বিএনপি-ঐক্যফ্রন্টের ভাবনায় সায় কিছু বামেরও

20

সরকারবিরোধী আন্দোলন জোরদার করতে বিভিন্ন দলকে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টে টানতে চেয়েছিল বিএনপি। কিন্তু এখন পর্যন্ত এ জোটে কেউ আসেনি। তাই সরকারবিরোধী কোনো ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলন করার কথা ভাবছে বিএনপি ও ঐক্যফ্রন্ট। বাম দলগুলোর কারও কারও তাতে সায় আছে।

নির্বাচনের পর কিছু ঘটনায় ঐক্যফ্রন্টে শরিক দলগুলোর মধ্যে অসন্তোষ ছিল। নিজেদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক বৈঠকও তেমন হয়নি। এর মধ্যেই কাদের সিদ্দিকী তাঁর দল কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ নিয়ে ঐক্যফ্রন্ট থেকে বের হয়ে যান। জোটের শরিক দলগুলো এত দিন নিজেদের মতো করে বিভিন্ন সভা–সমাবেশ করে এসেছে। তবে আবারও তারা বৈঠক শুরু করেছে। বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যার ঘটনায় ঐক্যফ্রন্ট নাগরিক সভা করেছে এবং আরও কিছু কর্মসূচির ঘোষণাও দিয়েছে।

ঐক্যফ্রন্টের অন্যতম বড় দল বিএনপিও তাদের নানা কর্মসূচি পালন করেছে। এখন ঐক্যফ্রন্টকেন্দ্রিক কর্মসূচিকেও প্রাধান্য দিচ্ছে। বিএনপির এক দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, বিএনপি ঐক্যফ্রন্টকে নিয়েই সামনে এগোতে চায়। দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর চিকিৎসা শেষে সিঙ্গাপুর থেকে ফিরলে আরও জোরদার আলোচনা হবে বলে জানায় এই সূত্র। যুগপৎ আন্দোলন বিএনপিও চায়। তবে কোনো জোটে কেউ সরাসরি যুক্ত না হতে চাইলে বিএনপি তখন যুগপৎ আন্দোলনের দিকে এগোবে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ বিষয়ে প্রথম আলোকে বলেন, এক দফার ভিত্তিতে যখন সবাই একমত হবে, সরকারের পতনের লক্ষ্যে যারা যারা একমত হবে, তাদের নিয়ে আন্দোলন হতে পারে। তিনি বলেন, ‘দলে একটা ধারণা আছে যে কমন ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলনে যারা রাজি হবে, তাদের সঙ্গে বিএনপি কাজ করবে। কমন ইস্যুতে যুগপৎ আন্দোলনে আমাদের মতামত আছে। এ নিয়ে কিছু আলাপ-আলোচনাও হচ্ছে।’

বিভিন্ন সময়ে ঐক্যফ্রন্টে বাম জোটকে আসার আহ্বান জানানো হয়। ডানপন্থী দলগুলোর প্রতিও আগ্রহ ছিল। তবে জোটের এক শীর্ষ নেতা জানান, বাম দলগুলোর প্রতি বেশি আগ্রহী ঐক্যফ্রন্ট। এখনো তারা চেষ্টা করছে তাদের একসঙ্গে করার। তা না হলে যুগপৎ বা সমন্বিত আন্দোলনে যাবে।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের শরিক দল বাংলাদেশের বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক ঐক্যফ্রন্টের কয়েকটি শরিক দলের অনুষ্ঠানে যোগ দেন। ঐক্যফ্রন্টে আসা বা যুগপৎ আন্দোলন নিয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘যুগপৎ আন্দোলন করার কোনো আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব আমরা পাইনি। আমরা বাম জোট রাজপথে আছি। সরকারের যে স্বৈরচারী মনোভাব ও কর্তৃত্ববাদী শাসন, তার বিরুদ্ধে এবং এই সংসদ বাতিল করে নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে মাঠে আছি। আমরা যেটা বলেছি যে আপনারাও আপনাদের মতো করে অবস্থান নিন। রাজপথে এই আন্দোলন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে মানুষের মধ্যে আস্থার একটা জায়গা তৈরি হতে পারে। প্রতিটি দল ও জোটের স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে যার যার অবস্থান থেকে কমন বিষয়গুলোতে রাজপথে থাকব। সমন্বিত ও যুগপৎভাবে আন্দোলন হতে পারে বলে আমাদের দল থেকে বলেছি।’

