শৈশবের সিলেট : ডা. তুহিন বড়ুয়া তমাল

27

আমার বেড়ে উঠা, মনস্তত্ত্ব বিকশিত হওয়া সিলেটে। আমার প্রাণের শহর এই সিলেট।

চোখের সামনে বদলে যেতে দেখছি এই সিলেট কে। অনেক ছোট ছিলাম যখন সিলেটে তখন আকাশচুম্বী অট্টালিকা ছিলোনা। বড়জোর ৫ তলা পর্যন্ত দালান ছিলো। একতলা বাড়ি দেখা যেতো অহরহ। বাড়িগুলোর সামনে পেছনে এদিক ওদিক করে অনেক খালি জায়গা পড়ে থাকতে দেখেছি। গাছগাছালিতে ছাওয়া থাকতো ঐসব বাড়ির চারপাশ। স্নিগ্ধতা জুড়ে থাকতো সারা শহর জুড়ে।

সকাল বেলা দেরি হতো শহুরে চাঞ্চল্য শুরু হতে। দোকানিরা দেরিতে আসতেন হেলেদুলে। ব্যবসা হলে হবে, না হলেও কি আসে যায় মতো ছিলো মনোভাব! মার্কেট বলতে ছিলো শুকরিয়া, কাজী, মিতালি আর লন্ডন ম্যানশন। হাসান মার্কেট ছিলো, আছে, থাকবেও। শহরে যখন সুউচ্চ বিপনী বিতান ‘আল হামরা’ হয় – সে এক হুলুস্থুল কান্ডকারখানা মনে হতো আমাদের! ধীরে ধীরে মিলেনিয়াম, ব্লু ওয়াটার, গ্যালারিয়া গজিয়ে উঠে চোখের নিমিষেই। আকাশ ছুঁই ছুঁই অবস্থা।

শহরের রাস্তা গুলি ছিল সংকীর্ণ। আমরা কখনোই ভাবিনি এই সিলেটে এতো চওড়া রাস্তার দরকার হবে। ছোট্ট শহর, কম কম মানুষ জন। এতো বড় রাস্তা দিয়ে হবে টা কি? পুলিশ লাইনস থেকে মিরের ময়দানের রাস্তাটা ছিলো অসাধারণ। দুপাশে ছিলো সারি সারি গাছ। বন্ধুর মতো গাছ। আলিয়া মাদ্রাসার সামনে দিয়ে যখন VIP রোড হলো আমাদের অবাক জাগে, এতো চওড়াও হয় রাস্তাঘাট! খানাখন্দভরা রাস্তায় আমরা রিক্সায় ঝাঁকি খেতাম। যেকোন রকম বড় – গাড়ি- কার – মাইক্রো রাস্তায় চরে বেড়াতো খুবি কম। সিলেটে এখন ভাঙ্গা রাস্তা নেই বললেই চলে। রাস্তার প্রশস্ততা বাড়ছে। কার – নোহা তো অহরহ।

মানুষ বাড়ছে এই ছবির মতো শহরে। মায়াভরা শহরের স্নিগ্ধতা হ্রাস পাচ্ছে। কি ভোর – কি রাত, সিলেট ছিলো নির্ভরতার নাম। আপনার পকেটে কতো টাকা কিংবা গায়ে কতো গয়না সেটা কোনও বিষয়ই না। নিশুতি রাতে কিংবা কাক ডাকা ঊষালগ্নেও আপনার সম্পত্তি আপনারই থাকতো। কেউ জবরদস্তি করার মতো থাকতো না। আজকাল প্রায়শই শুনি ছিনতাই হয়। চুরি ডাকাতি হচ্ছে।

সিলেটের পথ সিলেটি ভাষায় মুখরিত থাকতো এইতো বছর দশেক আগেও। এখন মিশ্র বুলিতে কান উষ্ণ হয়ে উঠে। প্রচুর বাইরের মানুষ সিলেটে সেটেল হচ্ছে। সংস্কৃতির পরিবর্তন হচ্ছে দ্রুত। আগে একটা সহজ সরল পরিবেশ ছিলো। সবাই সবাইকে বিশ্বাস করতো। একটু খানি সাহায্য যদি চেয়ে থাকতেন – এই শহরের মানুষ পারলে নিজের গতর থেকে ঘাম ঝড়িয়ে হলেও আপনার উপকারে আসার চেষ্টা করতো। উবে যাচ্ছে দ্রুতই এই মানসিকতা।

