়াবাড়ি’ ও কথিত ‘সাংগঠনিক’ কর্মকাণ্ডেই শেষ হয়েছে অনুষ্ঠানের অধিকাংশ সময়। সময় স্বল্পতার কারণে গান গাইতে না পেরে শিল্পীরা যেমন অখুশি হয়েছেন, তেমনি প্রিয় শিল্পীদের গান শোনতে না পেরে দর্শকেরা বাড়ি ফিরে গেছেন চরম হতাশা নিয়ে।

এ ধরণের বিশৃঙ্খল ঘটনার মধ্য দিয়ে স্থানীয় সময় রবিবার নিউইয়র্কের লং আইল্যান্ডে শেষ হয়েছে ৩৩ বছরের ফোবানার ইতিহাসে সবচেয়ে ব্যয়বহুল ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত তিন দিনের ফোবানা সম্মেলন। দুদিনে অডিটরিয়ামের ভাড়া বাবদ গুনতে হয়েছে তিন লাখ ডলার। ব্যক্তিগত রেষারেষির কারণে একদিকে যেমন একই শহরে আরেকটি ফোবানা হয়েছে, তেমনি বিশৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে শেষ হওয়ায় ভবিষ্যত ফোবানার কার্যক্রমও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।

এবারের ৩৩তম ফোবানার আয়োজক ছিল নিউইয়র্কের নাট্য সংগঠন ড্রামা সার্কল। সবার সেরা হতে সংগঠনটি ভেন্যু হিসাবে বেঁছে নেয় নাসাউ কলিসিয়ামকে। এজন্য দুদিন অর্থাৎ দ্বিতীয় ও তৃতীয় দিনের ভাড়া বাবদ আয়োজকদের গুনতে হয় ৩ লাখ ডলার। নাট্য সংগঠন ড্রামা সার্কলের অনভিজ্ঞতা এবং দুর্বল প্রচারের কারণে প্রায় ১৫ হাজার আসন ক্ষমতার মিলনায়তনে দ্বিতীয় দিনে দুই হাজার দর্শক অতিক্রম করেনি। তৃতীয় দিনে তপন চৌধুরী, রিজিয়া পারভীন, বেবী নাজনীন, ফাহমিদা নবী, সামিনা চৌধুরী ও শুভ্র দেবসহ জনপ্রিয় শিল্পীদের কথা প্রচার করায় হাজার তিনেক দর্শকের উপস্থিতি দেখা গেছে। কিন্তু তাদেরও হতাশ করেছেন আয়োজকরা। একটি দেশাত্মবোধক গান গাইবার পর জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী বেবী নাজনীনকে মঞ্চ ছাড়তে বলায় তিনি ক্ষুব্ধ হন। বেবী নাজনীন মঞ্চ ছাড়ার আগেই মাইক হাতে নেন তপন চৌধুরী। তার একটি গান শেষ না হতেই মঞ্চে এসে তার সঙ্গে গলা মেলান আরেক জনপ্রিয় শিল্পী রিজিয়া পারভীন। এর আগে মঞ্চে একটি গান গেয়ে বিদায় নেন শুভ্র দেব। প্রয়াত শিল্পী মাহমুদুন্নবীকে সম্মাননা জানায় ড্রামা সার্কল। তার দুই মেয়ে জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ফাহমিদা নবী ও সামিনা চৌধুরী সময় স্বল্পতার কারণে খালি গলায় দুই লাইন গেয়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন। অথচ ফোবানা সম্মেলনের টাইটেল স্পন্সর হওয়ায় টাউন এমডি পক্ষের কর্ণধার রাহাত আল মুক্তাদিরের কবিতা এবং তার ছোট ভাই ফুয়াদ ও বন্ধুরা ব্যান্ডের গান গেয়ে পার করেছেন পুরো একটি ঘণ্টা। এসব নিয়ে দর্শকেরা ক্ষুব্ধ হন। শুরু করেন চেঁচামেচি।

এদিকে, কলকাতার জনপ্রিয় সঙ্গীতশিল্পী ইমন চক্রবর্তীকে একটি এবং পরে অর্ধেক বাংলা গান গেয়ে মঞ্চ থেকে বিদায় নেন তিনি। অথচ কলকাতার এই নারী শিল্পীকে সম্মানী দিতে হয়েছে আট হাজার ডলার। বাংলাদেশের জনপ্রিয় দুইজন শিল্পী অভিযোগ করেছেন, তাদের বেলায় প্রাপ্য সম্মানী দেওয়া হয়নি।

অনুষ্ঠানের সময় যখন শেষের পথে, দর্শকেরা যখন প্রিয় শিল্পীদের গান শোনার জন্য অধীর অপেক্ষায় তখনই মঞ্চে আসেন ফোবানা কর্মকর্তারা। তারা নতুন কমিটি এবং পরবর্তী ফোবানা সম্মেলনের কথা ঘোষণা করেন।

কর্মকর্তাদের ‘অতিকথনে’ দর্শকেরা ক্ষোভ প্রকাশ করলে আয়োজক সংগঠন ড্রামা সার্কলের সভাপতি ও ফোবানার সদস্য সচিব আবীর আলমগীর বলেন, এটা ফোবানা কনসার্ট নয়, সম্মেলন। অতএব, আমাদের কথা শুনতে হবে। তার এ কথায় দর্শকেরা চিৎকার করে প্রতিবাদ জানান।

মিলনায়তরে ভেতরে যখন ‘হযবরল’ অবস্থা, বাইরে এক্সপো সেন্টারে তখন তীব্র হট্টগোল চলছিল। অর্ধশতাধিক স্টল মালিককে মিলনায়তনের প্রধান ফটকের বাইরে বিক্ষোভ করছিলেন। তাদের হাতে গলদগর্ম হন ফোবানার আয়োজক সংগঠন ড্রামা সার্কলের সাধারণ সম্পাদক পলাশ পিপলু। স্টল মালিকদের অভিযোগ, ১০-১২ হাজার লোকের উপস্থিতি ঘটবে বলে তাদের কাছ থেকে মোটা অংকের অর্থ নিয়ে স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ নগণ্য উপস্থিতির কারণে তাদের স্টলের ভাড়াই ওঠেনি। পরে নাসাউ কলিসিয়ামের নিরাপত্তা কর্মীদের মধ্যস্থতায় আয়োজকরা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার অঙ্গীকার করলে স্টল মালিকেরা শান্ত হন।

 

এদিকে নিউইয়র্কের লাগোর্ডিয়া ম্যারিয়ট হোটেলের বলরুমে ফোবানার আরেক অংশের অনুষ্ঠানের শেষ দিনে বাংলাদেশিদের উপস্থিতি ছিল আরও হতাশাজনক। তবে অনুষ্ঠানটি ছিল সবার জন্য উন্মুক্ত। নিউইয়র্কের স্থানীয় শিল্পীরা সঙ্গীত ও নৃত্য পরিবেশন করেন।