সোনার বাংলা গঠন হোক অঙ্গীকার

5

বাঙালি জাতির হাজার বছরের সর্বশ্রেষ্ঠ সন্তান, স্বাধীন বাংলাদেশের মহান স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের শততম জš§বার্ষিকী আজ। দিনটি আজ জাতীয় শিশু দিবসও। ১৯২০ সালের ১৭ মার্চ বৃহত্তর ফরিদপুর জেলার তৎকালীন গোপালগঞ্জ মহকুমার টুঙ্গিপাড়ার শেখ পরিবারে জš§গ্রহণ করেন শিশু মুজিব। পিতা শেখ লুৎফুর রহমান ও মাতা সায়েরা খাতুনের চার কন্যা এবং দুই পুত্রের সংসারে তিনি ছিলেন তৃতীয়। সেই শিশুটি পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন নির্যাতিত-নিপীড়িত বাঙালির মুক্তির দিশারী। গভীর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, আত্মত্যাগ এবং জনগণের প্রতি মমত্ববোধের কারণে পরিণত বয়সে হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। বিশ্ব ইতিহাসে ঠাঁই করে নেন স্বাধীন বাংলাদেশের রূপকার হিসেবে। তাঁর জন্য আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। জš§দিনে এই মহান নেতাকে আমাদের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা।
কিশোর বয়সেই মুজিবের সংবেদনশীল হৃদয় ও মানবিক মূল্যবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। একদিকে সৎসাহস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী মানসিকতা, অন্যদিকে গরিব-দুঃখী মানুষের প্রতি অগাধ ভালোবাসা, তাদের দুঃখ-দৈন্য লাঘবের সংকল্প তাকে অবধারিতভাবেই রাজনীতিতে নিয়ে আসে। স্কুলে পড়া অবস্থায়ই তাঁর মধ্যে নেতৃত্বের বিকাশ ঘটতে দেখা যায়। ১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের পরপর নতুন রাজনৈতিক চিন্তাচেতনা নিয়ে ১৯৪৮ সালে ছাত্রলীগ গঠন করেন মুজিব। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫২-র মহান ভাষা আন্দোলন, ১৯৫৮-এর আইয়ুব সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলন, ১৯৬২-এর শিক্ষা আন্দোলন এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ প্রধান হিসেবে ১৯৬৬-এর ঐতিহাসিক ৬ দফা স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলনে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় কাররুদ্ধ হন তিনি। বাহান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ষাটের দশকে তিনি হয়ে ওঠেন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা। ১৯৬৯-এর ঐতিহাসিক গণ-অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ছাত্র-জনতা তাকে ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি দেয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে বাঙালি বঙ্গবন্ধুর ৬ দফার পক্ষে জানায় অকুন্ঠ সমর্থন। কিন্তু পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির এ নির্বাচনি বিজয়কে মেনে নেয়নি। বাঙালির এই নেতা কখনো অন্যায়ের সঙ্গে আপস করেননি। তাঁর আহŸানে সাড়া দিয়ে এ দেশের আপামর জনগণ ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতাযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করেছে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ।
বঙ্গবন্ধু ১৯৭২-এর ১০ জানুয়ারি পাকিস্তানের কারাগার থেকে দেশে ফিরেই তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে মনোনিবেশ করেন। কিন্তু সেই সুযোগ বেশিদিন পাননি। ’৭৫-এর ১৫ আগস্ট কালরাতে ঘাতকদের তপ্ত বুলেটে সপরিবারে নিহত হন বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। শুরু হয় দেশকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার বিপরীত দিকে নিয়ে যাওয়ার পালা। ১৯৭৫-পরবর্তী ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর নাম মুছে ফেলার অনেক চক্রান্ত-ষড়যন্ত্র-অপচেষ্টা হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রই ব্যর্থ হয়েছে। ১৯৯৬ সালে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ফের ক্ষমতাসীন হয় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলের সরকার। শেখ হাসিনা প্রথম মেয়াদে প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জš§দিনকে জাতীয় শিশু দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। ১৯৯৭ সালের ১৭ মার্চ দিবসটি পালন শুরু হয়। কিন্তু ২০০১ সালে স্বাধীনতাবিরোধী জামায়াতকে সঙ্গে নিয়ে ক্ষমতায় এসেই বিএনপি সরকার জাতীয় শিশু দিবস পালনের রাষ্ট্রীয় আনুষ্ঠানিকতা বন্ধ করে দেয়। তবে দলীয় এবং বেসরকারি পর্যায়ে দিনটি পালন অব্যাহত ছিল। ২০০৯ সালে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা আবার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসীন হন এবং অদ্যাবধি রয়েছেন। তখন থেকে ১৭ মার্চে আবার রাষ্ট্রীয়ভাবে পালিত হচ্ছে জাতীয় শিশু দিবস।
আজ বঙ্গবন্ধুর জšে§র শতবার্ষিকী শুরু হয়েছে। তাই সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে ‘মুজিববর্ষ’ পালন করা হচ্ছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে তার পরিবারের অধিকাংশ সদস্যসহ হত্যার মাধ্যমে ঘাতকচক্র তাকে বাংলাদেশ থেকে বিদায় করতে চেয়েছিল। কিন্তু সত্য সবসময়ই অবিনাশী। বঙ্গবন্ধু ও বাংলাদেশ অবিচ্ছেদ্য; বঙ্গবন্ধুর অমর সৃষ্টি-বাংলাদেশ। তাই বাংলাদেশ থেকে বঙ্গবন্ধুর নাম কখনো মুছে ফেলা সম্ভব নয়। বঙ্গবন্ধুর জš§শতবার্ষিকীতে মুজিববর্ষ পালনের মাধ্যমে এই সত্য পুনরায় প্রমাণিত হলো।
বঙ্গবন্ধু গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপেক্ষতা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাষ্ট্রকে পরিচালিত করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তাকে সপরিবারে হত্যা করে সে স্বপ্নযাত্রা ও লক্ষ্য থেকে দেশকে বিচ্যুত করা হয়। দেশ পরিচালনায় এবং দেশকে সাধারণ মানুষের করে গড়ে তোলার প্রত্যয়ে তিনি আমৃত্যু বিভিন্ন দিঙ্নির্দেশনা দিয়ে গেছেন। আমরা বিশ্বাস করি, তাঁর নির্দেশিত পথেই রয়েছে প্রকৃত মুক্তির নির্দেশনা। কাজেই বাংলাদেশকে তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত করতে হলে তাঁর নির্দেশিত পথেই দেশকে পরিচালিত করতে হবে। তাঁর নির্দেশিত পথে দেশ পরিচালিত হলে তাঁর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা গঠনই হোক আজকের অঙ্গীকার।