আলো, নিঃসঙ্গতা ও মুক্তি

36

নিসঙ্গতা আমাকে উন্মাদ করে তুলছে দিনের পর দিন।শীতের দিনগুলো শেষ হয়ে এলো ক্রমাগত।বসন্ত তার দুপুরের মধ্যে ছড়িয়ে দিয়েছে রূপকথা।সেই কোন সুদুর থেকে একটা কোকিল গেয়ে যাচ্ছে বিরহের গান।সন্ধেবেলা মাথার ওপর ছাদ সইতে পারি না।কোথায় ছুটে যাই আমি? মাঝে মাঝে আমার চলার গতিপথে নিজেই বিস্মিত হই।ছুটছি যেন অনন্তের দিকে।একটার পর একটা দৃশ্য বদলে যাচ্ছে।অটো করে যাচ্ছি মধ্যমগ্রাম।কখনও হেঁটে হেঁটে কলোনির মোড়।অথচ এসব কিছুই আমার শরীরের বাইরে নয়।আমার শরীরের ভেতরেই যেন এসব নিরন্তর পাক খেয়ে মরা।পুরনো অন্ধকার গলিগুলোতে ঘুরতে আজকাল খুব ভয় হয়।মনে হয় আদতে নিজের থেকে সামান্যও এগোতে পারিনি আমি।
মনে নয় একটা বয়স অব্ধি আদতে বেঁচে নিয়েছি,তারপর এ সমস্তকিছুই আসলে সেই বেঁচে নেওয়াটাকে ভাঙিয়ে খাওয়া।রাস্তায় বেরোলে মেয়েদের প্রতি এক অসম্ভব আকর্ষণ অনুভব করি।মেয়েদের দেখতে ভালো লাগে আমার।তাদের সুন্দর দেখতে ইচ্ছে করে।তাদের পেতে ইচ্ছে করেনা।আমি দর্শক।এই গোআটা পৃথিবীতে নিজের দর্শন জন্ম স্বার্থক করতে এসেছি।যেখানে সুন্দর মেয়েদের জটলা হয় সেখানে একটা চায়ের দোকান নিশ্চিত থাকে।
সেই চায়ের দোকানের দশা আমার মতো।সেখানে অন্ধকার,ভেতরে একটা পুরনো বেঞ্চে বেশ আত্মগোপন করা যায়।সেখান থেকে আমি এই গোটা দুনিয়ার দর্শক।একটা টিকিট কেটেছি, চা যতক্ষণ ফুরোবে আরকি।তারপর আরেকটা এমন প্রেক্ষাগৃহ,তারপর আরেকটা টিকিট কাটা।বাড়ি ফিরে সেসব দৃশ্য লিখে রাখা।সেখানে চরিত্রগুলোর কথা লিখে রাখা।গুচ্ছ গুচ্ছ মেয়েদের দেখতে দেখতে আমি বিভোর হয়ে যাই।বাড়ি ফিরতে ভালো লাগেনা,মনে হয় আরও কিছুক্ষণ থেকে গেলে বেশ হয়।আমি আত্মগোপন করে থাকা এক প্রাণ,তাদের দর্শক।অথচ,তারা যদি আমাকে খেয়াল করে তবে পুরো বিষয়টা নষ্ট হয়ে যায় একেবারে।
যদি প্রেক্ষাগৃহে নায়িকা দেখতে চায় একজন দর্শককে,তাহলে সেই দর্শকের দর্শক সত্তা বিলুপ্ত হয়।এমন নয় যে একটা খেলা শুরু হয়না।হয়,মাঝে মাঝেই একটা খেলা শুরু হয়।প্রথমে চোখে চোখে খেলা।তারপর কিছু পথে পথে খেলা।তারপর সমাপ্তি।এই সামান্য সময়ের খেলাটাই বেশ।নইলে পরস্পরকে জানা থেকে শুরু করে শুধু অভিযোগ আর সন্দেহ একত্র করা।তার কোন মানে নেই।বরং একটা সন্ধের বা একটা সকালের খেলা এই এক দু ঘন্টায় মিটে যাওয়াই ভালো।কখনও কখনও সবকিছুর ভবিষ্যৎ সম্পর্কে আগেভাগে জেনে যাওয়া মানুষকে কিছুতেই শান্তি দেয়না।
নিজেকে একেকদিন যে প্রশ্ন করিনা এমন নয়।হয়ত অনেক অসংখ্য প্রশ্ন নিয়েই আমি জীবনের সামনে এসে দাঁড়িয়েছিলাম।বিশ্বাস ছিল,জীবন একদিন সেইসব প্রশ্নের জবাব দেবে।অথচ জীবন তা দেয়নি।বরং বারবার একটা পথ দিয়ে বহুদূর যাওয়ার পর ফিরে এসেছি।আজকাল চাঁপাডালি মোড় থেকে একটা অটো করে এসে নামি শিশিরকুঞ্জের কাছে।একটা সন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় খেলা এখানেই হয়ে যায়।তারপর ডানদিকে গিয়ে ঢুকি,নবতীর্থ নামক পাড়ায়।মনে পড়ে একদিন প্রেমিক ছিলাম এ পাড়ায়।সকলে কি ভুলে গেছে আমাকে?
কেউ কি চিনেছিল তখন?খুব প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে।একটি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কীভাবে ভেঙে যায় তাকে ঘিরে গড়ে ওঠা জগতটি।অন্য যাকে ফেলেছি এসেছি জীবনের একটা পথে তার জন্য বারবার ফিরে ফিরে আসা নয় এখানে।মনে পড়ে সেই দিনগুলোর আমি কেমন সহজেই বিশ্বাস করতে পারতাম জীবনকে।এখন এত অবিশ্বাস।বিশ্বাসের তুলনায় অবিশ্বাস যখন মানুষের জীবনে বেশি হয়ে ওঠে তখুনি হয়ত মানুষ লিখতে শুরু করে।
তার বাড়ির পথে যাই।তার অন্ধকার ছাদ দেখি।মনে হয় সেই ছাদ থেকে আরেকটি ভিন্ন বয়সের আমি এখনও তাকিয়ে রয়েছি নিজের দিকে।সময় তো মনের একটা অবস্থা।মনে হয় আমাদের দুটো বয়স একে অপরকে দেখছে।মাঝে এঁটে যাচ্ছে একটা গোটা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড।