সিলেটে শুধু ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই চলছে অপারেশন!

9

স্টাফ রিপোর্টার
চিকিৎসাসেবা আর শুধুই সেবা নয়, এটি লাভজনক ব্যবসায় পরিণত হয়েছে অনেক আগেই। তারপরও কিছুটা রাখঢাক ছিল। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অনেকটা খোলামেলাভাবেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন অনেকে। তারই একটি সিলেটের ‘সিলেট ট্রমা সেন্টার এন্ড স্পেশালাইজড হসপিটাল’। শুধুমাত্র ট্রেড লাইসেন্স দিয়েই চলছে বাণিজ্যিক এই প্রতিষ্ঠানটি। নাম ‘হসপিটাল’ হলেও নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কোনো ছাড়পত্র।
গত তিন মাস ধরে শুধু আবেদন করেই এই প্রতিষ্ঠান চালিয়ে যাচ্ছে চিকিৎসা কার্যক্রম। হাসপাতালের তিনতলা ভবনের ছোট-বড় ২০টির মতো কক্ষের সবগুলোতেই ভর্তি রোগী। এর মধ্যে প্রায় সবাই অপারেশনের রোগী। প্রতিদিনই ৪ থেকে ৫টি মেজর অপারেশনও করা হয় এই হাসপাতালে। যার কিছু সফল আর কিছু ব্যর্থ।
গতকাল মঙ্গলবারসরেজমিন গিয়ে জানা যায় এসব কীর্তিকলাপ। এর মধ্যেই এক রোগীর স্বজন এসে জানালেন অভিযোগ। ভুল অপারেশন করে টাকা হাতিয়ে নেবার মত গুরুতর অভিযোগকে অবশ্য পাত্তাই দিতে চাইলেন না কর্মরতরা। সার্ভিস চার্জের নামে টাকা রাখা হয়েছে এবং অপারেশনে ভুল হতেই পারে- এমনটিই বক্তব্য হাসপাতাল ব্যবস্থাপকের।
অভিযোগকারী রোগীর স্বজনরা জানান, কাতার প্রবাসী মনছুফ মিয়া ভাঙা গোড়ালিতে প্লেট লাগান কাতারেই। তা অপসারণের জন্য দুই সপ্তাহ আগে শরনাপন্ন হন আর্থোপেডিক সার্জন সুমন মল্লিকের। ডা. সুমন মল্লিকের সাথে পরামর্শ করে তিনি ভর্তি হন সিলেট ট্রমা সেন্টার নামের এই হাসপাতালে। অপারেশনের প্যাকেজ মূল্য নির্ধারণ হয় ৩২ হাজার টাকা। ডাক্তারের ভাষ্যমতে, ছোটখাটো সেই অপারেশনের জন্য গতরাতে (সোমবার) অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। অপারেশন চলাকালেই ডাক্তার নির্দেশ দেন ২০ হাজার টাকা জমা দেবার জন্য। সেইমতো টাকা পরিশোধ করেন রোগীর স্বজনরা। আর এর মিনিট দশেক পর ডাক্তার এসে জানান, অপারেশন সফল হয়নি। সাথে এটাও জানান এই দেশে এই চিকিৎসা সম্ভব নয়, নিয়ে যেতে হবে বিদেশে। এরপর জমাকৃত ২০ হাজার টাকার মধ্যে ৮ হাজার টাকা রোগীর স্বজনদের ফেরত দেবার নির্দেশ দিয়ে চলে যান ডাক্তার।
এ বিষয়ে জানতে ডা. সুমন মল্লিকের সাথে যোগাযোগ করলে তিনি অপারেশনে ব্যর্থতার কথা স্বীকার করেন। তবে হাসপাতালের অনুমোদন আছে কিনা কিংবা এই হাসপাতালে অপারেশন করার অনুমতি আছে কিনা সে বিষয়ে স্পষ্ট কিছু জানাতে পারেননি।
পরে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, হাসপাতালের কোনো অনুমোদনই নেই। নেই পরিবেশের ছাড়পত্র, নেই কোনো আবাসিক বিশেষজ্ঞ ডাক্তার বা সার্জন। হাসপাতালের সহকারী ব্যবস্থাপনা পরিচালক জয়নাল আবেদীনের কাছে জানতে চাইলে তিনি জানান, আমাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, হাসপাতালের অনুমোদনের জন্য সিভিল সার্জনের কাছে আবেদন করা হয়েছে।
আবেদন করেই কার্যক্রম শুরু করা যায় কিনা এমন প্রশ্নের উত্তরে জয়নাল আবেদীন বলেন, সিলেটের কোনো হাসপাতালেই ছাড়পত্র নেই, সবাই এভাবেই হাসপাতাল পরিচালনা করেন।
এ ব্যাপারে সিলেটের সাবেক সিভিল সার্জন হিমাংশু লাল রায় বলেন, কোনো অবস্থাতেই অনুমোদন ছাড়া চিকিৎসা কার্যক্রম চালানো যাবে না। আর সিভিল সার্জন দপ্তর লাইসেন্স অনুমোদন দেয় না। তাই যে বা যারা এমন কার্যক্রম চালাচ্ছেন তারা সম্পূর্ণ অবৈধ উপায়ে চালাচ্ছেন।
এসবের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয় না কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ ব্যাপারে বর্তমান পরিচালক (হাসপাতাল, ক্লিনিক) ভালো বলতে পারবেন।
এমন অনিয়ম জেনেও কেন চুপ জানতে চাইলে সিলেট স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (স্বাস্থ্য) দেবপদ রায় জানান, আমরা অচিরেই এসব প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করব।
তবে এসব অভিযানের উপর আস্থা রাখতে পারছেন না রোগী কিংবা রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা। সিলেট ট্রমা সেন্টারে ভুল অপারেশনের শিকার রোগী মনছুফ মিয়ার আত্মীয় ও সিলেটের পরিবেশকর্মী আশরাফুল কবির বলেন, এসব লোক দেখানো। সিলেট শহরের প্রাণকেন্দ্র্রে কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়া একটি হাসপাতাল চলছে, একের পর এক অপারেশন করছে, তারা অথচ কর্তৃপক্ষ কিছুই জানেন না এমন হতে পারে না।
তিনি আরো বলেন, রোগীরা এখন আর ডাক্তারদের কাছে রোগী নন, তারা এখন পার্টি। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান যেমন তার গ্রাহকদের সাথে ব্যবহার করে, এখনকার ডাক্তাররাও ঠিক তাই করেন। তাদের ট্রেড লাইসেন্স আছে, তারা ব্যবসা চালাচ্ছেন। সেবা চালাতে হলে অনুমোদন বা ছাড়পত্রের প্রয়োজন, ব্যবসা চালাতে নয়।