খেলাপিঋণ পুনর্তফসিল করছে ব্যাংকগুলো

11

সবুজ সিলেট ডেস্ক
ব্যাংক খাতের বিতরণ করা ঋণের বড় একটি অংশ ফেরত আসছে না। যে কারণে খেলাপি ঋণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। তবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপি ঋণের যে তথ্য দিচ্ছে, প্রকৃত খেলাপি ঋণ তার চেয়ে আরও অনেকগুণ বেশি। কারণ, বড় অঙ্কের ঋণ আদায় করতে না পারলেও অনেক ব্যাংক সেসব ঋণকে খেলাপি হিসেবেও চিহ্নিত করছে না। আর যেসব ব্যাংক কাগজে-কলমে খেলাপি ঋণ কম দেখাতে পারদর্শী, সেসব ব্যাংককে অলিখিতভাবে সাধুবাদ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এদিকে, যেসব ব্যাংক নিয়ম-নীতি মেনে চলতে অভ্যস্ত ছিল, সেসব ব্যাংকও এখন খেলাপি ঋণ কম দেখাতে ঋণ পুনর্তফসিলের পথে হাঁটছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠনও।
জানতে চাইলে একটি বেসরকারি ব্যাংকের প্রধান নির্বাহী ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, ‘ঋণ আদায় না হলে বাধ্য হয়েই নিয়ম-নীতি মেনে খেলাপি ঋণ অবলোপন করা হয়।’ তিনি বলেন, ‘ঋণ ফেরত আনার অংশ হিসেবেই গ্রাহকদের বিভিন্ন ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমতি নিয়েই গ্রাহকদের পুনর্তফসিল ও বড় অঙ্কের ঋণ পুনর্গঠন করা হয়।’
তবে, অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ব্যাংকগুলো নিজেদের অবস্থা ভালো দেখাতে খেলাপি কম দেখানো ছাড়াও অনেক তথ্য গোপন করছে।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘খেলাপি ঋণ আদায় না করতে পারাটা ব্যাংকের জন্য বড় দুর্বলতা। আসলে ব্যাংকগুলো হয়তো ঋণ আদায়ের চেষ্টা করে না। অথবা তারা ভালো গ্রাহককে ঋণ দেয় না। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকও যথাযথ ভূমিকা নেয় না। ফলে অনেক ঋণ আগেই খেলাপি হওয়ার উপযুক্ত ঋণও খেলাপি দেখানো হচ্ছে না।’
জানা গেছে, সম্ভাব্য খেলাপি হওয়া থেকে বিরত থাকতে এবং খেলাপি হওয়ার পর তা নিয়মিত করতে পুনর্তফসিল করেন ঋণগ্রহীতারা। পুনর্তফসিল করতে নির্ধারিত হারে নগদ ডাউন-পেমেন্ট দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। ২০১২ সালে ঋণ পুনর্তফসিলের পূর্ণাঙ্গ নীতিমালা জারি করা হয়। তবে ২০১৩ সালে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বিবেচনায় শিথিল শর্তে ঋণ পুনর্তফসিলের ব্যাপক সুযোগ করে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই ব্যাংকগুলোতে ঋণ পুনর্তফসিলের হিড়িক পড়ে যায়।
সবশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ঋণখেলাপিরা মাত্র দুই শতাংশ ডাউনপেমেন্ট দিয়ে ঋণ পুনর্তফসিল করতে পারছেন। পুনর্তফসিল হওয়া ঋণ পরিশোধে তারা সময় পাবেন টানা ১০ বছর। ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিরাও এই সুযোগ পাচ্ছেন। এই ধরনের ঋণখেলাপিকে প্রথম এক বছর কোনো কিস্তিও দিতে হবে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ছয় বছরে (২০১৩ থেকে ২০১৯ সালের জুন পর্যন্ত) ব্যাংকিং খাতে এক লাখ ২৮ হাজার ৫৬৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্তফসিল করা হয়েছে। এরমধ্যে শুধু চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসেই (জানুয়ারি-জুন) ২১ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার খেলাপি ঋণ পুনর্তফসিল করেছে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো।
এদিকে, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী ও বেসিক ব্যাংককে চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়েছিল ৩৬৭ কোটি টাকা। কিন্তু, ওই সময়ে ব্যাংকগুলো আদায়ে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৩২ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। আদায়ের দিক থেকে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় রয়েছে সোনালী ও রূপালী ব্যাংক। এই ব্যাংকগুলো লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ ভাগ অবলোপন করা ঋণ আদায় করতে সক্ষম হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে দ্রæত ঋণ আদায়ের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, অবলোপন করা ঋণ থেকে সোনালী ব্যাংককে অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে ২০০ কোটি টাকা আদায়ের টার্গেট দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ব্যাংকটি অবলোপন করা ঋণ থেকে আদায় করতে সক্ষম হয়েছে মাত্র ৬ কোটি টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার মাত্র ৩ ভাগ। একইভাবে জনতা ব্যাংকের আদায়ের টার্গেট ছিল ৫০ কোটি টাকা। কিন্তু, আদায় হয়েছে ৯ কোটি ৭২ লাখ টাকা। অগ্রণী ব্যাংকের আদায় করার কথা ছিল ৮০ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। রূপালী ব্যাংকের ঋণ আদায়ের টার্গেট ছিল ৩৫ কোটি টাকা। আদায় হয়েছে মাত্র ৯৫ লাখ টাকা, যা লক্ষ্যমাত্রার ৩ শতাংশ। বেসিক ব্যাংকের আদায়ের লক্ষ্য ছিল দুই কোটি টাকা। আদায় হয়েছে এক কোটি ৭১ লাখ টাকা।
এদিকে, ঋণখেলাপিদের বিশেষ সুবিধায় ঋণ পুনর্তফসিলের মধ্যেও ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ আরও বেড়েছে। বর্তমানে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ১৬ হাজার ২৮৮ কোটি টাকা। যা মোট ঋণের ১১ দশমিক ৯৯ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ তথ্য বলছে, তিন মাসে (জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর) খেলাপি ঋণ বেড়েছে আরও ৩ হাজার ৮৬৩ কোটি টাকা। জুন শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা (অবলোপন ছাড়া)।
তবে, আইএমএফের হিসাবে ব্যাংকিং খাতে প্রকৃত খেলাপি ঋণ দুই লাখ ৪০ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। এরসঙ্গে এই বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে মোট ঋণ অবলোপন করা হয়েছে ৪০ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা। এরসঙ্গে সাড়ে ছয় বছরে আরও এক লাখ ২৮ হাজার ৫০০ কোটি ও ঋণ পুনর্গঠন হওয়া ১৫ হাজার কোটি টাকা যোগ করলে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ ঋণের অঙ্ক দাঁড়ায় দুই লাখ ৯৬ হাজার ৪১৯ কোটি টাকা।
ব্যাংকের মূল খেলাপি ঋণ, ঋণ অবলোপন, পুনর্তফসিল ও পুনর্গঠিত ঋণকে একসঙ্গে ‘দুর্দশাগ্রস্ত’ ঋণ বলা হয়। এই ঋণ নিয়ে চিন্তিত এখন বাংলাদেশ ব্যাংকও। এর থেকে উত্তরণে স¤প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে একটি পর্যালোচনা বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ফজলে কবির। বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের শীর্ষ পর্যায়ের ৩০ জন কর্মকর্তা উপস্থিত ছিলেন।