উন্দাল রেস্টুরেন্ট হলো। ওখানের পাশেই ছিলো একটা টিন শেডের বাড়ি। বাড়ির সদর দরজার কতক সামনে একটা একলা গাছ দাঁড়িয়ে থাকতো৷ সে গাছ দৃশ্যপট হতে হারিয়ে গিয়েছে। বাড়ির সামনে যে সবুজ ঘাসে ছাওয়া মাঠ টুকু ছিলো সেখানে একটা মার্কেট উঠেছে।
রঞ্জিত স্যারের বাড়ি ছিলো। শরতের দুর্গোৎসবে ঢাকের শব্দ মধুর মতো ইথারে ছড়াতো। সেখানে সাম্পান রেস্টুরেন্ট।

মণিপুরি রাজবাড়ি হতে লামাবাজার পয়েন্ট। পয়েন্টের একটু আগে এক আইনজীবীর বসত ছিলো। বাসার সামনে কাঠের বানানো ছোট্ট করে একটা গেট। ছবির মতোন। গত বছর সেখানে তেতলা বাড়ি হলো। নিচতলায় কাপড়ের দোকান। হায়রে কাপড়ের দোকান আর রেস্টুরেন্ট! শ্রীহট্টের শ্রী হারাচ্ছে দিনকে দিন এইসব ঝলমলে আয়োজনের খাতিরে। আরো কতোশত উদাহরণ দিবো আমি? আমার মনে হাহাকার রব করে!

রিক্সাচালকদের ডিমান্ড বেড়ে গেছে অনেক গুণ। ৫ টাকায় কতো পথ পাড়ি দিতে পারতাম সে সময়! ১০ টাকায় তো তেপান্তরের মাঠও পাড় করে দিতো ‘ড্রাইভার সাব’! বেবিট্যাক্সি লাগতো শহরের একটু বাইরে যেতে। দূরপাল্লার বাসে চড়িনি মেট্রিক পরীক্ষা দেবার আগে কখনোই।

এইডেড ইশকুলের ছেলেদের ইউনিফর্ম ছিলো সাদা শার্ট – ইট কালারের প্যান্ট৷ পাল্টে গেছে সেসব। ইশকুল পড়ুয়াদের চুলের কাট শানদার এখন। উপরে জাঁকালো, দুপাশে ফ্ল্যাট। পাইলট ইশকুলে আমাদের সময় পাওয়া যেতো চার কিংবা বড়জোর পাঁচ শতেক পরীক্ষার্থী- ইশকুল এন্ট্রি পরীক্ষায় বসার জন্যে। সে সংখ্যা এখন হাজারে হাজার। অলিতে-গলিতে- ইমারতে কলেজ-ভার্সিটি।

আমার ছোটবেলার সিলেট আমার সাথেই পরিবর্তনের পথ ধরে সমান্তরাল। আগে চোখ বুজলেই রিকশার বেলের টুংটাং – মধুরতম সিলেটী ভাষা মিশে যেতো সবুজে। ঐ যে দূরেদূরে পাহাড় দেখা যায়, তার মাঝেমাঝে ফেনিল ঝর্ণাধারা, ন’তলা বিল্ডিং এর বারান্দা হতে সে একি রকমই দেখছি। আমার মন মানিয়ে নিতে বেগ পায় ছোট্ট মফস্বলটির ধীরেধীরে জনবহুলতায়।

মস্তিষ্কের স্মৃতিধারণ এলাকা এখনো অতোটা ধূসর হয়নি। আমার ছেলেবেলার সিলেট বর্ষায় ভেজা তিনটি পাতায় পরিবেষ্টিত কুঁড়ির মতো সতেজ হয়ে থাক…