‘পারিবারিক কলহের বলি’ বড়লেখার পাল্লাতল চা-বাগানের ৫ জন

2

বড়লেখা প্রতিনিধি
পারিবারিক কলহের কারণেই প্রাণ যায় মৌলভীবাজারের বড়লেখার পাল্লাতল চা-বাগানের ৫ জনের। এর মধ্যে ৪ জনকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেন নির্মল কর্মকার (৩৮) নামের একজন। গত রোববার ভোর রাতে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার ভারত সীমান্তবর্তী দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পাল্লাতল চা-বাগানে এই নৃশংস ঘটনাটি ঘটেছে। পুলিশ লাশগুলো উদ্ধার করে বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে ময়নাতদন্তের জন্য মৌলভীবাজার সদরের ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠিয়েছে। হামলায় নিহতরা হচ্ছেন-নির্মল কর্মকারের স্ত্রী জলি বুনার্জি (৩০), শাশুড়ি ল²ী বুনার্জি (৬০), প্রতিবেশী বসন্ত বক্তা (৬০) এবং বসন্ত বক্তার মেয়ে শিউলী বক্তা (১৪)। হামলায় বসন্ত বক্তার স্ত্রী কানন বক্তাও গুরুতর আহত হয়েছেন। তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। টনার সময় কোনোরকম পালিয়ে প্রাণে বেঁচে গেছে জলি বুনার্জির আগের স্বামীর পক্ষের মেয়ে চন্দনা বুনার্জি (৯)। রোববার সরেজমিনে দেখা গেছে, রক্তাক্ত বসন্ত বক্তা ও তার মেয়ের লাশ উঠানের মধ্যে পড়ে আছে। ঘরের মেঝেতে জলি ও তার মা ল²ীর লাশ। ঘরের এক কোণে তীরের সাথে ঝুলানো ছিল হামলাকারী নির্মল কর্মকারের লাশ। পুলিশের বিভিন্ন টিম ঘটনাস্থলে পৌঁছে লাশগুলোর সুরতহাল তৈরি করছিল। কেউ আবার ঘটনাস্থলের আলামত সংগ্রহ করছিলেন। বাগানের সাপ্তাহিক ছুটির দিন হওয়ায় কাজও ছিল না। তাই ঘটনাস্থলের আশপাশে নারী-পুরুষ চা শ্রমিক পরিবারের লোকজনের ভিড়। খবর পেয়ে বিভিন্ন এলাকা থেকে লোকজন ভিড় করেন এই এলাকায়। মর্মস্পর্শী এ ঘটনায় স্তব্ধ চা-বাগানের শ্রমিক ও অন্যান্যরা। স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, রোববার ভোররাতে পাল্লাতল চা-বাগানে পারিবারিক কলহের জের ধরে নির্মল কর্মকার প্রথমে তার স্ত্রীকে এলোপাথাড়ি কুপিয়ে জখম করেন। আক্রমণ ঠেকাতে আসলে শাশুড়িকে এবং পরে দুই প্রতিবেশীকে কুপিয়ে জখম করেন। ঘটনাস্থলেই এ চারজনের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় গুরুতর আহত হন কানন বক্তা। পাল্লাতল চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণি পড়ুয়া চন্দনা পালিয়ে গিয়ে চিৎকার দিলে আশপাশের শ্রমিকরা ছুটে এসে বাড়ি ঘেরাও করেন। এ অবস্থায় নির্মল পালিয়ে যেতে পারেননি। ঘরের দরজা লাগিয়ে তীরের সাথে ঝুলে আত্মহত্যা করেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে ঘরের দরজা ভেঙে তাকে ঝুলন্ত অবস্থায় দেখতে পায়। নির্মল এ বাগানের নিয়মিত শ্রমিক ছিলেন না। তিনি শ্বশুর বাড়িতেই থাকতেন। বাগানের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দুই বছর আগে পাল্লাতল বাগানের বিষ্ণু বুনার্জির মেয়ে জলি বুনার্জিকে বিয়ে করেন নির্মল কর্মকার। জলিকে বিয়ে করে তিনি শ্বশুর বাড়িতে থাকতেন। চা-বাগানের বাইরে গিয়ে বিভিন্ন ধরনের কাজ করতেন। মাঝে মাঝে বিভিন্ন বিষয়ে স্বামী-স্ত্রীর মাঝে ঝগড়া হতো। বাগানের সহকারী ব্যবস্থাপক জাকির হোসেন বলেন, ঘাতক নির্মল কর্মকার প্রায় দেড় বছর আগে জলি বুনার্জিকে বিয়ে করে ঘরজামাই হিসেবে বসবাস করে আসছিল। সে আমার বাগানের নিয়মিত কোনো চা শ্রমিক নয়। এর আগে সে পার্শ্ববর্তী একটি চা-বাগানে ছিল। এদিকে খবর পেয়েই সকালে ঘটনাস্থলে যান মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার ফারুক আহমদ, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তানিয়া সুলতানা, মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (পিবিআই) নজরুল ইসলাম ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (কুলাউড়া সার্কেল) কাওছার দস্তগীর, থানার অফিসার ইনচার্জ মো. ইয়াছিনুল হক, পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) মো. জসীম। মৌলভীবাজারের পুলিশ সুপার মো. ফারুক আহমদ বলেন, ধারণা করা হচ্ছে পারিবারিক কলহের জেরে ঘটনাটি ঘটেছে। রাতে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে অনেকক্ষণ ঝগড়া হয়েছিল। এটা শোনতেছি। এ থেকেই ঘটনার সূত্রপাত। লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এই ঘটনায় গুরুতর আহত একজন হাসপাতালে ভর্তি রয়েছেন। বিস্তারিত তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।