প্রতিবেশ সংকটাপন্ন, বাড়ছে রোগব্যাধি নগরের প্রবেশমুখে স্বাগত জানায় সিসিকে ময়লার ভাগাড়

7

নুরুল হক শিপু
নগরীর অন্যতম প্রবেশদ্বার ঢাকা-সিলেট পুরাতন মহাসড়ক। এ সড়কের ক্ষত হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ সুরমার পারাইচকে সিলেট সিটি কর্পোরেশনের ময়লার ভাগাড় ভোগাচ্ছে সাধারণ মানুষকে। নগরবাসীর বর্জ্য এলাকার পরিবেশ, প্রতিবেশ সংকটাপন্ন করে তুলেছে। পারাইরচকের আশপাশের অন্তত ১০টি বিল ও হাওরে মৎস্য ও ধান উৎপাদন শূন্যের কোঠায় নেমে এসেছে। ছড়িয়ে পড়ছে বিভিন্ন ধরণের রোগবালাই। পারাইরচকের ময়লার ভাগাড় শহর থেকে দুরে স্থানান্তরের দাবি এলাকাবাসীর।
একটা সময়ে সিলেট শহরের নিকটবর্তী হাওর ও বিলের এলাকা হিসেবে পরিচিত ছিল দক্ষিণ সুরমা উপজেলা। প্রতিদিন সকালে হাওরের টাটকা মাছ সংগ্রহে নাগরিকরা ছুটতেন দক্ষিণ সুরমায়। এখানকার ভাড়েরা বিল, পলির হাওর, কুরি বিল, মেদধি বিল, লোহাজুড়ি বিল, বানিকান্দি বিল, চাতল বিল, নাপিত কুড়ি বিলের মাছের স্বাদের কথা ছিল মুখে মুখে। বছর দশেক আগেও এ সকল হাওড় ও বিলের টাটকা মাছ নগরবাসীর চাহিদার বিশাল অংশ জোগান দিত। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এই সকল বিলে এখন আর মাছের উৎপাদন নেই বললেই চলে। আর যেসকল মাছ এ বিলে ধরা পড়ে, তাও খেতে ভয় পান নগরবাসী। কারণ এই হাওর ও বিলের মুখেই সিলেট সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড়। এ ভাগাড়ের বর্জ্য ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ছে আশপাশের হাওড় ও বিলে। বিভিন্ন ক্লিনিক্যাল বর্জ্য আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে নগরবাসীকে। ক্যান্সার রোগীর রক্ত যেমন এখানে ফেলা হয়, তেমনি নাগরিকদের ব্যবহৃত সকল পলিথিন, রান্নার বর্জ্য থেকে শুরু করে মরা পশুর হাড়ও এখানে স্তুপিকৃত করে রাখা হয়।
দিনের পর দিন এ সকল বর্জ্য পচে ছড়িয়ে পড়ছে পার্শ্ববর্তী হাওর ও বিলগুলোতে। ফলে ধান ও মাছের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে এসেছে। এছাড়া বর্জ্যরে দুর্গন্ধে পার্শ্ববর্তী গোটাটিকর, ছিটাগোটাটিকর, গঙ্গানগর, সামাল হাসান, হবিনন্দি, পাঠানপাড়া, গঙ্গারামের চক, ধোপাপাড়া, মালিপুর, লামা পালপুর, আলমপুর, কুচাই, ষাটঘর গ্রামের মানুষের জীবন ওষ্ঠাগত। এছাড়া সিলেট-মৌলভীবাজার সড়ক দিয়ে যাতায়াতকারী গাড়ির চালক ও যাত্রীদেরও চলাচলে মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটে। এই এলাকা দিয়ে চলাচলকারী অধিকাংশ গাড়ির চালক ও যাত্রীর কখনো মুখে মাস্ক, আবার কখনো নাক চেপে চলতে হয়। ফলে অনেক সময় দুর্গন্ধ থেকে বাঁচতে গিয়ে নাক চেপে ধরে গাড়ির নিয়ন্ত্রণ হারান চালকরা।
সিটির বর্জ্যরে কারণে ভাড়েরা বিলের চারপাশের বিভিন্ন পাড়ামহল্লার কয়েক হাজার পরিবারের সদস্য বিভিন্ন রোগ ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছেন। রোগব্যাধির কারণ হিসেবে স্থানীয়রা জানান, সিটি কর্পোরেশনের ময়লা আবর্জনার দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে আবাসিক এলাকার ভেতর। সিটি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও তাদের ফেলে দেওয়া বর্জ্যরে এলাকার মানুষ অতিষ্ট। বর্ষা