সিলেটে হু হু করে বাড়ছে পানি, বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা

48

সেলিম হাসান কাওছার

টানা তিনদিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের বিভিন্ন উপজেলা বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সেই সঙ্গে বিস্তৃত হচ্ছে বন্যা পরিস্থিতি। ফলে প্রতিদিন প্লাবিত হচ্ছে নতুন নতুন এলাকা।

পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন প্রায় দুই লক্ষাধিক মানুষ। করোনাকালের মধ্যে এই বন্যা যেন ‌মরার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে এসেছে। সিলেট জেলার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলো হচ্ছে গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, কানাইঘাট ও জৈন্তাপুর। বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে প্রায় অর্ধশতাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান।

গোয়াইনঘাট

ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সিলেটের গোয়াইনঘাটে আবারও বন্যা দেখা দিয়েছে। পানি বৃদ্ধি পেয়ে মানুষের বসতবাড়িসহ অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। বসতবাড়িতে পানি উঠায় পানিবন্দি হয়ে অনেকেই তাদের গবাদি পশু নিয়ে বিপাকে রয়েছেন। বসতবাড়ির পাশাপাশি অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এ ছাড়া উপজেলা সদরের সঙ্গে যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সড়কের উপর দিয়ে কোথাও কোথাও দুই থেকে তিন ফুট উচ্চতায় পাহাড়ি ঢলের পানি প্রবাহিত হচ্ছে। যার ফলে সারী-গোয়াইনঘাট ও রাধানগর-গোয়াইনঘাট এবং সালুটিকর গোয়াইনঘাট সড়ক পানিতে তলিয়ে গিয়ে উপজেলা সদরের সঙ্গে যানবাহন চলাচল বন্ধ হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে ডাউকি নদীর প্রবল স্রোতে নদীর তীরবর্তী এলাকার কয়েক জায়গায় ভাঙনের খবর পাওয়া গেছে। বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে উপজেলার সারী ও ডাউকি নদীর পানি।

পাহাড়ে বৃষ্টিপাত হলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে মানুষের জান মাল রক্ষায় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্লাবিত এলাকার ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয় কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

এদিকে আকস্মিক বন্যায় জাফলং ও বিছনাকান্দি কোয়ারি সংশ্লিষ্ট কয়েক সহস্রাধিক পাথর ও বালু শ্রমিক বেকার হয়ে পড়েছেন।

জানা যায়, কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সারী, গোয়াইন, ডাউকি ও পিয়াইন নদী দিয়ে বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয় পাহাড়ি ঢল। এতে করে বন্যার পানি বৃদ্ধি পেয়ে শুক্রবার সকাল পর্যন্ত উপজেলার ১০টি ইউনিয়নের অধিকাংশ এলাকা প্লাবিত হয়ে যায়। উপজেলা সদরের প্রধান তিনটি সড়কসহ তলিয়ে যায় গ্রামীণ জনপদের অধিকাংশ এলাকার রাস্তাঘাট। ফলে পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় সহস্রাধিক পরিবার। বসতবাড়ি প্লাবিত হওয়ার পাশাপাশি কৃষকের আউশ ধান, বোনা আমন, আমন ধানের বীজ তলা এবং সবজি ক্ষেতসহ প্রায় ১ হাজার হেক্টর জমির ফসল পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে ফসলি জমি নিমজ্জিত হওয়ার পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

এ ব্যাপারে কথা হলে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. সুলতান আলী জানান, পাহাড়ি ঢলে বন্যা দেখা দেয়ায় উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে আউশ ধান, বোনা আমন ও আমন ধানের বীজতলা এবং সবজি ক্ষেতসহ সব মিলিয়ে প্রায় সাড়ে ৮শ’ হেক্টর ফসলি জমি নিমজ্জিত হওয়ার খবর পেয়েছি। তবে বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হলে এর পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কা রয়েছে। আর যদি বন্যার পানি দুয়েক-দিনের মধ্যে কমে যায় তাহলে তলিয়ে যাওয়া ফসলের তেমন কোনো ক্ষতি হবে না।

গোয়াইনঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব বলেন, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের কারণে উপজেলার নিম্নাঞ্চলগুলো প্লাবিত হয়ে গেছে। ইতোমধ্যে ডাউকি, গোয়াইন এবং সারী নদীর পানি বিপদ সীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। সবকটি ইউনিয়নের সাথে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রয়েছে। বন্যায় জনগণের দুর্ভোগ লাগবে উপজেলার নিম্নাঞ্চলের ২০টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পানিবন্দি মানুষজনের জন্য জরুরি ত্রাণ সহায়তা চেয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে বার্তা পাঠানো হয়েছে।

জৈন্তাপুর

সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলায় গত দুই দিনের টানা ভারী বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সৃষ্ট আকস্মিক বন্যায় উপজেলার সীমান্ত ঘেষা ৩ ইউনিয়নসহ সবকটি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত। সারী নদীর পানি স্বাভাবিকের চেয়ে বিপৎসীমার ২১ সেন্টি মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এখন পর্যন্ত প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো ত্রাণ সহায়তা প্রদান করতে দেখা যায়নি।

আকস্মিক পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে উপজেলার ৬টি ইউনিয়নের নিম্নাঞ্চলের গ্রামীন জনপথ স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ এবং বীজতলা। তাদের মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্তের শিকার হয়েছে নিম্নআয়ের দিনমজুর ও শ্রমিক পরিবারগুলো। গ্রামের দরিদ্র পরিবারগুলোর বসত-বিটা কাঁচা থাকায় বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

আকস্মিক বন্যায় বাড়িঘর তলিয়ে যাওয়ার কারণে ব্যাপক ক্ষতি হওয়ায় বিপাকে পড়েছে গ্রামীণ জনপদে বসবাসকারীরা। রাস্তা তলিয়ে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

কানাইঘাট

উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কানাইঘাট উপজেলার নিম্নাঞ্চল নতুন করে প্লাবিত হয়েছে। সুরমা নদীর পানি কানাইঘাট এলাকায় বিপৎসীমার ২৮ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। উপজেলা ৪০ হাজার মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। লোভা ও সুরমা নদী দিয়ে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে উপজেলার ১নং লক্ষ্মী প্রসাদ পূর্ব, ২ নং লক্ষ্মী প্রসাদ পশ্চিম, ৫নং বড় চতুল, কানাইঘাট পৌরসভা, ৯ নং রাজাগঞ্জ ইউনিয়ন বন্যার পানিতে প্লাবিত হয়েছে।এ ছাড়া বৃষ্টি ও বন্যার পানিতে অনেক রাস্তাঘাট তলিয়ে গিয়ে গর্তের সৃষ্টি হয়ে যান চলাচল হুমকির মুখে পড়েছে। এ ছাড়া উপজেলার প্রায় ৫ শতাধিক বিজ তলা তলিয়ে গেছে।

কোম্পানীগঞ্জ

জেলার কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার নিম্নাঞ্চল বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে উপজেলার বেশ কয়েকটি গ্রামীণ সড়ক ও বাজারে পানিতে তলিয়ে গেছে। এর ফলে তিনটি ইউনিয়নের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বন্যাকবলিত বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেছেন পশ্চিম ইসলামপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান শাহ মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন। তিনি বলেন, বন্যায় উপজেলার নিম্নাঞ্চলের মানুষ পানিবন্দি হয়ে অসহায় হয়ে পড়েছেন।