ওসমানীনগর-বালাগঞ্জে গাইড বইয়ের ছড়াছড়ি

24

শিপন আহমদ, ওসমানীনগর
শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও উচ্চ আদালতের রায়কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বালাগঞ্জ-ওসমানীনগর উপজেলার লাইব্রেরিগুলোতে প্রকাশ্যে বিক্রি হচ্ছে নোট-গাইড বই।
অভিযোগ ওঠেছে, প্রকাশনী সংস্থার কাছ থেকে বড় অঙ্কের টাকা নিয়ে দুই উপজেলার সকল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা এসব নিষিদ্ধ নোট ও গাইড বই কৌশলে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে তুলে দিচ্ছেন।
বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর উপজেলার প্রায় সবকটি মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয় ছাড়াও সরকারি, বেসরকারি এবং কমিউনিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের গাইড বা নোট বই কিনতে বাধ্য করছেন সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকসহ সংশ্লিষ্টরা। বিনিময়ে নগদ টাকা, ঘড়ি, ফ্যান, আলমারীসহ নানা ধরণের উপহারও পাচ্ছেন তারা।
দুই উপজেলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এসবের সাথে জড়িত হয়ে পড়ায় হাট-বাজারের লাইব্রেরিতে প্রকাশ্যেই এসব বই বিক্রি হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছে না প্রশাসন।
নতুন বছরের শুরুতেই বালাগঞ্জ ও ওসমানীগর উপজেলার প্রধান প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্রসহ হাট বাজারগুলিতে থাকা লাইব্রেরিগুলোতে দেদারছে বিক্রি হচ্ছে দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে শুরু করে নবম ও দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিষিদ্ধ ঘোষিত নোট-গাইড বই। নোট বই বিক্রি হচ্ছে সহায়িকা অথবা একের মধ্যে এক, দুই, পাঁচ এবং সাত এমন সব বাহারি নামে। নানা বাহানায় ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকদের কাছে বেশি দামে এ সব নোট-গাইড বিক্রি করে লাভবান হচ্ছেন একাধিক অসাধু লাইব্রেরি মালিকেরা। আর একই কায়দায় চলছে দুই উপজেলার উচ্চবিদ্যালয়গুলোর ৬ষ্ট থেকে দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের ইংরেজি গ্রামার ও বাংলা ব্যাকরণের ব্যবসাও। শিক্ষকদের পছন্দমত লাইব্রেরি এবং নিদিষ্ট প্রকাশনী সংস্থার নোট বা গাইড বই যদি কোনো শিক্ষার্থী ক্রয় না করে তাহলে ঐ শিক্ষার্থীকে নাজেহাল হতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা যে সমস্ত প্রকাশনীর গাইড বই ক্রয় করতে শিক্ষার্থীদের বাধ্য করছেন সেগুলো হচ্ছে, লেকচার, পাঞ্জেরি, জুপিটার, মাতৃছায়া, গ্যালাক্সি, অনুপম, নবদূত, কাজল, অ্যাডভান্স, স্টার, টেলিগ্রাম, নিউ মডেল গাইড, ফুল কুড়িঁ প্রকাশনীর ছাত্রসখা গাইড, ইন্টারনেট গাইড,জুপিটার গাইড, নিউ নেশন গাইডসহ ঢাকার বাংলা বাজারের কিছু অসাধু প্রকাশনা সংস্থার মাধ্যমে এ সব নোট ও গাইড বই পৌঁছে যাচ্ছে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে। অপরদিকে বিদ্যালয়গুলোর সংশ্লিষ্ট শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের নোট ও গাইড বইয়ের লিষ্ট দিয়ে তালিকার উপরে সংশ্লিষ্ট লাইব্রেরীর ঠিকানা সম্মিলিত শীল দিয়ে দিচ্ছেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে উপজেলার সরকারি-বেসরকারি স্কুলের শিক্ষকরা গাইড বই কোম্পানির সংশ্লিষ্টদের সাথে চুক্তিবদ্ধ হয়ে এ সব নিন্মমানের গাইড ও গ্রামার বইয়ের নাম প্রেসক্রাইব করছেন। ছাত্রছাত্রীর সংখ্যার অনুপাতে পরিমাপ হচ্ছে প্রকাশনী গুলোর ঘুষের টাকার। যত বেশি ছাত্রছাত্রী তত বেশি টাকা, অফার, উপহার। প্রকাশনী সংস্থার এজেন্ট ও স্থানীয় একাধিক অসাধু লাইব্রেরী ব্যবসায়ীর ওইসব কাঁচা টাকা পকেটস্থ করতে দুই উপজেলার সরকারি-বেসরকারি উচ্চবিদ্যালয়ে সে সব বই পাঠ্য তালিকা ভূক্তও করতে দ্বিধা করছেন না সংশ্লিষ্টরা।
