নিউইয়র্কে পাঠাওয়ের সহপ্রতিষ্ঠাতা ফাহিম সালেহ হত্যা: আতঙ্ক নিয়ে শোকে কাতর বাংলাদেশিরা

48

কামরুজ্জামান হেলাল, যুক্তরাষ্ট্র:

বাংলাদেশে রাইড শেয়ারিং পাঠাওর সহপ্রতিষ্ঠাতা ও পরবর্তীতে নাইজেরিয়াতে ‘গোকাডার’ প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত ফাহিম সালেহর (৩৩) ক্ষত-বিক্ষত লাশ ১৪ জুলাই মঙ্গলবার বিকেলে নিউইয়র্ক নগরীর ম্যানহাটানে নিজ এপার্টমেন্টে থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছে। বৈদ্যুতিক করাত দিয়ে ফাহিমের দেহ কয়েক টুকরা করা হয়েছে বলে নিউইয়র্কের পুলিশ জানায়। সন্দ্বীপের হরিসপুরের সন্তান নিউইয়র্ক সিটি সংলগ্ন পোকিপস্পিতে বসবাসরত আইবিএমর সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার সালেহ আহমেদের একমাত্র পুত্র ফাহিমকে নির্দয়ভাবে হত্যার সংবাদ গভীর বেদনার সাথে শীর্ষস্থানীয় মার্কিন মিডিয়ায় প্রচার ও প্রকাশিত হচ্ছে। ফাহিমের এমন হত্যাকাণ্ডে পুরো বাংলাদেশি কমিউনিটিতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। বাংলাদেশ থেকে সুন্দর ও নিরাপদ ভবিষ্যতের সন্ধানে যুক্তরাষ্ট্রে এসে বসতি গড়া পরিবারের মধ্যে সবচেয়ে মেধাবী এবং উদ্যমী ও সফল তরুণ উদ্যোক্তা হিসেবে মার্কিন ধারাতে বিশেষ একটি স্থান করে নিয়েছিলেন ফাহিম।

কীভাবে একটি সুন্দর জীবনের মৃত্যু এভাবে ঘটল এমন আক্ষেপে সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে ফাহিমের ছবি ও নিউজ শেয়ার করে হতাশার কথাও বলছেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। গত এক মাস থেকে নিউইয়র্কে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ঘটায় এমনিতে আতঙ্কে আছেন বাংলাদেশিরা।এরমধ্যে ফাহিমের হত্যাকাণ্ড আরও আতঙ্ক বাড়িয়ে দিয়েছে বলেও অনেকে এই প্রতিবেদককে জানান । এদিকে পুলিশ জানায়, ফাহিমের এপার্টমেন্টে প্রবেশের সিটিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে ঘাতকের সন্ধানে। পুলিশ আরও জানিয়েছে, সুপরিকল্পিতভাবে তাকে করাত দিয়ে টুকরা টুকরা করার পর খণ্ডিত অংশগুলো একটি থলিতে ভরার অপেক্ষায় ছিল এপার্টমেন্টের ভেতরেই। প্রাথমিক তদন্তে পুলিশ জানতে পেরেছে, গতবছর সোয়া দুই মিলিয়ন ডলারে এপার্টমেন্টটি ক্রয় করেন ফাহিম। করোনার মহামারির পুরো সময় তিনি ছিলেন মা-বাবার সাথে পোকিস্পিতে। কয়েকদিন আগে এসেছেন অভিজাতশ্রেণীর বিলাসবহুল এই এপার্টমেন্টে। স্বল্পভাষী ফাহিমের মৃত্যু সংবাদে গোটা কমিউনিটি স্তম্ভিত, ব্যথিত এবং ক্ষুব্ধ। এই অল্প বয়সেই ফাহিমের সম্পদের পরিমাণ প্রায় অর্ধ বিলিয়ন ডলার। তবুও কোন অহমিকা ছিল না তার। সাদামাটা জীবন-যাপনে অভ্যস্ত ফাহিম ছিলেন অবিবাহিত। তার এই হত্যাকাণ্ডে কে বা কারা জড়িত তা উদঘাটনের দাবি উঠেছে কমিউনিটি এবং তরুণ উদ্যোক্তাগণের পক্ষ থেকে। ম্যানহাটানের লোয়্যার ইস্টসাইডে লাক্সারি এই এপার্টমেন্টের প্রবেশ পথের ভিডিও ফুটেজের উদ্ধৃতি দিয়ে নিউইয়র্ক পুলিশের মুখপাত্র সার্জেন্ট কার্লোস নিয়েভেস জানান, ফাহিমের শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা, বুক, দুই হাত ও দুই পা পাওয়া গেছে কক্ষের ভেতরেই।

