মিতু হত্যার তদন্ত তিন বছরেও শেষ হয়নি

4

সরকারের বিভিন্ন পর্যায় থেকে বারবার আশ্বাস দেওয়ার পরও গত তিন বছরে মাহমুদা খানম (মিতু) হত্যার তদন্ত পুলিশ শেষ করতে পারেনি। কখনো পুলিশ বলছে তদন্ত শেষ পর্যায়ে, আবার কখনো বলেছে ওপরের নির্দেশ পেলেই আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দেওয়া হবে। মাহমুদার স্বামী সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তার।

দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা এ হত্যাকাণ্ডের তদন্ত এখনো শেষ না হওয়ায় হতাশ মাহমুদার বাবা মোশাররফ হোসেন। তিনি নিজেও পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত পরিদর্শক। গতকাল শুক্রবার তিনি আক্ষেপ করে বলেন, নুসরাতের (ফেনীর মাদ্রাসাছাত্রী নুসরাত জাহান) মা–বাবা অন্তত এতটুকু সান্ত্বনা পাবে, তাঁদের মেয়েকে খুনের ঘটনায় আদালত রায় ঘোষণা করেছেন। আর মাহমুদাকে খুনের ঘটনায় বিচার দূরে থাক, তদন্তই শেষ হয়নি। এ অবস্থায় মাহমুদা হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তার পরিবর্তন চান তিনি। তদন্ত কর্মকর্তাকে পরিবর্তন এবং নতুন করে এই মামলার তদন্তের দায়িত্ব পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) দিতে কিছুদিনের মধে৵ আদালতে আবেদন করবেন বলে জানান মাহমুদার বাবা।

২০১৬ সালের ৫ জুন ভোরে চট্টগ্রাম শহরের জিইসি মোড়ে ছেলেকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় কুপিয়ে ও গুলি করে হত্যা করা হয় মাহমুদা খানমকে।

মাহমুদার বাবা মোশাররফ হোসেন মুঠোফোনে প্রথম আলোকে বলেন, নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার মামলায় যদি ৬১ কার্যদিবসে আসামিদের ফাঁসির আদেশ দেওয়া সম্ভব হয়, তাহলে তাঁর মেয়েকে হত্যা করার মামলায় কেন তা হবে না। অবসরপ্রাপ্ত এই  পুলিশ কর্মকর্তার অভিযোগ, ‘বাবুলকে বাঁচাতে পুলিশ গড়িমসি করছে।’

 ৬৭ বছর বয়সী মোশাররফ হোসেন বলেন, মৃত্যুর আগে মেয়ে হত্যার বিচার দেখে যেতে যান তিনি। এই মামলার তদন্ত সঠিকভাবে না হলে পুলিশ বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে বলেও মনে করেন তিনি।

মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের পর বাবুল আক্তার বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় তিনজনকে আসামি করে পাঁচলাইশ থানায় মামলা করেন। বাবুল তখন চট্টগ্রাম থেকে বদলি হয়ে ঢাকায় পুলিশ সদর দপ্তরে এসপি (পুলিশ সুপার) পদে সংযুক্ত ছিলেন। মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের মোড় ঘুরতে শুরু করে ২০১৬ সালের ২৪ জুন ডিবি কার্যালয়ে বাবুল আক্তারকে জিজ্ঞাসাবাদের পর। এ সময় হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে। ওই বছরের ৬ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে জানানো হয়, বাবুলের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁকে চাকরিচ্যুত করা হলো।

মাহমুদা হত্যাকাণ্ডের তিন সপ্তাহ পর মো. ওয়াসিম ও মো. আনোয়ার নামের দুই আসামিকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁরা আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তাঁরা বলেন, কামরুল শিকদার ওরফে মুছার নেতৃত্বে হত্যাকাণ্ডে তাঁরা সাত-আটজন অংশ নেন। গোয়েন্দা কর্মকর্তা হিসেবে বাবুল চট্টগ্রামে দায়িত্ব পালনের সময় মুছা তাঁর ঘনিষ্ঠ সোর্স হিসেবে কাজ করতেন। পরে মুছার সন্ধান চেয়ে পাঁচ লাখ টাকা পুরস্কার ঘোষণা করে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ।

২০১৬ সালে কুপিয়ে ও গুলি করে মিতুকে হত্যা করা হয়
স্বামী বাবুলকে ঢাকায় ডিবি কার্যালয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়
হত্যায় বাবুলের সম্পৃক্ততা রয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে
হত্যা মামলার তদন্তের দায়িত্ব পিবিআইকে দেওয়ার দাবি

মাহমুদা খুন হওয়ার ১৭ দিন পর মুছাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যায় বলে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে জানান মুছার স্ত্রী পান্না আক্তার। তবে পুলিশ বরাবরই মুছাকে গ্রেপ্তারের কথা অস্বীকার করে আসছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাহমুদা হত্যায় অংশ নেন ওয়াসিম, আনোয়ার, মো. রাশেদ, নবী, মো. শাহজাহান মিয়া, মুছা ও মো. কালু। হত্যাকাণ্ডের জন্য অস্ত্র সরবরাহ করে সন্ত্রাসী এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা। তাঁদের মধ্যে নবী ও রাশেদ ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হন। মুছা ও কালু এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে, এহতেশাম এই মামলায় জামিন পেলেও অন্য মামলায় কারাগারে আছেন। অন্য আসামিরা জামিনে রয়েছেন।

মাহমুদা হত্যাকাণ্ডে বাবুল আক্তারের জড়িত থাকার কোনো তথ্য পাওয়া গেছে কি না, জানতে চাইলে গতকাল বিকেলে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (প্রসিকিউশন) মো. কামরুজ্জামান বলেন, ‘তদন্ত চলছে’। তদন্ত প্রতিবেদন কবে জমা দেওয়া হবে, এই প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘সময় হলে জানতে পারবেন’।

ঘটনার শুরু থেকেই মামলাটি তদন্ত করছেন পুলিশ কর্মকর্তা কামরুজ্জামান। তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তন ও পিবিআইকে তদন্তভার দিতে মাহমুদার বাবার দাবির বিষয়ে তিনি বলেন, এটি যে কেউ করতে পারেন।

মামলার বাদী ও সাবেক পুলিশ সুপার বাবুল আক্তারের বক্তব্য জানতে গতকাল বিকেলে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হয়। কিন্তু রিং হলেও তিনি ফোন ধরেননি।

মেয়েকে হত্যার বিচার পেতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চেয়েছেন মাহমুদার মা শাহিদা মোশাররফ। গতকাল বিকেলে মুঠোফোনে তিনি বলেন, অপরাধী যে–ই হোক, কাউকে ছাড় দিচ্ছেন না প্রধানমন্ত্রী। ফেনীর নুসরাতের মতো তাঁর মেয়ের হত্যাকারীরও যেন শাস্তি হয়।