উচ্ছেদের সময় দৌড়, ১৫ মিনিট পর আবার আগের জায়গায়

9

সকাল প্রায় ১০টা। রাজধানীর কারওয়ান বাজারের কিচেন মার্কেটের পাশের রাস্তায় শোরগোল। সিটি করপোরেশনের উচ্ছেদ অভিযান চলছে। ফুটপাতে নানা জিনিসের পসরা নিয়ে বসা ছোট ছোট দোকান উচ্ছেদ করা হচ্ছে। আজ মঙ্গলবার এই উচ্ছেদ পরিচালনা করে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের (ডিএনসিসি) একটি দল।

দোকান বলতে চাটাই বা ঝাঁকা নিয়ে বসা ঠিকে আয়োজন। শাকসবজি, ফলমূল, সস্তা প্রসাধন, চুড়ি-ফিতা, ইঁদুর-তেলাপোকা মারার ওষুধ—এসব নিয়ে বসে ছিলেন স্বল্প আয়ের দোকানিরা।
প্রায়ই এসব ‘অবৈধ’ দোকান উচ্ছেদ করা হয়। আজও হলো। আর আরেকটি নৈমিত্তিক ঘটনাও ঘটল। উচ্ছেদের প্রায় মিনিট ১৫-এর মধ্যে ফুটপাত ফিরে গেল আগের চেহারায়। সেই দোকানিরা আবার ফিরে এলেন। বসে গেলেন যে যাঁর পণ্য নিয়ে।
কিচেন মার্কেটে ছেড়ে উচ্ছেদ দল তখন উচ্ছেদ চালাচ্ছে কারওয়ান বাজারের ২ নম্বর ভবন লাগোয়া ফুটপাতের দোকানগুলোতে। ৮০ থেকে ১০০ গজ পেছনে তখন দিব্যি বসে গেছেন জরিনা বেগম। ফুটপাতে একটি টুলের ওপর বসে বিক্রি করছেন ধনেপাতা। তাঁর সামনে বিছানো প্লাস্টিকের ব্যাগ ও একটি প্লাস্টিকের ঝুড়িতে আছে পণ্য।
প্রায় ১০ বছর ধরে এ বাজারে বিভিন্ন ধরনের সবজি বিক্রি করেন জামালপুরের মেলান্দহের এই নারী। থাকেন তেজগাঁও বস্তিতে। আজ উচ্ছেদ হলেও তাঁর কোনো পণ্য নষ্ট হয়নি। জরিনা বলেন, ‘হেরা আইতেই আমি মালামাল নিয়্যা দৌড় লাগাইছি। মার্কেটের ভেতরে পলাইয়া ছিলাম। কুনু ক্ষতি হয় নাইক্যা।’

জরিনা জানান, এমন অভিযান তাঁর গা-সওয়া। মাঝেমধ্যেই এমন অভিযান হয়। আজকের মতো ভাগ্য ভালো হলে কোনো ক্ষতি হয় না। আবার কখনো উচ্ছেদের কবলে পড়ে মালামাল খোয়াতে হয়।
অনিশ্চয়তার মধ্যে কেন থাকা? জরিনার উত্তর, ‘কই যাইতাম কন? কিছু পুঁজিপাট্টা লইয়া ব্যবসা করি। আর কী করুম, পরিশ্রম কইরাই তো খাই।’

জরিনার পাশেই পাকা পেঁপে নিয়ে বসেছেন মো. হুমায়ুন কবির। তবে প্রতিবেশী জরিনার মতো তাঁর ভাগ্য ‘সুপ্রসন্ন’ ছিল না। অভিযানের সময় আট কেজি পেঁপে নষ্ট করে ফেলা হয়েছে বলে জানান হুমায়ুন। তাঁর কথা, ‘দিনে তিন গ্রুপরে ৩০ ট্যাকা কইরা ৯০ ট্যাকা দেই। এমনি বসি না।’

কিচেন মার্কেটে ছেড়ে ২ নম্বর মার্কেটের সামনে যখন উচ্ছেদ চলছে, তখন এর ফুটপাতেই আলু আর শিম পলিথিনের বস্তায় বিছিয়ে বসেছেন সালেহা খাতুন। জানালেন, ছোট বুলডোজার দিয়ে যখন ভাঙচুর চলছিল তখন পণ্য রেখেই ছুটে পালিয়েছিলেন। আবার কিছু টাকা দিয়ে এসব কিনে বসেছেন।

এ মার্কেটের ফুটপাতে উচ্ছেদ অভিযানে ব্যস্ত ডিএনসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. আমিনুল ইসলাম। উচ্ছেদের কয়েক মিনিটের মধ্যে আবার ফুটপাতজুড়ে দোকানিদের বসে যাওয়ার কথা বললাম তাঁকেও। উত্তরে যুগ্ম সচিব আমিনুল ইসলাম বললেন, ‘এটা একটি চলমান প্রক্রিয়া। আমরা উচ্ছেদ করি কিন্তু আবার বসে যায়। এই অবস্থা থেকে উত্তরণে গণমাধ্যমসহ সবার সহযোগিতা লাগবে।’

উচ্ছেদের পরপরই ফুটপাতে আবার বসে অস্থায়ী দোকান। ছবি: প্রথম আলোউচ্ছেদের পরপরই ফুটপাতে আবার বসে অস্থায়ী দোকান।

কারওয়ান বাজারের ফুটপাতের অবৈধ দোকান উচ্ছেদ, ভাঙচুর আবার সেখানে বসে যাওয়ার এই বৃত্ত ভাঙবে কবে? এমন প্রশ্ন করলেন মগবাজার থেকে আসা ক্রেতা বায়েজিদ হোসেন। তাঁর কথা, ‘মাঝখান থেকে স্বল্প আয়ের, স্বল্প পুঁজির কিছু মানুষের ক্ষতি হয়। কিন্তু এসব মানুষকে যারা ফুটপাতে বসিয়ে অবৈধ চাঁদাবাজি চালিয়ে যাচ্ছে, এদের তো কিছু হয় না।’

বায়েজিদ হোসেনের মুখের এই প্রশ্নটাই করলাম ডিএনসিসির মেয়র আতিকুল ইসলামকে। মুঠোফোনে মেয়র বললেন, ‘উচ্ছেদ একটি চলমান প্রক্রিয়া। স্থায়ীভাবে কারা দখল করেছে, এটাই বিচার্য বিষয়। এভাবে যারা বসছে, তারা যেন কখনো মনে না করে যে তারা এখানে বৈধ। এসব অবৈধ দোকানি নিজেদের বৈধ হিসেবে যেন বসতে না পারে, সে জন্যই এই অভিযান।’

ফার্মগেটে তেজগাঁও কলেজের পাশের রাস্তার ফুটপাতে দীর্ঘদিনের বাজার উচ্ছেদের উদাহরণ দেন মেয়র আতিক। এখন এই রাস্তাটি হকারশূন্য। মেয়র বলেন, এটি একটি উদাহরণ।

কারওয়ান বাজারে স্বল্প পুঁজির এসব ব্যবসা একটি বাস্তবতা। এসব দোকানের চাহিদাও যথেষ্ট। কিন্তু উচ্ছেদের সময় নিত্য ক্ষতি মেনে নেওয়া আবার বসা, এই বৃত্ত ভাঙবে কবে?
মেয়র বলেন, ‘আমরা হকারদের সঙ্গে কথা বলেছি। দিনের একটি নির্দিষ্ট সময় নির্দিষ্টসংখ্যক হকারের বসার জন্য একটি পরিকল্পনা আমাদের আছে।’

কারওয়ান বাজারে ফুটপাতের দোকানিদের কাছে থেকে চাঁদা আদায়কারী চক্র সম্পর্কে মেয়রের বক্তব্য, ‘এর আগে কেউ কেউ বলেছে দিনে দুই লাখ টাকা চাঁদা ওঠে। আমরা এর উৎস জানতে চেয়েছিলাম, কেউ বলতে পারেনি।’

সূত্র ঃ প্রথম আলো