মৌসুমে দুষিত বর্জ্যগুলো পানির ¯্রােতে বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় ঢুকে পড়ে। অপচনশীল ও দূষিত বর্জ্যরে কারণে বিভিন্ন কৃষি জমির মাটির উর্বরতা নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি চাষ অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এছাড়া হাওড় ও বিলে পলিথিন ব্যাগ, সিরিঞ্জ, প্লাস্টিকসহ পরিবেশ দূষণকারী বর্জ্য ছড়িয়ে পড়ায় ধান ও মাছেন উৎপাদন কমে গেছে। এ অবস্থায় সিলেট সিটি করপোরেশনের ময়লার ভাগাড় স্থানান্তরের দাবি স্থানীয়দের।
সিলেট উইমেন্স মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক প্রফেসর ডা. মো. ফেরদৌস হাসান বলেন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় আধুনিকীকরণ না হলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জীবানু মানুষের দেহে প্রবেশ করে অসুস্থ হয়ে পড়ছে। এখানকার বিলে বেড়ে ওঠা মাছ কেউ খেলে সরাসরি আক্রান্ত হতে পারেন।
এদিকে সম্প্রতি ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি প্রকল্প চালু করেছে সিলেট সিটি করপোরেশন। এ প্রকল্পকে নিজের বহু কাঙ্খিত প্রকল্প বলে অভিহিত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন। সম্প্রতি তিনি সিলেটে পারাইরচকে ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম উদ্বোধন শেষে বলেন, এটি আমার বহু আকাক্সিক্ষত প্রকল্প। এ প্রকল্পের কৃতিত্ব সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত ও মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর। তিনি বলেন, ক্লিনিক্যাল বর্জ্যে থাকা ক্যান্সারের রোগীর রক্তও এখানে জমা হয়। এগুলো যদি ছড়িয়ে পড়ে, তবে সুস্থ মানুষও আক্রান্ত হবে।
ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজ শুরু হওয়ায় বিভিন্ন হাসপাতাল ও ক্লিনিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন মেডিকেল ওয়েস্ট ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের ডিস্ট্রিক্ট কো-অর্ডিনেটর মো. মইনুল ইসলাম।
এদিকে পরিবেশকর্মীদের দাবিও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে এলাকার পরিবেশ প্রতিবেশ রক্ষার। শুধু ক্লিনিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নয়, অন্যন্য অপচনশীল বর্জ্যও সঠিক ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার দাবি সেভ দ্যা হেরিটেজ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টের প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল হাই আল হাদীর। তিনি বলেন, পারাইরচকে আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটা সময় দেওয়া উচিত। ইতঃপূর্বে মেয়রের সাথে পরিবেশকর্মীদের বৈঠকে বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনিও একটু সময় চেয়েছেন। ভালো কিছু পাবার জন্য সাময়িক কষ্ট হলেও তা মেনে নিতে হবে।
পারাইরচকে উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পরিবেশ, প্রতিবেশ রক্ষা ও পারাইচকের হাওড় বিলের আগে জৌলুস ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি। এছাড়া নগরীর বর্জ্য ফেলার স্থান দূরবর্তী স্থানে নিয়ে যাওয়ার তাগিদ স্থানীয়দের।