জামালগঞ্জে পানিবন্ধি লক্ষাধিক মানুষ, বিদ্যুৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন

73

জামালগঞ্জ প্রতিনিধি::
সুনামগঞ্জ জেলার জামালগঞ্জ উপজেলায় টানা চারদিনের ভারী বর্ষণ এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ী ঢলে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের প্রায় লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্ধি হয়ে পড়েছে।মহামারী করোনার মধ্যে এ বন্যা যেন মরার উপর খাড়ার ঘা হয়ে এসেছে। উপজেলার ক্ষতিগ্রস্থ এলাকার মধ্যে বেহেলী, সাচনা বাজার, জামালগঞ্জ উত্তর,জামালগঞ্জ সদর, ভীমখালী ও ফেনারবাঁক ইউনিয়ন। উপজেলার সাথে সুনামগঞ্জের সড়ক যোগাযোগ ও বিদ্যুৎ লাইন বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়ন ও হাট বাজারের সাথে প্রায় রাস্তা ভেঙ্গে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় যোগাযোগ ব্যবস্থা। বন্যার পানিতে বসত বাড়ি সহ স্কুল কলেজ, কলেজ ও মাদ্রাসা বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্লাবিত হয়েছে। অনেকের পুকুরের মাছ ভেসে যাওয়ার খবর পাওয়া গেছে।

এদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে আউসের চারা লাগানো ২০ হেক্টর জমি। ৬০ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি। সুনামগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায় গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে সুরমা নদীর পানি বিপদ সীমার ৭.৮০ সেন্টিমিটার অতিক্রম করে ৮.৪৬ সেন্টিমিটার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।

জামালগঞ্জ সদর ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান সাজ্জাদ মাহমুদ তালুকদার জানান, আমার ইউনিয়নে প্রায় ১৫টি গ্রাম পানি উঠে ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জামালগঞ্জ -সেলিমগঞ্জের মেইন রাস্তা সেলিমগঞ্জের নদীর উপর ভেঙ্গে গিয়ে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। তাছাড়াও ছোট বড় ১০টি রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ২ থেকে ৩হাজার মানুষ পানি বন্ধী অবস্থায় মানবেতর জীবন যাপন করছে। ভীমখালী ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ দুলাল মিয়া জানান আমার ইউনিয়নে ১ থেকে দেড় হাজার মানুষ পানি বন্ধী, জামালগঞ্জ-সুনামগঞ্জের রাস্তায় জাল্লাবাজ ইসলামপুর অংশে প্রায় ৩০০মিটার সড়ক ভেঙ্গে যাওয়ায় সুনামগঞ্জ সহ ইউনিয়নের সাথে উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।

এছাড়াও জাল্লাবাজ-ভীমখালী রাস্তা এবং ভীমখালী-মল্লিকপুর রাস্তার উপর দিয়ে প্রবল বেগে পানি যাওয়ায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জামালগঞ্জ উত্তর ইউপি চেয়ারম্যান মোঃ রজব আলী জানান, আমার ইউনিয়নে প্রায় অর্ধেক বাড়িতে পানি উঠায় ২ থেকে ৩হাজার মানুষ পানি বন্ধী হয়ে পড়ে। সাচনা মমিনপুর মেইন সড়কে প্রবল বেগে পানি যাওয়ায় রাস্তার অনেকাংশ ভেঙ্গে গেছে। এছাড়াও ছোট বড় অনেক রাস্তা ক্ষতি হয়েছে। বেহেলী ইউপি চেয়ারম্যান অসীম কুমার তালুকদার জানান, আমার ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামই পানিতে তলিয়ে যায়।

রাস্তা ঘাট সব পানি নীচে, গ্রামের মানুষজন মানবেতর জীবন যাপন করছে। সাচনা বাজার ইউপি চেয়ারম্যান নূরুল হক আফিন্দী জানান আমার ইউনিয়নের প্রায় সব গ্রামই পানিতে নিমজ্জিত এর মধ্যে ৫টি গ্রামের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। রাস্তাঘাট সবই ডুবে যাওয়ায় যোগাযোগ প্রায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। ফেনারবাঁক ইউপি চেয়ারম্যান করুনা সিন্ধু তালুকদার জানান আমার ইউনিয়নের ৩ হাজার পরিবার ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ৯৫টি পরিবারে পুরোপূরি বন্যার পানিতে তলিয়ে যায়। ইউনিয়নের ৬টি রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। আশ্রয় কেন্দ্রের ২০টি পরিবার পানির নীচে নিমজ্জিত।

উপজেলা পল্লী বিদ্যুৎ অফিসের ইনচার্জ মোঃ কামরুল ইসলাম জানান উজ্জলপুরের কাছাকাছি ইসলামপুর গ্রামের মাঝামাঝি ৩শত মিটার রাস্তা প্রবল ¯্রােতে ভেঙ্গে যাওয়ায় পল্লী বিদ্যুতের ৫টি মেইন খুটির নীচ থেকে মাটি সড়ে যাওয়ায় খুটি গুলো পড়ে যায়। খুটি মেরামতের কাজ চলছে। আপাতত বিকল্প লাইনের মাধ্যমে জামালগঞ্জ ও সাচনা বাজার কিছু অংশে বিদ্যুৎ দেওয়া হচ্ছে। আশাকরি ২/৩দিনের মধ্যে লাইন পুরোপূরি চালু করা যাবে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা অমিত পন্ডিত জানান উপজেলার প্রায় ৯৬টি পুকুর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। ২৬.৫০হেক্টর আয়তনের প্রায় ২০.০৪ মেঃটন পুকুরের মাছ ভেসে গিয়েছে।

সব মিলিয়ে ৪৬লক্ষ বাহাত্তর হাজার টাকার ক্ষতি সাধিত হয়েছে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ আজিজল হক জানান আগাম বন্যার কারণে ২০ হেক্টর আউস ধানের চারা তলিয়ে গেছে এছাড়াও গ্রীষ্মকালীন সবজির ৬০ হেক্টর জমির প্রচুর ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিত দেব জানান উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে বন্যা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।

উপজেলায় কন্ট্রোল রুম খোলা হয়েছে। পানি বন্ধী মানুষের আশ্রয়ের জন্য বন্যাশ্রয় কেন্দ্র ও বিদ্যালয় খুলে দেওয়ার জন্য প্রতিটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ও শিক্ষা কর্মকর্তাকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। উপজেলায় এ পর্যন্ত ২৭ মেঃটন চাউল ১৮শত কেজি ডাল ৮শত প্যাকেট শুকনা খাবার ও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অধিদপ্তর থেকে পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হয়েছে। ২টি আশ্রয় কেন্দ্রে ১২৮টি পরিবারের মাঝে খিচুরী পাক করে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে।