সিলেটে লবণের দাম বাড়ার গুজব বিভিন্নস্থানে ব্যাবসায়ীদের জরিমানা

10

স্টাফ রিপোর্টার
‘লবণের দাম বেড়ে গেছে’ সিলেট বিভাগজুড়ে এমন গুজব ছড়িয়ে পড়ার পর গত সোমবার সন্ধ্যা-রাতেই সব খুচরা দোকানের লবণ বিক্রি হয়ে গেছে। এ সুযোগে অনেক অসাধু ব্যবসায়ী লবণের গায়ের মূল্যের চেয়ে দু-তিন গুণ বেশি দামে লবণ বিক্রি শুরু করেন। এ অবস্থায় রাতেই সরকারি গোয়েন্দা সংস্থা, পুলিশ, র‌্যাব ও জেলা প্রশাসন ঝটিকা অভিযান চালিয়ে গুজব নিয়ন্ত্রণ করে। তবে গতকাল মঙ্গলবার সকালে নগরের বিভিন্ন ভোগ্যপণ্যের দোকান ঘুরে দেখা গেছে, প্রায় দোকানেই লবণ নেই।
গত সোমবার সন্ধ্যায় এক নিমিষেই লবণ বিক্রি হয়। তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, লবণের দাম বাড়েনি। হঠাৎ করে লবণের চাহিদা বাড়ায় এই মুহূর্তে দোকানে লবণ নেই। লবণের অর্ডার দেয়া হয়েছে দুপুর নাগাদ দোকানে পাওয়া যাবে। লবণের দাম বাড়েনি বরং ফ্রেশ লবণের বস্তাপ্রতি ১৫ টাকা দাম কমেছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। নগরের নবাব রোড এলাকার আল সাফা ফ্যামেলি শপ, ফাতেমা স্টোর, ওসমানী মেডিকেল কলেজ রোডের লিবার্টি সুপার স্টোরে গিয়ে দেখা গেছে দোকানে লবণ নেই। তবে এসব দোকানের মালিকরা জানিয়েছেন, লবণের কোনো সংকট নেই, পর্যাপ্ত মজুত আছে। ফাতেমা স্টোরের ব্যবস্থাপক গোলাম জিলানী বলেন, সোমবার সন্ধ্যায় আমাদের দোকানে দুই বস্তা লবণ ছিল। সবই বিক্রি হয়ে গেছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে। তবে আমরা লবণের গায়ের মূল্যে লবণ বিক্রি করেছি। এখন দোকানে লবণ নেই। নতুন করে লবণের ওর্ডার দেয়া হয়েছে। দুপুর নাগাদ লবণ পাওয়া যাবে। তিনি আরও বলেন, লবণের দাম বাড়েনি বরং ফ্রেশ লবণের দাম বস্তাপ্রতি ১৫ টাকা কমেছে বলে কোম্পানি থেকে জানানো হয়েছে। আল সাফা ফ্যামেলি শপের মালিক জাহাঙ্গীর চৌধুরী বলেন, দেশের বাজারে লবণের কোনো সংকট নেই। অথচ সোমবার সন্ধ্যা-রাতে এই লবণ নিয়ে ঘটে গেছে তুঘলকি কান্ড। মুহূর্তের মধ্যে আমার দোকানে থাকা তিন-চার বস্তা লবণ বিক্রি হয়ে গেছে। এখন আর কোনো লবণ নেই। নতুন করে লবণের ওর্ডার দিয়েছি। বিকেল নাগাদ লবণ পাওয়া যাবে।
উল্লেখ্য, গত সোমবার বিকেলে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে একদল ব্যবসায়ী অসৎ উদ্দেশ্যে গুজব ছড়িয়ে শুধু সিলেট নগর নয়, বিভাগজুড়েই বেশি দামে লবণ বিক্রি করে ফায়দা লুটে। সিলেটের জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসন বলছে, সিলেটের সাধারণ মানুষকে বোকা বানিয়ে ফায়দা লুটছে একটি চক্র। তবে সোমবার রাতেই এই চক্রকে গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন উপজেলায় এবং নগরের প্রতিটি পাড়ামহল্লায় অভিযান চালিয়ে জরিমানা, সচেতনতামূলক মাইকিংসহ অভিযান জোরদার করা হয়েছে। সাধারণ ক্রেতাদের বিভ্রান্ত না হওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে।
এদিকে গতকাল মঙ্গলবার নগরীতে ভোক্তা ও সিসিকের যৌথ অভিযানে ১৫টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর সকাল থেকে নগরীর কাজিটুলা, আম্বরখানা ও শাহী ঈদগাহর ৫টি দোকানে এ জরিমানা করা হয়। জরিমানা করা দোকানগুলো হচ্ছে, কাজীটুলা জনতা স্টোরকে ৩ হাজার, শাহী ঈদগাহ বেগম স্টোরকে ৩ হাজার, ধানসিড়ি রুবেল স্টোরকে ২০ হাজার, আব্দুল্লাহ স্টোরকে ৭ হাজার ও আম্বরখানা ফরিদ স্টোরকে ৮ হাজার টাকা। এছাড়া মূল্যতালিকা না থাকায় শাহপরাণ এলাকায় সাফা স্টোরকে ৪ হাজার টাকা ও অলক স্টোরকে দেড় হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এ অভিযান পরিচালনা করেন ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর সিলেট বিভাগীয় কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. ফয়জুল্লাহ। এদিকে একই দিনে শাহপরাণ এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেছেন ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তর সিলেট জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম। এসময় বিভিন্ন অপরাধে বালুচর বিসমিল্লাহ স্টোরকে ৭ হাজার টাকা, মেডিসিন স্টোরকে ৩ হাজার টাকা ও নাহার মেডিসিন স্টোরকে ৬ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সিসিকের অভিযানে ৩টি দোকানে জরিমানা আদায়। সকালে নগরীর বন্দরবাজার, লালবাজার ও ব্রক্ষময়ী বাজারের ৩টি মুদি দোকানে অতিরিক্ত মূল্যে পেঁয়াজ বিক্রি করার অপরাধে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। জরিমানাকৃত ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হলো ইনসাফ গ্রোসারী ১০ হাজার, এসএম ট্রেডার্স ২০ হাজার ও আনিস মিয়া ষ্টোর ১০ হাজার টাকা। সিসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তা শাহাব উদ্দিন শিহাব জানান, মেয়রের নেতৃত্বে সিসিকের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা মো. জসীম উদ্দিন এ অভিযানে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং তিনটি দোকানে ৪০ হাজার টাকা জরিমানা করেন। এর আগে মেয়র নগরীর লালবাজারে বিভিন্ন মাংসের দোকানেও অভিযান চালানো হয়। মদিনা মার্কেটের ৩টি কালিঘাটের ১টি দোকানে জরিমানা করা হয়েছে। মদিনা মার্কেটে তিন ব্যবসায়ীকে ৩৫ হাজার টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত। সোমবার রাত ১২ টায় জেলা প্রশাসনের মোবাইল টিম এ জরিমানা আদায় করে। এরমধ্যে, আপ্তাব ম্যানশনের বিআর স্টোরকে ১৫ হাজার টাকা, রণজিৎ স্টোরকে ১৫ হাজার এবং সায়েম টেডার্সকে ৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। সন্ধ্যায় নগরীর কালীঘাট এলাকার শিমুল স্টোরকে ৪৪ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। এসময় ২ টি লবন ভর্তি ভ্যান ও ১ টা রিকশাও আটক করা হয়।
হবিগঞ্জ : প্রতিনিধি জানান, হবিগঞ্জ শহরসহ আশপাশের এলাকায় লবণের দাম বৃদ্ধির গুজব ছড়ানোয় চৌধুরী বাজার এলাকায় ৪ জনকে দন্ড দিয়েছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত সোমবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসির আরাফাত রানার নেতৃত্বে পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালত এ দন্ড প্রদান করেন। ২ জনকে ১০ দিন করে কারাদন্ড ও ২ জনকে অর্থদন্ড দেওয়া হয়।
১০ দিন করে কারাদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন-শহরের রাজনগর এলাকার ব্যবসায়ী মো. আব্দুল কাদির নানু ও বাতিরপুর এলাকার কানাই দাসের ছেলে সুরঞ্জিত দাস। এক হাজার টাকা করে অর্থদন্ডপ্রাপ্তরা হলেন-চৌধুরী বাজার এলাকার রাজকুমার রায়ের ছেলে মিঠুন রায় ও নোয়াহাটি এলাকার রবিন্দু পালের ছেলে রঞ্জিত পাল।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ইয়াসির আরাফাত রানা বলেন, ‘সন্ধ্যার পর থেকেই হবিগঞ্জ শহরসহ আশপাশের এলাকায় গুজব রটে লবণের দাম বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে শহরের চৌধুরী বাজার এলাকায় গিয়ে খবর পাই, কিছু অসাধু ব্যবসায়ী অতিরিক্ত লবণ মজুদ করছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘এনএসআই সদস্যরা গোপন সংবাদের ভিত্তিতে সেখানে গিয়ে ৬ জনকে আটক করেন। জব্দ করা হয় প্রায় ৫০ কেজি লবণ। ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের ছেড়ে দেওয়া হয়। এছাড়া অপর ৪ জন নিজেদের দোষ স্বীকার করে নেওয়ায় তাদের বিভিন্ন মেয়াদে দন্ড দেওয়া হয়।’
ইয়াসির আরাফাত আরও বলেন, ‘যারা এ গুজব রটাবে বা কৃত্রিম সংকট তৈরি করতে লবণ মজুদ রাখবে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। জনসাধারণকেও এ বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।’
ছাতক : প্রতিনিধি জানান, সুনামগঞ্জের ছাতকে বেশি দামে লবণ বিক্রির অপরাধে ২ ব্যবসায়ীকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছে ভ্রাম্যমাণ আদালত। গত সোমবার সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট তাপস শীল। তিনি জানান, সন্ধ্যায় ছাতক বাজারে বেশি দামে লবণ বিক্রি হচ্ছে এমন সংবাদ পেয়ে অভিযান পরিচালনা করে আলী ট্রেডার্সকে ১০ হাজার ও নিতাই স্টোরকে ১০ হাজার টাকা করে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯ এর ৪০ ধারায় এ অর্থ দন্ড প্রদান করা হয়। বাজারে লবণের ঘাটতি নেই। গুজবে কান দিয়ে বেশি দামে লবণ কিনবেন না। বাজার স্থিতিশীল রাখতে উপজেলা প্রশাসন সর্বদা সজাগ রয়েছে।