সিকন্দরপুরে গভীররাতে গুলির শব্দে ঘুম ভাঙে মানুষের

248

শিপন আহমদ, ওসমানীনগর
আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে ওসমানীনগরের সিকন্দরপুর (পশ্চিমগাঁও) গ্রামে আবারো প্রতিরাতে ফাঁকাগুলি ছুঁড়ে আতংকের সৃষ্টি করা হচ্ছে। মধ্যরাতে ঘুমন্ত গ্রামবাসী হঠাৎ গুলির শব্দে দিশেহারা হয়ে পড়েন। ২০১৩ সালে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যাওয়া আব্দুল কদ্দুস হত্যা মামলায় সন্দেহজনক হিসাবে চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর দিবাগত রাতে মৃত প্রমেশ সূত্রধরের পুত্র প্রণধির সূত্রধরকে আটক করে সিইডি পুলিশ। প্রণধির সূত্রধর আটকের পর থেকে প্রায়ই রাতের বেলা গুলির শব্দ শুনতে পাচ্ছেন স্থানীয়রা। এতে এলাকায় নতুন করে আতংকের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা যায়, ওসমানীনগরের সিকন্দরপুর গ্রামে পূর্ব বিরোধের জের ধরে বিবাদমান পক্ষগুলোর মধ্যে প্রতিদিনই ঘটছে অনাকাংখিত ঘটনা। গভীর রাতের এই জ্বালাও-পোড়াও এবং গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভেঙে আতঙ্কিত হয়ে ছুটাছুটি করেন পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলোর লোকজনও। প্রবাসী অধ্যুষিত এলাকা হিসেবে পরিচিতি সিকন্দরপুর এখনও আগের মতো হামলা-মামলার পাশাপাশি অগ্নিসংযোগ ও গোলাগুলির জনপদ হিসেবে ফের পরিচিতি লাভ করতে যাচ্ছে। গোলাগুলির খবর পেয়ে থানাপুলিশ সিকন্দপুর গ্রামে গেলেও দুর্বৃত্তরা গাঁ ঢাকা দিলে ব্যর্থ হয় পুলিশের অভিযান। তবে ওই গ্রামে একাধিক লাইসেন্সধারী বন্দুক থাকার পরও একাধিবার প্রশাসন এ গ্রাম থেকে বিপুল পরিমাণ অবৈধ অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করেছে। এখনও সামান্য ঘটনাকে কেন্দ্র করে একে অপরকে লক্ষ্য করে ছুঁড়ছে ফাঁকাগুলি। গুলির বিষয়টি স্বীকার করলেও কারা গুলি ছুঁড়ে আতংক ছড়াচ্ছে তাদের নাম বলতে নারাজ স্থানীয়রা।
সরেজমিনে সংবাদিকরা গ্রামে গেলেও নাম প্রকাশ না করার শর্তে গ্রামের অনেকেই জানান, আমরা রাতে গুলির শব্দ শুনতে পাই। কিন্ত কে বা কারা এ রকম আতংক সৃষ্টি করছে তা বলা মুশকিল। তবে দীর্ঘ দুই যুগ ধরে গ্রামের পশ্চিমগাঁওয়ে প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে বিরোধ চলে আসছে। বিষয়টি নিস্পত্তি হলেও সম্প্রতি গ্রামের প্রণধির সূত্রধর আটকের পর আবারও অস্ত্রবাজরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠার আশংকা তৈরি হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সম্প্রতি প্রতিরাতে গোলাগুলির শব্দে ঘুম ভাঙে স্থানীয়দের। অস্ত্রের ঝনঝনাতিতে অধিকাংশ মানুষ বাইরে থাকায় গ্রামের ওই এলাকায় নিরিবিলি স্থানগুলোতে ইদানিং বিভিন্ন রকমের জুয়া ও মাদকের আগ্রাসনও লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
২০১২ সালে সিলেটের তৎকালীন পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাখাওয়াত হোসেন এই গ্রামের দুই পক্ষের বিরোধ নিস্পত্তিকরণে চেষ্টা চালান। এরই ধারাবাহিকতায় উপজেলার সচেতন নাগরিক সমাজের আহবানে ও সিলেট জেলা পুলিশের উদ্যোগে বিরোধপূর্ণ সিকন্দরপুর গ্রামে ‘বার্ষিক ‘মোবিলাইজেশন কন্টিনজেন্ট ক্যাম্প’ স্থাপনের ফলে এলাকার পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত ছিল।
২০১৬ সালের ইউপি নির্বাচনের পর আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিলো সিকন্দরপুরের ‘ভিলেজ পলিটিক্স’। একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে উঠলে আবারও আতংক ছড়াতে থাকে সিকন্দরপুরে। ওই সময় প্রতিরাতেই ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে এলাকায় আতংকের সৃষ্টি করা হয়। অস্ত্রের ঝনঝনানিতে সিকন্দরপুর ও পাশর্^বর্তী গ্রামের অনেক পরিবার ভয়ে এলাকা ছাড়তে বাধ্য হয়।
‘ভিলেজ পলিটিক্স’-কে কেন্দ্র করে একপক্ষ অন্যপক্ষকে ঘায়েল করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ২০১৭ সালে এই বিরোধ নিস্পত্তিকরণের উদ্যোগ নেন স্থানীয় উমরপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া। জেলা আওয়ামী লীগের নেতৃবৃন্দ ও উপজেলার ৮ ইউপি চেয়ারম্যানের সমন্বয়ে কয়েক দফা বৈঠকের পর সিকন্দরপুরের এই দীর্ঘবিরোধ আপস নিস্পত্তি হয়।
উমরপুর ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম কিবরিয়া বলেন, সিকন্দরপুর গ্রামের গোলাগুলির বিষয়টি নতুন নয়। পূর্বের বিরোধের বিষয়টি আপস নিস্পত্তি হলেও গত কিছুদিন থেকে আবারো রাতে ফাঁকাগুলি ছোঁড়া হচ্ছে। বিষয়টি জানতে পেরে আমি মাসিক আইনশৃঙ্খলা কমিটির সভায় ও থানার ওসিকে অবগত করেছি।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আফজালুর রহমান চৌধুরী নাজলু বলেন, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে সিকন্দরপুর গ্রামে একের পর এক ঘটনা ঘটছে। বিষয়টি একাধিকবার আপস নিস্পত্তি হয়েছে। তারপরও গত কিছুদিন থেকে আবারও রাতের আঁধারে গুলির হওয়ার ঘটনায় আতংক বিরাজ করছে।
গ্রামের আব্দুল কদ্দুস হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির এসআই আব্দুল হাদি বলেন, ওই হত্যা মামলায় প্রণধিরকে আটক করা হয়েছে। আদালতের মাধ্যমে তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদের পর তার দেয়া তথ্যগুলো যাচাইবাছাই চলছে। তদন্তের স্বার্থে এ ব্যাপারে বিস্তারিত বলা যাচ্ছে না।
ওসমানীনগর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) রাশেদ মোবারক বলেন, আমি এ থানায় নতুন। যতদুর জানি ওইগ্রামে প্রচুর লাইসেন্সধারী অস্ত্র রয়েছে। প্রতি রাতে গুলি ছোঁড়ার বিষয়টি আমার জানা নেই। এমন হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে। কোনো অবস্থায় এলাকায় আতংক সৃষ্টি করা চলবে না।