জলঢুপী কমলার সুদিন ফেরাতে সমন্বিত উদ্যোগ

4

মিলাদ জয়নুল, বিয়ানীবাজার
সিলেট অঞ্চলে কমলা চাষ বাড়াতে ২০০১ সালে ‘বৃহত্তর সিলেট সমন্বিত কমলা চাষ উন্নয়ন’ নামে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর। আট বছরের ওই প্রকল্প শেষে এই অঞ্চলে কমলার চাষ বেড়ে যায় দ্বিগুণ। তবে এরপর বন্ধ হয়ে কমলা চাষ বৃদ্ধির উদ্যোগ। ১১ বছর পর আবার সিলেটের কমলার প্রতি মনোযোগী হয়েছে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর। নেয়া হয় পাঁচবছর মেয়াদী আরেকটি প্রকল্প। ২০১৯ সালে শুরু হওয়া এই প্রকল্পের কাজ চলবে ২০২৩ সাল পর্যন্ত। প্রথমটির মতো ২য় প্রকল্পও সফল হলে সিলেটের কমলার সুদিন আবার ফিরে আসবে বলে আশা সংশ্লিষ্টদের।
সিলেটের কমলার ঐতিহ্যের কথা কে না জানে! এককালে সিলেটের পরিচিতিই গড়ে তুলেছিল কৃষিজাত দুই পণ্য-চা আর কমলা। পাহাড়-টিলার ঢালে উর্বর মাটিতে ভালো ফলনের জন্য চায়ের দেশের পাশাপাশি সিলেট এক সময় কমলার দেশ বলেও পরিচিত পায়। সিলেটের বিয়ানীবাজারের জলঢুপ এলাকার কমলার খ্যাতি ছিলো দেশের বাইরেও। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া, বৈরি আবহাওয়া, পাহাড়ি জমি ক্রমেই কমে আসা প্রভৃতি কারণে কমে আসতে থাকে সিলেটে কমলার উৎপাদন। ফলে চীন, ভারত, ভুটান নেপালসহ বিদেশের কমলা দখল করে নেয় দেশের বাজার। অপেক্ষাকৃত কমমূল্যে এগুলো পাওয়া যাওয়ায় বিক্রেতারা ঝুঁকে পড়েন বিদেশি কমলার প্রতি। দেশি কমলার দাম অপেক্ষাকৃত বেশি হওয়ায় পাইকারি বিক্রেতারাও কিছুটা মুখ ফিরিয়ে নেন। এতে লোকসানের আশংকায় সিলেটের কৃষকরাও কমলা চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন।
এ অবস্থায় কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর ২০০১ সালে সিলেটের কমলা চাষে কৃষকদের উদ্ধুব্ধ করতে একটি প্রকল্প গ্রহণ করে। ‘বৃহত্তর সিলেট সমন্বিত কমলা চাষ উন্নয়ন’ নামে আট বছর মেয়াদি এ প্রকল্পে চার জেলায় ২৫০টি বাগান করা হয়েছে বলে জানিয়েছে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর। এছাড়া পাঁচ হাজার কমলা চাষিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। ২০০৮ সালের জুনে শেষ হয় এ প্রকল্পের মেয়াদ। ২০০১ সালে সিলেট বিভাগে যেখানে ২৮২ হেক্টর জমিতে কমলা চাষ হতো, সেখানে ওই প্রকল্পের ফলে বর্তমানে কমলা চাষ হচ্ছে ৫১০ হেক্টর জমিতে।
২০০৮ সালে কৃষকদের দাবি সত্তে¡ও ওই প্রকল্পের মেয়াদ আর বাড়ানো হয়নি। দীর্ঘদিন এনিয়ে ছিলো না কোনো উদ্যোগও। ফলে আবার নিরুৎসাহিত হয়ে পড়েন চাষিরা।
গোলাপগঞ্জের বাঘা ইউনিয়নের গৌরাবাড়ি গ্রামের কমলা চাষি গুণেন্দ্র দেব। বাগানে প্রায় একশ’টির মতো গাছ রয়েছে তার। তিনি বলেন, এবছর এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০ হাজার টাকার কমলা বিক্রি করেছি। সরকারি প্রণোদনা বা কোন ধরণের ঋণের সুবিধা পেলে বাগানে আরও উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব।
তিনি বলেন, উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে একদিন এসে বাগানটি দেখে যাওয়ার অনুরোধ করেছিলাম। তিনি আসেননি। কমলা চাষে সহযোগিতার প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে বলে জানিয়েছেন।
তবে দীর্ঘ ১১ বছর পর সিলেটের কমলা চাষ বৃদ্ধিতে আবার উদ্যোগী হয়েছে সরকার। ২০১৯ সালে কমলাসহ সিলেট অঞ্চলের লেবু জাতীয় ফসলের উৎপাদন বৃদ্ধিতে আরেকটি প্রকল্প গ্রহণ করে কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর। ‘লেবু জাতীয় ফসলের স¤প্রসারণ, ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন বৃদ্ধি প্রকল্প’ নামে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে সিলেট ও মৌলভীবাজারের ৯ উপজেলায় কমলার উৎপাদন বাড়াতে কাজ করা হবে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট, বিশ্বনাথ, গোলাপগঞ্জ, জৈন্তাপুর ও বিয়ানীবাজার এবং মৌলভীবাজার জেলার জুড়ি বড়লেখা, শ্রীমঙ্গল ও কুলাউড়া- এই ৯ উপজেলায় প্রকল্পের কাজ চলবে। এসব উপজেলায়ই কমলাসহ লেবু জাতীয় ফল সবচেয়ে বেশি ফলন হয়।
কমলা উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়, কমলার নতুন বাগান সৃষ্টি, পুরাতন বাগান ব্যবস্থার মাধ্যমে ১৫-২০ শতাংশ উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিয়ে এই প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের কৃষকরা। এ লক্ষ্য পূরণে কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কর্মশালা ও উদ্ধুদ্ধকরণ কার্যক্রম চালানো হবে বলে জানান তারা। এছাড়া সিলেট ও মৌলভীবাজারের দুই হার্টিকালচার সেন্টারে উন্নতমানের চারা উৎপাদন ও সরবরাহ করা হবে।
কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের সিলেট কার্যালয়ের উপপরিচালক সিলেট এম এম ইলিয়াস বলেন, সিলেট অঞ্চলে কমলার উৎপাদন বাড়াতে আগের প্রকল্পে অনেক সুফল মিলেছে। এরপর দীর্ঘদিন এ কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও সরকার নতুন একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে। নতুন প্রকল্পে কমলার সাথে লেবু জাতীয় অন্যান্য ফল উৎপাদন বৃদ্ধিতেও কাজ করা হবে।
তিনি বলেন, এখনো চেষ্টা করলে সিলেটের কমলার ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে। এজন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি চাষিদেরও এগিয়ে আসতে হবে। এছাড়া প্রত্যেকের বসতবাড়িতে কমলার চারা রোপণের আহŸান জানান তিনি।