প্রমত্তা পিয়াইন নদী এখন ধু-ধু বালুচর ৩০ বছরেও হয়নি খনন কাজ

15

জাকির হোসেন, গোয়াইনঘাট
চীনে একটি প্রবাদ আছে নদীকে না দেখলে, নদীও তোমায় দেখবে না। আর নদী দেখা বন্ধ করলেই….সব শেষ। নদীমাতৃক দেশ আমাদের বাংলাদেশ। নদীই হচ্ছে এ দেশের প্রাণ। সভ্যতার ভর কেন্দ্র। নদীকে কেন্দ্র করেই এ দেশের শহর-বন্দরগুলো গড়ে উঠেছে। সভ্যতাগুলো গড়ে উঠার পেছনে কিন্তু নদীর অবদান অনেক বেশি। এ দেশ জুড়ে বিস্তৃত রয়েছে ছোট বড় অসংখ্য নদনদী। এর মধ্যে কোনোটি ছোট আবার কোনোটি বড়। কিন্তু প্রতিটি নদীই তাঁর নিজস্ব অবদানের ক্ষেত্রে স্বমহিমায় স্বীকৃত।
তেমনই একটি নদীর নাম হচ্ছে পিয়াইন। মেঘালয়ের কূল ঘেঁষে বয়ে চলা পিয়াইন নদীর অবস্থান হচ্ছে সীমান্ত জনপদ গোয়াইনঘাট উপজেলায়। যার উৎপত্তি হয়েছে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের ওমগট নদী থেকে। ভারতের মেঘালয় রাজ্যের জৈন্তা পাহাড় হতে উৎপত্তি হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের পথেই ওমগট নদী দুই ভাগে বিভক্ত হয়েছে। যার একটি শাখা পিয়াইন নাম ধারণ করে মেঘালয় পাহাড়ের সীমান্ত ঘেঁষে পাদুয়া হয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলা সদরের উত্তর দিক দিয়ে প্রবাহিত হয়ে কোম্পণীগঞ্জের ধলাই নদীর সঙ্গে মিলিত হয়েছে। যা পরবর্তীতে ছাতকের কাছে গিয়ে সুরমা নদীর জলধারার সাথে মিশেছে। অন্য শাখাটি ডাউকি নাম ধারণ করে পর্যটন কেন্দ্র জাফলং ও বল্লাঘাট পাথর কোয়ারি এলাকা হয়ে পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের মুখতোলা নামক স্থানে সারী-গোয়াইন নদীর সঙ্গে মিশেছে।
এক সময়ের প্রমত্তা উত্তাল পিয়াইন নদীর বুকে এখন ধু-ধু বালুচর। আজ পিয়াইন নদীর দিকে তাকালে তার সেই প্রবাহময়তা দেখা যায় না। এর কারণ হিসেবে জানা গেছে, ১৯৮৮ সালের ভয়াল বন্যা ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে তৎকালীন সংগ্রাম বিডিআর ক্যাম্পসহ বেশ কিছু এলাকা লন্ডভন্ড হয়ে যায়। একই সাথে স্রোতের তোড়ে পলি আর বালু মাটি এসে পিয়াইনের উৎস মুখ থেকে পাদুয়া হয়ে ঢালারপাড় পর্যন্ত চার কিলোমিটার নদীপথ ভরাট হয়ে যায়। ফলে, পানির গতিপথ পরিবর্তন হয়ে এক সময়ের ছোট খাল রূপ নিয়েছে বিশাল নদীতে। যা বর্তমানে জাফলং (ডাউকি) নদী নামে পরিচিত। খাল থেকে নদীতে রূপ নেয়া ডাউকি নদীর উত্তাল ঢেউ আর ভয়ঙ্কর স্রোতধারায় বিগত আড়াই যুগে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে নদীর তীরবর্তী কয়েক শতাধিক বসতবাড়ি। নদী ভাঙনের কবল থেকে বাদ যায়নি ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ জাফলং চা-বাগানের শতাধিক হেক্টর ভূমি।