সূক্র জানায়, উপজেলার লাইব্রেরি ব্যবসায়ীরা শিক্ষা বিভাগের একাধিক কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে আর শিক্ষকদের প্রেসক্রিপশনে (লেখা তালিকা অনুযায়ী) প্রকাশ্যেই চড়া দামে বিক্রি করছেন নিষিদ্ধ গাইড নোট ও গ্রমার বই। ফলে বিক্রেতাদের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছেন অভিভাবকরা।
আব্দুল আহাদ নামের স্থানীয় এক অভিভাবক জানান, আমার দুটি মেয়ে ওসমানীনগর উপজেলার একটি বিদ্যালয়ে ষষ্ঠ ও অষ্টম শ্রেণীতে পড়ে। জানুয়ারীর প্রথম দিকেই শিক্ষকরা তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে নোট-গাইডের তালিকা। সে সব বই কোন লাইব্রেরিতে পাওয়া যাবে তার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তালিকায় থাকা গাইড বইয়ের দাম প্রায় চার হাজার টাকা। যা কিনা অন্য কোনো বইয়ের দোকানে পাওয়া যাচ্ছে না। তারা যা চাইছেন সে দামেই কিনতে হচ্ছে। ফলে একাধিক অভিবাবকরা বই না কিনেই বাড়ি ফিরছেন।
দুই উপজেলার একাধিক অভিবাবকরা জানান, স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কর্মরত শিক্ষকরা প্রাইভেট টিউশনি, কোচিং নিয়ে ব্যস্থ থাকেন। উপজেলার সরকারি, আধা-সরকারি স্কুল, মাদ্রাসা, কলেজের শিক্ষকদের শতকরা ৮০ ভাগ প্রাইভেট টিউশনি ও কোচিংয়ের সঙ্গে জড়িত।
বালাগঞ্জে সদরের বাসিন্দা আব্দুল আলিম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়ায় জানান, তার একটি সন্তান স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণীতে পড়ে। সরকার আমার সন্তানের সব বই বিনামূল্যে দিল,আর স্কুলের স্যারদের কথা অনুযায়ী আমাকে ৩টি গাই বই ১২ টাকার বিনিময়ে কিনতে হলো। আমরা অভিবাবকরা তো জিম্মি! স্থানীয় প্রশাসনের উদাসীনতা আর নীরবতায় অভিবাবকরা এখন বিপাকে।
ওসমানীনগর উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা স্বপন কুমার চক্রবর্তী বলেন, সরকার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর সকল স্তরে গাইড বা নোট বই নিষিদ্ধ করেছে। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকেও অবগত করা হয়েছে। তারপরও এমনটি হয়ে থাকে তাহলেও দ্রæত ব্যবস্থা নেয়া হবে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা (প্রাথমিক) আব্দুল মুমিন মিয়া বলেন, উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর সকল শিক্ষকদের এ বিষয়ে সতর্ক করে দেয়া হয়েছে। এর পরও যদি কোনো শিক্ষক এসবে জড়িয়ে থাকেন তাহলে খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
তবে বালাগঞ্জ উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তিনি ব্যবস্থা নেবেন।
ওসমানীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. তাহমিনা আক্তার বলেন, উপজেলার কোনো বিদ্যালয়ে কর্মরত কেউ যদি এসবের সাথে জড়িত থাকেন তাহলে তদন্তপূর্বক ব্যবস্থা নেয়া হবে। এছাড়া গাইড বই বিক্রি বন্ধের ব্যাপারে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে শীঘ্রই অভিযান পরিচালনা করা হবে বলে জানান তিনি।