পুলিশ আরও জানায়, ফাহিমের বোনের টেলিফোন পেয়ে ওই ভবনের সপ্তম তলায় ফাহিমের এপার্টমেন্টে যায় পুলিশ অফিসারেরা। আগেরদিন থেকেই ফাহিমের কোন সন্ধান না পেয়ে তার ছোটবোন উদ্বিগ্নচিত্তে ছুটে গিয়েছিলেন সেখানে। ভেতরে ভাইয়ের শিরশ্ছেদকৃত দেহাবশেষ দেখেই ফোন করেছিলেন ৯১১ এ। ভিডিও ফুটেজের উদ্ধৃতি দিয়ে পুলিশ আরো জানায়, ১৩ জুলাই সোমবার বিকেলে ফাহিম লিফট দিয়ে ওই ভবনে ঢুকেছেন। তার পেছনেই ছিল স্যুট পরা এক ব্যক্তি, যার মাথায় টুপি, মুখে মাস্ক, হাতে গ্লাভস ছিল। সাথে ছিল একটি স্যুটকেস। পুলিশের ধারনা, ফাহিম তার বাসায় প্রবেশের সময়ে আক্রান্ত হতে পারেন। এরপরই তাকে হয়তো নিস্তেজ করা হতে পারে। পুলিশ অফিসার আরো উল্লেখ করেছেন যে, ঘাতক খুবই চালাক শ্রেণির। ফাহিমের খণ্ডিত দেহ প্লাস্টিকের ব্যাগে পাওয়া গেছে। করাতে তেমন রক্ত দেখেননি পুলিশ অফিসারেরা। মেধাবী ছাত্র ফাহিম নিউইয়র্কে একটি হাই স্কুলে পড়াবস্থায়ই ‘উইজ টিন’ নামক একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে ব্যাপক সাড়া জাগিয়েছিলেন। বেশ অর্থও আয় করতে সক্ষম হন। এরপর ম্যাসেচুসেটস স্টেটের বেন্টলি ইউনিভার্সিটি থেকে বিশেষ কৃতিত্বের সাথে কম্পিউটার ইনফরমেশন সিস্টেমে ব্যাচেলর করেন ফাহিম। উদ্ভাবনী মেধাসম্পন্ন ফাহিম আর পেছনে ফিরে না তাকিয়ে কিংবা কোন কোম্পানীতে চাকরির চেষ্টা না করেই মা-বাবার জন্মস্থান বাংলাদেশে ছুটেন। ২০১৫ সালে ঢাকায় মোটর সাইকেলে যাত্রী পরিবহনে পাঠাও প্রযুক্তির প্রচলন ঘটান আরো দুই বন্ধুর সাথে। ঢাকায় অবস্থানকালেই এর আগে ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন হ্যাকহাউজ নামক আরেকটি সংস্থা। বনানী মডেল টাউনে ছিল এর সদর দফতর। পাঠাওর প্রচলন রাজধানী ঢাকা ছাড়িয়ে চট্টগ্রাম, সিলেটসহ বিভিন্ন সিটিতে বিস্তৃত হয়। এক পর্যায়ে তা নেপালেও সম্প্রসারিত হয়েছে। এমনি অবস্থায় ঢাকা ছাড়েন ফাহিম। নাইজেরিয়ায় পরিচিত একজনের পার্টনারে মোটরবাইকে শেয়ারিং সার্ভিস হিসেবে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে লাগোসে চালু করেন ‘গোকাডা’। সেই ব্যবসা জমে উঠলেও নানাবিধ কারণে তা বছরখানেক পরই বন্ধ হয়ে গেছে বলে ফাহিমের ওয়েবসাইটে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর ক্যালিফোর্নিয়ার সিলিকন ভ্যালিতে একটি কোম্পানী স্থাপন করেছেন বলে ফাহিমের এক নিকটাত্মীয় জানান। সে ব্যাপারে বিস্তারিত জানা যায়নি এ সংবাদ লেখার সময় পর্যন্ত। বিনোদনমূলক এ্যাপারেটাস কোম্পানী কিকব্যাকরও প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন ফাহিম। এছাড়াও তিনি প্রতিষ্ঠাতা-পার্টনার ছিলেন এডভেঞ্চার ক্যাপিটলের।