স্থানীয়দের সাথে আলাপ করে জানা যায়, এক সময় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের অধিকাংশ পানি প্রবাহিত হতো পিয়াইন নদী দিয়ে। যে কারণে সচল নদীপথ হিসেবে স্বাধীনতা পূর্ব ও পরবর্তী সময়ে পিয়াইন নদীই সীমান্ত এলাকার লোকজনের ব্যবসা বাণিজ্য ও নৌপথে যোগাযোগের একমাত্র ভরসাস্থল ছিল। চল্লিশের দশকে পিয়াইন-ধলাই নদী দিয়ে জাহাজ চলাচলের বিষয়ে জনশ্রুতি থাকলেও কালের বিবর্তনে ভরাট হয়ে যাওয়ার ফলে বর্তমানে পিয়াইন নদী দিয়ে ভরা বর্ষা মৌসুমে নৌকা নিয়ে চলাফেরা করাও দুষ্কর। তারা জানান, বালু পড়ে ভরাট হয়ে যাওয়ার কারণে প্রায় ৩০ বছর ধরে এই নদী দিয়ে পানি প্রবাহ বন্ধ রয়েছে। পিয়াইন ও ডাউকি নদী খননের বিষয়ে গত বছরের ১৬ মে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ও সাবেক ভূমি সচিব ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার সরজমিন পরিদর্শন করে দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার আশ্বাস দেন। কিন্তু এরপর প্রায় দেড় বছর পেরিয়ে গেলেও পিয়াইন নদী খননের ব্যাপারে আজ পর্যন্ত কোনো উদ্যোগই চোখে পড়েনি। তাই দেশের মানচিত্র থেকে মুছে যাওয়ার আগে এক সময়ের প্রমত্তা এই পিয়াইন নদী খনন করে এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন মহলসহ স্থানীয় এলাকাবাসী।
এ ব্যাপারে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান লেবু বলেন, পিয়াইন নদী ভরাট হয়ে যাওয়ায় উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি ডাউকি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয়ে তার ইউনিয়নের নদীর তীরবর্তী বসতবাড়ি ও জাফলং চা-বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে শতাধিক বাড়িঘর, ধর্মীয় ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ চা-বাগানের ভূমি ভাঙনের কবলে পড়ে নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পাশাপাশি প্রতি বছরের বন্যায় রাস্তাঘাটসহ গ্রামীণ অবকাঠামো ব্যপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাই তিনি পিয়াইন নদী খনন করে স্বাভাবিক নিয়মে যাতে উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি পিয়াইন ও ডাইকি নদী দিয়ে প্রবাহিত হয় তার ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।
এ বিষয়ে সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার ও বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপার) জেলার সাধারণ সম্পাদক আব্দুল করিম কিম বলেন, পিয়াইন হচ্ছে একটি আন্তঃসীমান্ত নদী। এক সময়ের প্রমত্তা এই নদীটি তার নাব্যতা হারিয়েছে অনেক আগেই। প্রমত্তা এই নদীটি বিজ্ঞানভিত্তিক সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমে খনন করে দ্রুত এর নাব্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তর ও জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন তিনি।
পিয়াইন নদী খননের বিষয়ে জানতে চাইলে পানি উন্নয়ন বোর্ড সিলেটের উপসহকারী প্রকৌশলী (শাখা কর্মকর্তা) মো. জহিরুল ইসলাম সরকার জানান, গোয়াইনঘাটের ভরাট হয়ে যাওয়া নদী, নালা ও খাল খননের বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও ড্রেনেজ অ্যান্ড ইরিগেশন নামের (এফসিডিআই) একটি প্রকল্প প্রস্তাবনায় রয়েছে। যার মধ্যে পিয়াইন নদী খননের বিষয়টিও কথাও উল্লেখ রয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন হলে পিয়াইন নদীর খনন কাজ করা হবে বলে তিনি জানান।