ঐক্যফ্রন্ট থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পেলে সেটা বাম জোটে আলোচনা করা হবে বলে জানান সাইফুল হক। তিনি বলেন, রাজপথে আন্দোলনের মধ্য দিয়ে কিন্তু ঐক্য গড়ে উঠতে পারে। তবে এর রাজনৈতিক কাঠামো কী হবে, তা ভবিষ্যতে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। তিনি মনে করেন, বর্তমান অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক সব শক্তিকে রাজপথে ঐক্যবদ্ধভাবে নামা দরকার। তিনি আরও বলেন, রাজপথের ঐক্য আগে গড়ে তোলা দরকার। শুরুতে নিজ নিজ জায়গা থেকে আন্দোলন হতে পারে। এরশাদবিরোধী আন্দোলনও কিন্তু একইভাবে শুরু হয়েছিল। আন্দোলন বিকাশের পর্যায়ে গিয়ে বোঝাপড়ার পর আলোচনা হতে পারে।

বাম গণতান্ত্রিক জোটের আরেক নেতা গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক জোনায়েদ সাকি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বর্তমান স্বৈরাচারী শাসনের অবসানের লক্ষ্যে কার্যকরী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানুষের ভোটাধিকার প্রতিষ্ঠায় আমরা আন্দোলনের কথা বলে আসছি। যারা গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করতে চায়, সেই সব শক্তির প্রতি আহ্বান জানিয়েছি যে রাজপথে আসুন, রাজপথেই আন্দোলনের নতুন সমীকরণ তৈরি হবে এবং ঐক্যেরও নতুন সমীকরণ তৈরি হবে। টেবিলের ঐক্য দিয়ে কোনো সংগ্রাম হয় না। আমরা নিজেরা রাজপথে আছি, রাজপথে লড়াইয়ে আহ্বান জানাই। রাজপথের আন্দোলনে ঐক্যের নতুন সমীকরণ হবে।’

তবে বাম গণতান্ত্রিক জোটের অন্যতম দল সিপিবি এ ব্যাপারে এখনো কিছু ভাবছে না। সিপিবির সাধারণ সম্পাদক শাহ আলম প্রথম বলেন, ‘আমরা কোনো জোটে যেতে চাই না। যুগপৎ নিয়ে কোনো কিছু ভাবিনি আমরা।’

বাম জোটের কয়েকটি দলের ঐক্যফ্রন্টের সঙ্গে আন্দোলনে সায় থাকলেও সিপিবি আগ্রহী না। আর জোটগত ভাবে না এলে বাম দলগুলো স্বতন্ত্রভাবেও কেউ এখনই অন্য কোনো জোটের আন্দোলনে যুক্ত হতে চায় না। ঐক্যফ্রন্টের এক শীর্ষ নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বামরা সবকিছুই বুঝে কিন্তু ওরা সিপিবির আঁচলে বাধা। সিপিবি নিজেদের এখনো স্বাধীন দল হিসেবে ভাবতে শেখেনি।

ঐক্যফ্রন্ট নেতা ও গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি সুব্রত চৌধুরী বাম দলগুলোর ব্যাপারে আশাবাদী। তিনি বলেন, ‘তারাও সরকারের সমালোচনা করে যাচ্ছে। অনেক বিষয়ে তাদের সঙ্গে আমাদের মিলে যাচ্ছে। আমরা যে যার মতো আন্দোলন করছি। এটা একপর্যায়ে গিয়ে যুগপৎ হবে বলে আশা করছি।’ ঐক্যফ্রন্টের আরেক শীর্ষ নেতা জাফরুল্লাহ চৌধুরীও মনে করেন, বাম দলগুলো পরিস্থিতি বিবেচনায় হয়তো একসঙ্গে আন্দোলনে করবে।